সেই প্রিয় মুখ, ফেলে আসা দিন

পাস করে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন আগেই। সমাবর্তন উপলক্ষে আবার সবাই একসঙ্গে, চেনা সেই ক্যাম্পাসে। অনুষ্ঠানে সমাবর্তন টুপি আকাশে ছুড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রাক্তন িশক্ষার্থীর উচ্ছ্বাস l ছবি: সংগৃহীত
পাস করে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন আগেই। সমাবর্তন উপলক্ষে আবার সবাই একসঙ্গে, চেনা সেই ক্যাম্পাসে। অনুষ্ঠানে সমাবর্তন টুপি আকাশে ছুড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রাক্তন িশক্ষার্থীর উচ্ছ্বাস l ছবি: সংগৃহীত

পরনে কালো গাউন, মাথায় টুপি—সবারই এক পোশাক। দলে দলে ভাগ হয়ে চলছে আড্ডা। আশপাশ থেকে ভেসে আসছে আবেগময় শব্দ—‘কত দিন পর...’, ‘বদলে গেছিস অনেক’। কেউ কেউ গলা ছেড়ে গাইছেন গান। আর অনেকে মশগুল ফেলে আসা দিনের কথায়। ক্লাস, রাজনীতি, প্রেম কোনোটাই যেন বাদ নেই সেই স্মৃতিচারণায়। ক্ষণে ক্ষণে হাসির রোল, খুনসুটি।
চতুর্থ সমাবর্তনকে ঘিরে গত রোববার পুরোনো শিক্ষার্থীদের পদচারণে এমনই জমজমাট ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। আট বছর পর অনুষ্ঠিত এই সমাবর্তনে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ হাজার ১৯৪ জন প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও গবেষক।
সমাবর্তনের দিন কলা অনুষদের ঝুপড়িতে বন্ধুদের নিয়ে গানে মশগুল দেখা যায় বাংলা বিভাগ থেকে পাস করা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে। তাঁদের একজন শামসুল আরেফিন। এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে সমাবর্তনে এসেছেন স্ত্রীকে নিয়ে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঝুপড়িতে বসেই ক্লাসের পর বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। বন্ধুদের আজ আবার কাছে পেয়ে গান করার সেই লোভ সামলাতে পারছি না।’
একইভাবে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় দেখা যায় বিজ্ঞান অনুষদের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সাজ্জাদুল ইসলামকে। তিনি জানান, পড়ালেখা বিজ্ঞান অনুষদে হলেও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সামনেই চলত আড্ডা। সমাবর্তনে এসেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

প্রিয় বন্ধুকে কাছে পেয়ে ‘সেলফি’ তোলা হবে না, তা কী করে হয়!

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের পাশের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এবারের সমাবর্তন। অনুষ্ঠানের আশপাশে তাই প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ভিড় ছিল বেশি। গান আর আড্ডা এই স্থানটিতে কম থাকলেও ছিল গাউন-টুপি পরে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার হিড়িক আর হইহুল্লোড়। ক্যামেরার ক্লিক থেকে শুরু করে মুঠোফোনে সেলফি—কোনোটাই যেন বাদ যাচ্ছে না।
সহপাঠীদের সঙ্গে ‘সেলফি’ তোলার ফাঁকে পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক অনুপম শীল বললেন, ‘চাকরির সুবাদে প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। কিন্তু একসঙ্গে বন্ধুবান্ধবদের পাওয়ার এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’
আইন অনুষদের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এরফানুল হক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর অপেক্ষায় ছিলাম এই সমাবর্তনটির জন্য। আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ নেওয়ার ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে, এ কথা ভাবতেই ভালো লাগছে।’
বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শাহীন আক্তার জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার সময় হলেই থাকতেন তিনি। সমাবর্তনের আগের রাত তাই হলেই কাটিয়েছেন। দিনটাও ছিল হল–বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়। একই বিভাগের শিক্ষার্থী আয়াজ মাবুদ বলেন, ‘আমি আর আমার স্ত্রী একই বিভাগ থেকে পাস করেছি। দুজন একসঙ্গে আসতে পেরে ভালো লাগছে।’
শুধু প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাই নন, অগ্রজদের সঙ্গে দেখা করতে ক্যাম্পাসে ছুটে যান সম্প্রতি পাস করা অনেক শিক্ষার্থীর পাশাপাশি পড়ুয়ারাও।
শহীদ মিনারের সামনে ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সাব্বির ইরফান বলেন, ’আশা ছিল এই সমাবর্তনেই সনদ পাব। বিশ্ববিদ্যালয় সেই সুযোগ না দিলেও সিনিয়র ভাইবোনদের সঙ্গে দেখা করার লোভ সামলাতে পারিনি। তাই চলে এসেছি।’
ইংরেজি বিভাগ থেকে ২০১২ সালে পাস করা শিক্ষার্থী মো. সোহেল বলেন, ‘নিজেরা সনদ না পেলেও ক্যাম্পাসে এসেছি সমাবর্তন দেখতে। সবার সঙ্গে মজা করে কেটেছে দিন।’
এদিকে ক্যাম্পাসের মতো সমাবর্তনকে ঘিরে শাটল ট্রেনও ছিল পড়ুয়া আর পুরোনোদের আড্ডা। শাটলের বগিতে বগিতে ছিল গানের আসর। ভেসে আসে ‘কফি হাউসের সেই আড্ডা আজ আর নেই’, ‘বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব বিকেলবেলায়’, ‘আজই দুঃখ ভোলার দিন, আজ মন হবে যে রঙিন’সহ নানা গান।