আমাদের দেশে ব্যাটারি তৈরির প্রয়োজনীয় উপাদানের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে যেমন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তেমনি সামগ্রিক খরচও বাড়ে। এই আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই স্থানীয় সম্পদ, কৃষিজ অবশিষ্টাংশ ও শিল্পবর্জ্য ব্যবহার করে ব্যাটারির কাঁচামাল তৈরির গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. আরাফাত রহমান ও তাঁর দল। চুয়েটে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ন্যানোম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমস ল্যাবরেটরিতে (নেস ল্যাব) চলছে গবেষণা। এরই মধ্যে গবেষণাটি অ্যাডভান্সড এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি রিসার্চ জার্নালে স্থান পেয়েছে।
একটি ব্যাটারি মূলত চারটি প্রধান অংশ নিয়ে তৈরি হয়—অ্যানোড, ক্যাথোড, সেপারেটর ও ইলেকট্রোলাইট। এর মধ্যে অ্যানোড তৈরিতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান, যেমন নিকেল ও টাইটেনিয়াম সাধারণত বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অধ্যাপক আরাফাতের গবেষণায় দেখা গেছে, নিমপাতা ও আমপাতা ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ধাতব কণা সংশ্লেষণ করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাটারি-উপযোগী নিকেল ও টাইটেনিয়ামভিত্তিক উপাদান তৈরিতে সফল হয়েছেন তাঁরা।
বাজারে যেখানে এক কেজি টাইটেনিয়ামের দাম প্রায় ৬৯ হাজার টাকা, সেখানে গবেষণাগারে নিমপাতা ও আমপাতা ব্যবহার করে প্রায় দুই হাজার টাকায় একই ধরনের উপাদান প্রস্তুত করে দেখিয়েছেন তাঁরা। গবেষকদের মতে, প্রযুক্তিটি শিল্প পর্যায়ে প্রয়োগ করা গেলে উৎপাদন ব্যয় আরও কমে আসবে।
শুধু নিমপাতা-আমপাতাই নয়, কাঁচামাল হিসেবে পাটকাঠিও ব্যবহার করেছেন তাঁরা। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অ্যানোডে ব্যবহৃত গ্রাফাইট মূলত কার্বনের একটি বিশেষ রূপ। সেই কার্বনের উৎস হিসেবেই পাটকাঠিকে ব্যবহার করেছেন অধ্যাপক আরাফাত ও তাঁর দল।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিল্পবর্জ্যের পুনর্ব্যবহার। দেশের বিভিন্ন ইস্পাত কারখানায় উৎপন্ন স্টিল স্ল্যাগ (গলিত লোহাকে বিশুদ্ধ করার সময় সৃষ্ট উপজাত) সাধারণত পরিবেশদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এ গবেষণায় সেই বর্জ্যই লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ক্যাথোড তৈরিতে ব্যবহৃত হবে। এতে একদিকে পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে মূল্যবান কাঁচামালের বিকল্প উৎসও পাওয়া যাবে।
চুয়েটের মেকানিক্যাল ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য থাকে—বর্তমান বাজারমূল্যের তুলনায় কম খরচে কীভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে একটি উপাদান তৈরি করা যায়। পাশাপাশি পরিবেশও যেন সুরক্ষিত থাকে। এমন কাজই করেছেন অধ্যাপক আরাফাত। এটি বড় পরিসরে করা গেলে আমাদের আমদানিনির্ভরতা কমবে। খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে। সাশ্রয়ী ব্যাটারিপ্রযুক্তি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি। এতে ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়তে পারে, জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমতে পারে।’
অধ্যাপক আরাফাত রহমানের গবেষণাগারে কাজ করেছেন চুয়েটের মেকাট্রনিকস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসমিয়া বিনতে হাই। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনে পিএইচডি করছেন। তিনি বলেন, ‘আরাফাত স্যারের তত্ত্বাবধানে আমি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে তাঁর গবেষণাগারে কাজ করেছি। এ গবেষণা পরবর্তী প্রজন্মের ব্যাটারিপ্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
অধ্যাপক আরাফাত রহমান বলেন, ‘নিমপাতা, আমপাতা, পাটকাঠি কিংবা স্টিল স্ল্যাগের মতো অনেক উপাদান আমাদের চারপাশেই আছে, যেগুলোকে আমরা সাধারণত বর্জ্য বা অবহেলিত উপকরণ হিসেবে দেখি। কিন্তু সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এগুলো থেকেই মূল্যবান ব্যাটারি উপকরণ তৈরি করা সম্ভব। এ ধরনের গবেষণা যদি বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ শক্তি সংরক্ষণ প্রযুক্তি ও ব্যাটারি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে পারবে।’