সালটা ১৮৯৬। দুই ভাই অগাস্ত ও লুইস লুমিয়েরের বানানো একটি ছবি দেখানো হবে। ছবি শুরু হলো। পর্দাজুড়ে এক বিশালাকার ট্রেন। সেই ট্রেন ধেয়ে আসছে দর্শকের দিকে। এই দেখে পড়িমরি করে দর্শকেরা সব বের হতে শুরু করলেন হল থেকে। এই বুঝি ট্রেনটা চাপা দিল!
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এ ঘটনা এক কিংবদন্তি হয়ে আছে। লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের ছবিটির নাম ছিল দ্য অ্যারাইভাল অব আ ট্রেন। এমন ছবি দেখে এখন আর কেউ হল থেকে পালাতে চাইবেন না বটে। কিন্তু আজও অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে প্রোজেক্টর থেকে আসা আলো দর্শকের ওপর প্রভাব রেখে যায়। হলভর্তি প্রতিটি মানুষ হয়ে যান একা। ছবি যদি ভালো হয়, অন্যের বলা গল্পেও নিজের একটা জায়গা খুঁজে পান তাঁরা।
ছবি দেখতে দেখতে তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ শুরু করেন স্বপ্ন দেখা। স্বপ্ন দেখেন একদিন নিজের গল্পটাও অন্যদের বলার। আবার কেউ কেউ শুধু স্বপ্ন নয়, ছবি বানানোও শুরু করে দেন।
এই যেমন আবরার করিম পড়েন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতে, কিন্তু স্বপ্ন দেখেন নির্মাতা হওয়ার। শুরুটা চট্টগ্রামের স্কুলে, ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ার সময় টুকটাক ফটোগ্রাফি করতে করতে। পরে সেই শখই রূপ নিল ভিডিও দিয়ে গল্প বলায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি বানালেন। অন্যের তৈরি ছবির দলেও নিজেকে যুক্ত করলেন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে এখন প্রচুর ছবি দেখছেন, যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। অনলাইনে কিছু কোর্স করার ইচ্ছে আছে তাঁর।
অন্যদিকে থিয়েটার ও সিনেমা—দুটোই নাজিয়া জান্নাতের আগ্রহের জায়গা। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। মঞ্চের অভিনয়টা টানে বলে ভর্তি হয়েছেন প্রাচ্যনাটের কর্মশালায়। আবার নির্মাতা হওয়ার স্বপ্নও দেখেন। এর মধ্যে অংশ নিয়েছেন কয়েকটি চলচ্চিত্র কর্মশালায়। একটি ছোট ছবি বানিয়েছেনও। এখন চারপাশের মানুষ তাঁর ছবি দেখছে, এই গণ্ডিটা ধীরে ধীরে বড় করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
তিন বছর হিসাববিজ্ঞান পড়েছিলেন আবির ফেরদৌস। কিন্তু সিনেমার নেশা তাঁকে এমনই পেয়ে বসল যে সেটা ছেড়ে সিনেমা নিয়ে পড়া শুরু করলেন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। বাবা কুষ্টিয়ায় মঞ্চনাটক করতেন। অনেক দিন থেকে আছেন চিলড্রেনস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সঙ্গে। গতবার এই উৎসবের উৎসব পরিচালক ছিলেন তিনি। এখন দেশের বাইরে সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
নির্মাতা হওয়ার এই স্বপ্নে শরিফুল আলম একটু ব্যতিক্রম। বুয়েটের আর্কিটেকচার পড়ুয়া শরিফুল অ্যানিমেশন ছবি নিয়ে কাজ করতে চান। ইতিমধ্যে একটু একটু করে অ্যানিমেশন ছবি বানাতে শুরু করেছেন তিনি। তাঁকে অনুপ্রেরণা দেন জাপানি নির্মাতা হায়ায়ো মিয়াজাকি। বললেন, মিয়াজাকি এত ডিটেইলে জাপানের ছবি আঁকেন যে অবাক হতে হয়। জাপানের উপকথাগুলো নিয়ে কাজ করেন তিনি। এমন ছবিই বানানোর স্বপ্ন দেখেন শরিফুল। দেখেই যেন মানুষ বুঝতে পারে, এটি বাংলাদেশের গল্প।
বাংলাদেশের ছবির নিজস্ব ভাষা তৈরি করতে চান সাইয়্যিদ শাহজাদা আল কারীমও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগে পড়েন তিনি। বিশ্বসভায় বাংলাদেশের ছবি একটি সম্মানজনক অবস্থায় যাক, এমনটাই তাঁর চাওয়া। স্বপ্ন দেখেন, সারা জীবনে অন্তত দুটি এমন সিনেমা বানাবেন, যাতে বাংলাদেশের গল্প থাকবে।
স্বপ্নের উল্টো পিঠে আরেকটি দিকও থাকে। সে দিকটা দেখালেন মাহবুবা চৌধুরী। সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেন। দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন একটি চলচ্চিত্র সংসদের সঙ্গে। বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজ করছেন। কয়েকটি কাহিনিচিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন। সেগুলো দেশব্যাপী প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিও পেয়েছে।
মাহবুবা বললেন, এখনো মূলধারার পেশা হিসেবে ছবি নির্মাণকে কেউ দেখতে চান না। নতুনদের ছবিতে টাকা ঢালতে চান না অনেকে। প্রাযুক্তিক কাজগুলো জানাশোনা মানুষ এখনো অনেক কম। সিনেমা বানানোর সত্যিকার আগ্রহী মানুষের মধ্যে যোগাযোগের কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই, এটাও একটা বড় সমস্যা তাঁর কাছে। তবু এরই মধ্যেও স্বপ্ন দেখেন তিনি। ছবি বানানো এখন তাঁর কাছে একটা সামাজিক দায়িত্ব।
চ্যালেঞ্জ যে আছে, সেটা অন্যরাও মানেন। তবে এই তরুণেরা নিজেদের অনুপ্রেরণা খুঁজে নিতে চান আকিরা কুরোসাওয়া, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মাজিদ মাজিদি, ঋতুপর্ণ ঘোষ, জেমস ক্যামেরনের মধ্যে। এ দেশের জহির রায়হান, আলমগীর কবির, তারেক মাসুদও কয়েকজনের আইডল। তাঁদের মতে, তাঁরা প্রত্যেকেই সিনেমার জন্য নিজেদের আলাদা ভাষা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু প্রাযুক্তিক বিষয়-আশয় নয়, সিনেমায় গল্প কীভাবে বলা হবে, সেটাও তাঁদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
নির্মাতা হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও কেউ কেউ নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ দাম দিচ্ছেন অভিজ্ঞতার। তাঁরা যেন জার্মান নির্মাতা ভার্নার হার্জগের অনুসারী। হার্জগ বলেছিলেন, ‘পাঁচ বছর ফিল্ম স্কুলে পড়ার চাইতে দুই হাজার মাইল একা পায়ে হাঁটা ভালো। এই হাঁটার সময় অবশ্যই লিখে রাখতে হবে নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।’
আসলে নির্মাতা হওয়ার তো বাঁধাধরা রাস্তা বাতলানো কঠিন। মার্কিন পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ যেমন বলেন, ‘সিনেমা দেখার স্বপ্ন দেখার চেয়ে সিনেমাটা বানিয়ে ফেলাই ভালো। কেবল প্রতিদিনের ভুল করতে করতে শিখতে পারতে হবে।’