এই পাখিকে কেন হরিণ, জিরাফ, গন্ডারের মতো তৃণভোজীদের ‘রক্ষী’ বলা হয়

আলোকচিত্রী আর্নেস্ট পোর্টারের ‘মিউচুয়াল ফ্রেন্ডস’ ছবিটি
ছবি: ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার

৬২তম ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় জমা পড়া ছবিগুলোর মধ্যে ১০০টি নিয়ে একটি ফটো গ্যালারি প্রকাশ করেছে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম। নির্বাচিত ছবিগুলোর একটি দক্ষিণ আফ্রিকার আলোকচিত্রী আর্নেস্ট পোর্টারের ‘মিউচুয়াল ফ্রেন্ডস’। ছবিতে দেখা যায়, একটি রেড-বিল্ড অক্সপেকার গন্ডারের মুখের কাছে বসে তার ঠোঁট গন্ডারের চামড়ায় ঘষছে। ছবিটি তোলা হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার মানিয়েলেতি গেম রিজার্ভে।

গন্ডার আর ছোট্ট এই পাখির ছবিটির পেছনে রয়েছে বন্য প্রাণীর দুই প্রজাতির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। রেড-বিল্ড অক্সপেকার শুধু গন্ডার নয়, জিরাফ, জেব্রা ও হরিণের মতো বড় তৃণভোজী প্রাণীর শরীরেও বসে খাবার খোঁজে। এসব প্রাণীর শরীরে থাকা মাছি, উকুন, টিকসহ বিভিন্ন পরজীবী তার খাবারের অন্যতম উৎস। ফলে বড় প্রাণীর শরীর হয়ে ওঠে পাখিটির খাবার খোঁজার সুবিধাজনক জায়গা।

অক্সপেকার এসব প্রাণীর শরীর থেকে খাবার সংগ্রহ করে। এতে পাখিটির খাবারের জোগান হয়, আর প্রাণীরাও শরীরের কিছু পরজীবী কমার সুবিধা পেতে পারে। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ভাষ্য অনুযায়ী, অক্সপেকার তৃণভোজী প্রাণীর শরীরে থাকা পরজীবীর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।

সম্ভাব্য বিপদ এগিয়ে এলে পাখিটি অস্থির হয়ে ওঠে এবং ডাক দিয়ে সতর্ক করতে পারে

বিপদ দেখলে সতর্ক করে

রেড-বিল্ড অক্সপেকার শুধু খাবার খোঁজে না, বড় তৃণভোজী প্রাণীর সঙ্গে তার আরেক ধরনের সম্পর্কও রয়েছে। গন্ডারের দৃষ্টিশক্তি খুব ভালো নয়। অন্যদিকে অক্সপেকার গন্ডার, জিরাফ বা অন্য প্রাণীর পিঠে বসে আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। সম্ভাব্য বিপদ এগিয়ে এলে পাখিটি অস্থির হয়ে ওঠে এবং ডাক দিয়ে সতর্ক করতে পারে। ফলে প্রাণীটিও আশপাশের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার সুযোগ পায়।

এ কারণেই অক্সপেকারকে অনেক সময় গন্ডারসহ বিভিন্ন বড় তৃণভোজী প্রাণীর ‘রক্ষী’ বা ‘প্রহরী’ বলা হয়। সোয়াহিলি ভাষায় এই পাখির একটি নাম ‘আসকারি ওয়া কিফারু’, যার অর্থ ‘গন্ডারের রক্ষী’। নামটিও গন্ডারের সঙ্গে পাখিটির বিশেষ সম্পর্কের ধারণাটি তুলে ধরে।

‘মিউচুয়াল ফ্রেন্ডস’

এই সম্পর্কের কারণেই আর্নেস্ট পোর্টার তাঁর ছবির নাম দিয়েছেন ‘মিউচুয়াল ফ্রেন্ডস’—পারস্পরিক বন্ধু। ছবিটি তোলার সময় পোর্টার গন্ডারের শরীরে থাকা অক্সপেকারকে তার ঠোঁট পরিষ্কার করতে দেখেছিলেন। সেই মুহূর্তই ক্যামেরায় ধরে রাখেন তিনি। ছবিতে গন্ডারের চোখের চারপাশে নীলচে একটি বলয়ও দেখা যায়, যা আলোকচিত্রীকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

ইমপালার মাথায় বসেছে রেড-বিল্ড অক্সপেকার

প্রকৃতিতে এমন সম্পর্কের উদাহরণ কম নয়। কোনো প্রাণী অন্য প্রাণীর শরীর থেকে খাবার সংগ্রহ করে, আবার সেই কাজের মাধ্যমে অন্য প্রাণীও উপকৃত হয়। রেড-বিল্ড অক্সপেকার ও গন্ডারসহ বড় তৃণভোজী প্রাণীর সম্পর্ক তারই একটি দৃষ্টান্ত। একজনের জন্য এটি খাবারের সন্ধান, অন্যজনের জন্য পরজীবীর চাপ কমার সুযোগ। আবার বিপদের মুহূর্তে সেই ছোট পাখিই হয়ে উঠতে পারে সতর্কবার্তার উৎস।

জীববিজ্ঞানের ভাষায়, দুই ভিন্ন প্রজাতির এমন সম্পর্কে উভয় পক্ষ উপকৃত হলে তাকে ‘মিউচুয়ালিজম’ বলা হয়।

এবারের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতার ১০০টি নির্বাচিত ছবি ১৬ অক্টোবর থেকে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হবে। প্রতিযোগিতার বিভাগীয় বিজয়ী, গ্র্যান্ড টাইটেল ও ইয়াং গ্র্যান্ড টাইটেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে ১৩ অক্টোবর।

সূত্র: ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক