
জনশূন্য শিশু পাঠকক্ষ। এক কোণে বসে বই পড়ছিলেন ২০-২২ বছরের এক তরুণ। পাঠকক্ষের দায়িত্বে যিনি ছিলেন তাঁর নাম সুরমা বেগম। পদবি জানতে চাইলে বলেন, তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মী। পাঠকক্ষ সহকারী বাইরে আছেন বলে দায়িত্ব পালন করছেন।
২৪ এপ্রিল দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেল। কেবল শিশু পাঠকক্ষে নয়, তৃতীয় তলার বিজ্ঞান পাঠকক্ষেও বুক শর্টারের (বই বাছাইকারী) দায়িত্ব পালন করছিলেন অফিস সহায়ক সাহেদ উল্লাহ সিদ্দিকি।
প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবেই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দিয়ে পাঠকক্ষের কাজ চালানো হচ্ছে বলে জানায় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ। জনবলের অভাবে পাঠকের চাহিদা মেটানো বা বই-পত্রিকা সংরক্ষণের কাজ হচ্ছে না ঠিকমতো। জনবল–সংকটের পাশাপাশি নানা সমস্যার পাহাড় জমেছে এই পাঠাগারে। পাঠকক্ষে পড়তে আসা পাঠকেরা হালনাগাদ বই পান না বলে অভিযোগ করলেন। এ ছাড়া গ্রন্থাগারের ভবন পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লেও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ভবনের অধিকাংশ শৌচাগার নষ্ট। নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা। জেনারেটর না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে পড়া বন্ধ করে বসে থাকতে হয় পাঠকদের।
গণগ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৩ সালে যাত্রা শুরু এই গণগ্রন্থাগারের। ১৯৮৮ সালে নির্মিত চারতলা গ্রন্থাগারের শিশু পাঠকক্ষ, পত্রপত্রিকা ও রেফারেন্স, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য এবং সাধারণ পাঠকক্ষ নামের চারটি কক্ষ রয়েছে। বইয়ের সংখ্যা ৯০ হাজার। প্রতিবছর নতুন বই যোগ হলেও পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী বই আসে কমই। তবে এত সব সমস্যার মধ্যে লোকবল–সংকট ছাপিয়ে গেছে সবকিছুকে।
গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক ও সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, গ্রন্থাগারের ৪২টি পদের মধ্যে একজন সহকারী গ্রন্থাগারিকসহ ২১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ খালি। ছয়টি পাঠকক্ষ সহকারীর পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন, বুক শর্টারের চারটি পদের মধ্যে আছেন একজন, অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটরের তিনটি পদের একজনও কর্মরত নেই। কর্মরত দুই কর্মকর্তা বাদে ১৯ জন হলেন দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তাঁদের অনেকেই আবার প্রশাসনিক কাজ করেন। সে কারণে পাঠকক্ষের জন্য অল্প কয়েকজন লোকই পাওয়া যায়। বাধ্য হয়েই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা পাঠকক্ষ সহকারী ও বুক শর্টারের কাজ করছেন।
তিনি জানান, শনি থেকে বুধবার সপ্তাহের পাঁচ দিন প্রতিটি পাঠকক্ষ খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা এবং দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা এই দুই পালায় প্রতিটি পাঠকক্ষে দুজন করে চারজন কর্মচারী থাকার কথা। অথচ এখন প্রতি পালায় একজন করে দায়িত্ব পালন করেন।
সরেজমিন চিত্র: গ্রন্থাগারে দৈনিক এক থেকে দেড় শ পাঠক পড়তে আসেন বলে জানালেন কর্মকর্তারা। ২৪ এপ্রিল দুপুর ১২টায় গ্রন্থাগারের চারটি পাঠকক্ষে সব মিলিয়ে ২৫ জন পাঠক দেখা গেছে। এর মধ্যে শিশু পাঠকক্ষে একজন এবং বিজ্ঞান পাঠকক্ষে চারজন পাঠক ছিলেন। পাঠক সংখ্যা কমেছে কি না—এমন প্রশ্ন করলে নিয়মিত পড়তে আসা পাঠকেরা জানান, আগের চেয়ে অনেক কমেছে। বর্তমানে এই গ্রন্থাগারের নিবন্ধিত পাঠকের সংখ্যা মাত্র দেড় শ জন, যাঁরা বাড়িতেও বই নিয়ে যেতে পারেন। পাঠকেরা জানান, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা একসময় দল বেঁধে এখানে আসতেন। হালনাগাদ বইপত্র না থাকায় এখন পাঠক অনেক কমে গেছে।
এখানকার নিয়মিত পাঠক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক ডিগ্রি শেষ করা ইমন পাল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ের রেফারেন্স বই হালনাগাদ না হলে সেটা কাজে আসে না। এমন বই না থাকায় দিন দিন পাঠক সংখ্যা কমছে। নিরিবিলি পরিবেশে পড়াশোনা করতে কেউ কেউ পাঠাগারে আসেন। তবে নিরুপদ্রবে পড়া যায় না সব সময়। আশপাশে নানা সভা ও অনুষ্ঠানের মাইকের শব্দে পড়ায় ব্যাঘাত ঘটে। বিদ্যুৎ চলে গেলে বই বন্ধ করে বসে থাকতে হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর ছাত্র নিক্সন ঘোষের সঙ্গে কথা হয় তৃতীয় তলার বিজ্ঞান পাঠকক্ষে। তিনিও হালনাগাদ বই না থাকার অভিযোগ করলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি রেফারেন্স বই পাঁচ থেকে দশ বছরের পুরোনো। হালনাগাদ বই থাকলে অনেক উপকার হতো। বাসায় পড়ার পরিবেশ নেই বলে এখানে পড়তে আসি। এ ছাড়া সপ্তাহের পাঁচ দিন খোলা থাকে পাঠাগার। পাঠকদের সুবিধার্থে ছয় দিন খোলা রাখা উচিত। বাড়ানো উচিত প্রতিদিনকার সময়সীমাও।’
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন: ৪৬ হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর নির্মিত গ্রন্থাগার ভবনটি ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিলের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এই ভবনের অনেক কক্ষের মেঝে দেবে যায়। ছোটখাটো সংস্কার হলেও ভবনের সেই ক্ষত সারেনি এখনো। প্রশাসনিক কক্ষের দেয়াল, ইবাদতখানা, তৃতীয় তলায় সিঁড়ির দেয়াল ও পাঠকক্ষগুলোর দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা গেছে। দেবে গেছে ভবনের উত্তর দিকের মেঝে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আব্বাস আলী বলেন, ২০০৬-২০০৭ সালের দিকে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা ভবনটি ঘুরে দেখে প্রতিবেদন দেন। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আপাতত কাজ চালিয়ে যেতে বলেন তাঁরা। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রঙের কাজ হয়েছে। স্থায়ী সংস্কার হচ্ছে না কেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণগ্রন্থাগার ও পাশের মুসলিম হল ভবন ভেঙে সেখানে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সে কারণে বড় ধরনের সংস্কারকাজ হচ্ছে না। তবে ব্রিটিশ কাউন্সিল সম্প্রতি একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় পাঠাগার আধুনিকায়ন হবে।
স্ট্যাক রুমে পোকা: পাঠাগারে গবেষকদের সুবিধার্থে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো পত্রিকা স্ট্যাক রুমে (সংরক্ষণ কক্ষ) সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এই সংরক্ষণ কক্ষ এমনিতে তালা দেওয়া থাকে। তবে পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী পত্রিকা এনে দেওয়া হয়। কক্ষটিতে কী পরিবেশে পত্রিকা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা তালা খুলে দেন। কক্ষের সব বাতিই ছিল নষ্ট। এ ছাড়া কাচবিহীন বইয়ের তাকে জমেছে পুরো ধুলার আস্তর। বাঁধাই করা কয়েকটি পুরোনো পত্রিকা নিয়ে দেখা গেল প্রতিটি পাতা পোকায় কাটা।
স্ট্যাক রুমের পত্রিকায় পোকা কেন, জানতে চাইলে প্রিন্সিপাল লাইব্রেরিয়ান আবারও লোকবলসংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এমন একটি বিশেষায়িত শাখার জন্য পাঠাগারে আলাদা লোক রাখা উচিত। এখানে কাজ জানা লোকের অভাব আছে। সরকার অনেক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়, অথচ লোক পাওয়া যায় না। যে যোগ্যতা চাওয়া হয়, সেই যোগ্যতা নিয়ে কম বেতনে কেউ কাজ করতে চায় না।