ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের ভেন্যুতে শোভা পাচ্ছে জিহানের আঁকা দেয়ালচিত্র

ফাইনালসহ বিশ্বকাপ ফুটবলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ভেন্যু মেটলাইফ। নিউইয়র্কের এই স্টেডিয়ামের ভিআইপি লাউঞ্জে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জিহান ওয়াজেদের আঁকা দেয়ালচিত্র। শিল্পীর গল্প শোনাচ্ছেন তোফাজ্জল হোসেন

নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ভিআইপি লাউঞ্জে শোভা পাচ্ছে জিহান ওয়াজেদের আঁকা এই দেয়ালচিত্র
ছবি: জিহান ওয়াজেদের সৌজন্যে

জিহান ওয়াজেদের কাজ সম্পর্কে জানতে তাঁর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে ঢুঁ মেরেছিলাম। সেখানে ‘ম্যুরাল’ বিভাগে বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতির চিরচেনা একটা দৃশ্যে চোখ আটকে গেল। নৌকায় বসে এক কিশোরী শাপলা তুলছে। ছবির এক কোণে বাংলায় লেখা ‘এক ছোঁয়ায় স্বজনের কাছে’।

‘মেমোরি অব বাংলাদেশ’ নামের এই দেয়ালচিত্রটি একটি আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অ্যাপের জন্য এঁকেছিলেন জিহান। বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য উপহার হিসেবে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের একটি ভবনের দেয়ালে এটি আঁকা হয়েছিল।

ওয়েবসাইটে ‘মেমোরি অব বাংলাদেশ’–এর নিচেই আরেকটি দেয়ালচিত্রের ছবি—‘চেজিং ড্রিমস: আ জার্নি থ্রু বাংলাদেশি হেরিটেজ’। শর্ষে ফুলের হলুদ মাঠের মধ্য দিয়ে বাংলা বর্ণমালার দিকে ছুটে যাচ্ছে তিন শিশু। বৈচিত্র্যের শহর নিউইয়র্কে নিজেদের বাংলাদেশি শিকড়, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার গল্পই যেন রঙে রঙে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী।

জিহান ওয়াজেদের শিল্পকর্মের প্রতি আমার এই হঠাৎ আগ্রহের পেছনের কারণ অবশ্য ফুটবল বিশ্বকাপ। এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ভেন্যুগুলোর একটি নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। ফাইনালসহ গ্রুপ ও নকআউট পর্বের একাধিক ম্যাচ এখানেই হচ্ছে। আর এই স্টেডিয়ামের ভিআইপি লাউঞ্জেই শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জিহান ওয়াজেদের আঁকা ৪০ ফুট দীর্ঘ ও ১৬ ফুট উঁচু এক বিশাল দেয়ালচিত্র। নিউইয়র্কের রাজপথে গ্রাফিতি আঁকা এক বাংলাদেশি কীভাবে বিশ্বকাপের ফাইনালের ভিআইপি লাউঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছালেন—সেই গল্প জানতেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি।

নিজের আঁকা দেয়ালচিত্রের সামনে শিল্পী জিহান ওয়াজেদ

তাঁর বাবা ডা. ওয়াজেদ খানের মাধ্যমে জিহানের সঙ্গে যোগাযোগ। ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি জানালেন বিশ্বকাপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার গল্প।

নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সি বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগে থেকেই কাজ করছিলেন তিনি। সেই সূত্রেই ২০২৫ সালের শুরুতে মেটলাইফ স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে চুক্তি করে। প্রায় দুই সপ্তাহের টানা পরিশ্রমে শেষ হয় দেয়ালচিত্রটির কাজ। সেখানে রঙের ভাষায় ফুটে উঠেছে নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়।

জিহান বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজের শিল্পকর্ম স্থান পাওয়া যেমন বড় অর্জন, তেমনি প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে এটি তাঁর জন্যও গর্বের।

১৯৯১ সালে লিবিয়ার বেনগাজিতে জিহান ওয়াজেদের জন্ম। ১৯৯৪ সালে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন তিনি। নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সের জ্যামাইকায় বেড়ে ওঠা জিহানের শিল্পীসত্তা গড়ে উঠেছে শহরটির বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে। কিন্তু তাঁর শিল্পকর্মের গভীরে মিশে আছে বাংলাদেশের রং, প্রকৃতি ও স্মৃতি। তাঁর বহু চিত্রকর্মেই ফিরে আসে সবুজ আর লালের আধিক্য। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার ভেতরের পুরোটা জুড়েই তো বাংলাদেশ। তাই নিজের অজান্তেই ক্যানভাসে আমার প্রিয় পতাকার রং ছড়িয়ে পড়ে।’

জিহান ওয়াজেদের দেয়ালচিত্র ‘মেমোরি অব বাংলাদেশ’

শিল্পী হওয়ার গল্প

ম্যানহাটানের স্টাইভেস্যান্ট হাইস্কুলে পড়ার সময় প্রতিদিন সাবওয়েতে যাতায়াত করতেন জিহান। ট্রেনের দেয়ালের গ্রাফিতি আর রাস্তার শিল্পীদের পরিবেশনা তাঁকে মুগ্ধ করত। খাতার পর খাতা ভরে তুলতেন গ্রাফিতির নকশায়। ইউটিউব দেখে নিজেই শিখেছিলেন হিপ-হপ নাচ। স্কুলজীবন শেষ হওয়ার আগেই নিউইয়র্কের আন্ডারগ্রাউন্ড সংস্কৃতিতে একজন গ্রাফিতি শিল্পী ও ফ্রিস্টাইল নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।

চারুকলায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর নেই। ম্যাকলে অনার্স স্কলার হিসেবে বারুখ কলেজ থেকে ২০১৩ সালে পারসেপচুয়াল সাইকোলজিতে (উপলব্ধিমূলক মনোবিজ্ঞান) স্নাতক করেন। মানুষের দৃষ্টি ও মস্তিষ্ক কীভাবে দৃশ্যকে গ্রহণ ও ব্যাখ্যা করে, সেই অধ্যয়নই তাঁর শিল্পচিন্তাকে নতুন মাত্রা দেয়। গ্রাফিতি থেকে ক্যানভাসে আসার পর তাঁর শিল্প হয়ে ওঠে আরও বিমূর্ত, প্রতীকী ও মনস্তাত্ত্বিক। জিহানের ভাষায়, এমন শিল্পকর্ম তৈরি করতে চান তিনি, যেখানে প্রত্যেক দর্শক নিজের মতো করে পরিচিত কোনো রূপ বা অনুভূতি খুঁজে পাবেন। তাঁর কাছে শিল্প শুধু ছবি নয়, মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরির মাধ্যম।

স্নাতক শেষ করার পর ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপদ পেশার বদলে বেছে নেন শিল্পীর জীবন। ছোট ছোট প্রদর্শনী দিয়ে শুরু। পরে তাঁর একক প্রদর্শনীতে নিউইয়র্কের করপোরেট জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। সেখান থেকেই খুলে যায় বড় বড় প্রকল্পের দুয়ার।

শিল্পী জিহান ওয়াজেদ

আজ নিউইয়র্কের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় রয়েছে তাঁর শিল্পকর্ম। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ওকুলাস, জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৪, আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়াম, কুইন্স হাসপাতাল, ডাইভার্সিটি প্লাজাসহ বিভিন্ন স্থানে আছে তাঁর তুলির ছোঁয়া। কুইন্স হাসপাতালে প্রায় ১ হাজার ২৫০ বর্গফুটের ম্যুরাল কিংবা অ্যাস্টোরিয়ায় ৭০০ ফুট দীর্ঘ অগমেন্টেড রিয়ালিটি ম্যুরাল তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ।

ম্যানহাটানের থ্রি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ৭১তম তলায় তাঁর স্টুডিও। আকাশছোঁয়া সেই স্টুডিওতেই নতুন নতুন শিল্পকর্মে নিয়ে ডুবে থাকেন তিনি। ২০২৫ সালে প্যারিসের একটি আন্তর্জাতিক শিল্পপ্রদর্শনীতেও প্রশংসিত হয়েছে তাঁর কাজ। শুধু ক্যানভাস নয়, বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পোশাক ও জুতার নকশাতেও কাজ করেছেন তিনি। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, কোরিওগ্রাফি ও নিউ মিডিয়া—সব মিলিয়ে তিনি একজন বহুমাত্রিক শিল্পী।

মা পারভীন আক্তারের উৎসাহেই ছোটবেলা থেকে শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে বড় হয়েছেন জিহান। তাঁর একমাত্র বড় বোন বুসরা ওয়াজেদ একজন চিকিৎসক। আর জিহান নিজে সাউথ এশিয়ান ইয়ুথ অ্যাকশনের (সায়া) সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন প্রজন্মের অভিবাসী তরুণদের পাশে দাঁড়ান—যে প্রতিষ্ঠান একসময় তাঁকেও পথ দেখিয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই প্রতি দুই-এক বছর পরপর আমরা বাংলাদেশে যাই। আমাদের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর। তবে সারা দেশই ঘুরি। বাংলাদেশের প্রকৃতি, নদী, গ্রাম, মানুষের মুখ—সবকিছু আমার অবচেতন মনে রয়ে গেছে।’