ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া স্বচক্ষে দেখতে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের গাজীপুরের কারখানায় গিয়েছিলেন সজীব মিয়া

কারখানার মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই স্যামসন এইচ চৌধুরীর প্রতিকৃতি দৃষ্টি কাড়ল। সামনে মুখোমুখি দুটি ভবন। বাঁয়ের ভবনের দেয়ালে স্কয়ারের স্বপ্নদ্রষ্টার ছবি। ডানের ভবনের দেয়ালে স্কয়ারের লোগো। এই দুই ভবন পাশে রেখে আমরা কারখানা চত্বরের আরও ভেতরে অ্যামেনিটি ভবনের সামনে গিয়ে থামি। লেকপাড়ের এই ভবনের নিচতলায় ক্যানটিন আছে।
কাচঘেরা ক্যানটিন থেকে বাইরের মনোরম দৃশ্য মন ও দৃষ্টি—দুই–ই কাড়ে। লেকের মাঝামাঝি ফোয়ারায় জলের অবিরত নৃত্য। সেটা ছাড়িয়ে অন্য পাড়ে বাংলো। গাছগাছালিতে ঘেরা বাংলোটি স্প্যানিশ স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। লেকের অন্য প্রান্তে ডান দিকে নতুন প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ চলছিল।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ঘেঁষেই স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের এই কারখানা। স্কয়ারের কর্মীদের কাছে ‘ঢাকা ইউনিট’। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ইউনিটের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল মামুন আমাদের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেন।
১৯৫৮ সালে পাবনায় শুরু হয় স্কয়ারের কার্যক্রম। বড় ওষুধ কারখানাটি এখনো সেখানে আছে। ২০০২ সালের শেষ দিকে গাজীপুরের এই কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় ১৭৫ একর জায়গা নিয়ে গড়া কারখানাটির নকশা করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বোভিস লেনড লিজ। এখানে পাঁচটি প্ল্যান্টের কোনোটিতে তৈরি হয় ট্যাবলেট–ক্যাপসুল, কোনোটিতে সেফালোস্পোরিন গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক, ইনজেকশন ও চোখের ওষুধ, আছে ইনসুলিন তৈরির আলাদা ইউনিট। এই ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছে একাধিক বিভাগ। যেগুলোতে কাজ করেন প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কর্মী। এই কর্মীরা পালা করে দিন–রাত কারখানাটিকে চালু রাখেন।
অ্যামেনিটি ভবনের সামনেই একটি গলফ কার্ট। বৈদ্যুতিক গাড়িটি চালিয়ে আমাদের সামনের ফরমুলেশন ইউনিট–৫–এ নিয়ে চলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। বাঁয়ে ফাঁকা মাঠ। ডানে কিছু ছোট ছোট গাছ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কারখানায় আসা অতিথিরা রোপণ করেছেন এসব চারা। প্রতিটি গাছের সঙ্গেই আছে তাঁদের পরিচিতি।
ফরমুলেশন ইউনিট–৫–এর সামনে এসে থামে গলফ কার্ট। ২০১৪ সালে এই ইউনিট চালু হয়। বছরে ৮০০ কোটি ট্যাবলেট ও ২০০ কোটি ক্যাপসুল উৎপাদনের সক্ষম এই ইউনিট। এখানকার মিটিং রুমে স্কয়ারের মহাব্যবস্থাপক (কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স) মীর মোতাহার হোসেনের সঙ্গে পরিচয়। ওষুধ তৈরির নানা ধাপ সহজ করে আমাদের বুঝিয়ে দিলেন তিনি।
মীর মোতাহার হোসেনের কথা শুনতে শুনতে মনে হলো, দোকান থেকে একটি ওষুধ কিনে আমরা যে খাই, তার পেছনে কত মানুষের সম্পৃক্ততা, সূক্ষ্ম মান নিয়ন্ত্রণের জন্য কত ধরনের চেষ্টাই না আছে।
মীর মোতাহার হোসেনের সঙ্গেই ঘুরে দেখলাম পাশের মান নিয়ন্ত্রণকক্ষ। প্রতিটি প্ল্যান্টেই আছে এমন মান নিয়ন্ত্রণকক্ষ। এটি সবচেয়ে বড়। সেখানে চলছে বিরাট কর্মযজ্ঞ। নতুন কোনো ওষুধ উৎপাদন শুরুর আগে এখানেই যাচাই করা হয় এর সম্ভাব্যতা। উৎপাদিত ওষুধও নানা পর্যায়ে যাচাই করা হয় এখানে। এক অংশে দেখলাম, কোন ওষুধ খাওয়ার পর কতক্ষণ দ্রবীভূত হয়, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এক কক্ষে দেখা গেল স্কয়ারের উৎপাদিত ওষুধের নমুনা রাখা। কোনোটি মাসখানেক আগের, কোনোটি রাখা বছরখানেক আগে। নানা সময়ে রাখা ওষুধগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করে দেখা হয়। দেশ–বিদেশের বিভিন্ন মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে এভাবেই তাঁদের কাজ করতে হয়।
প্ল্যান্টের ভেতরে ঢুকতে কঠোর সুরক্ষানীতি মেনে চলতে হয়। আমরা প্রথমে হাত স্যানিটাইজ করে নিলাম। ভেতরে ঢোকার জুতা পরে নিতে হলো। এয়ারলক পেরিয়ে এবার মাস্ক, অ্যাপ্রনসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী পরতে হলো। এ পর্যায়ে আমাদের সঙ্গে আছেন উৎপাদন বিভাগের নির্বাহী কবির হোসেন। ডিসপেনসিং করিডর পেরিয়ে আমাদের নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। তিনি বলেন, ‘এই ফরমুলেশন ইউনিটে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, ড্রাইসিরাপ পাউডার ফর সাসপেনশন তৈরি করা হয়। কাঁচামাল থেকে ওষুধ প্যাকেট পর্যন্ত, মানে ডিসপেনসিং, গ্র্যানুলেশন, ব্লেন্ডিং, কমপ্রেশন, ইনক্যাপসুলেশন, কোটিং, প্যাকেজিং—সব ধাপ এখানে সম্পন্ন হয়।’
করিডরের দুই পাশে ছোট ছোট কক্ষ। প্রতিটি কক্ষেই এক বা একাধিক যন্ত্র। একজন বা দুজন কর্মী সেসব পরিচালনা করছেন। দরজায় রাখা কাগজে লেখা ভেতরে কোন ওষুধ তৈরির কাজ চলছে। প্রতিটি কক্ষে জানালার মতো জায়গাটা কাচঘেরা। করিডর থেকে ভেতরে কী হচ্ছে, দেখা যায়।
আমরা কয়েকটা এয়ারলক পেরিয়ে প্রি–ডিসপেনসিং কক্ষের সামনে থামি। ওষুধ উৎপাদনের প্রক্রিয়া এখানেই শুরু হয়। ওয়্যারহাউস থেকে পাউডারের মতো কাঁচামাল নিয়ে প্রি–ডিসপেনসিং কক্ষে রাখা হয়। যে ওষুধ তৈরি করা হবে (যেমন প্যারাসিটামল), সেই ওষুধ তৈরিতে কী কী উপকরণ দরকার, সেসব এখান থেকে নেওয়া হয়। কী পরিমাণ ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল তৈরি হবে, তার ওপর নির্ভর করে কাঁচামাল আলাদা আলাদা ব্যাগে নেওয়া হয়। বিএমআর (ব্যাচ ম্যানুফ্যাকচারিং রেকর্ড) অনুসরণ করে মেপে মেপে প্রতিটি উপকরণ আলাদা করে ব্যাগে নিয়ে মুখবন্ধ করা হয়। তারপর লোহার গারদের মতো বক্সে এসব উপকরণ নিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় পোস্ট ডিসপেনসিং রুমে।
পরবর্তী সময়ে যে পণ্য তৈরি করা হবে, সে অনুযায়ী উপকরণ নেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার আবার উপকরণগুলো আলাদা আলাদা মেপে দেখা হয়। এরপর গ্র্যানুলেশন এরিয়ায় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে উপকরণগুলো মেশানোর কাজ হয়। এখানে আটটি গ্র্যানুলেশন মেশিন আছে। কয়েকটিতে কাজ চলছিল। প্যারাসিটামল তৈরির জন্য মেশানো হচ্ছিল এক কক্ষে। মেশানো হয়ে গেলে আর্দ্রতাসহ আরও কিছু বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পর কনটেইনারে (আইবিসি বা ইন্টারমিডিয়েট বাল্ক কনটেইনার নামে পরিচিত) ভরা হলো। তারপর হাতে ঠেলা ট্রলিতে পাঠানো হলো পরের ব্লেন্ডিং ধাপে।
সেখানে যেতে যেতে দেখলাম, উৎপাদন শেষে মেশিনসহ কয়েকটি কক্ষ ধুয়ে ফেলা হচ্ছে। কোনো ওষুধ উৎপাদন শেষে পরের উৎপাদনে যাওয়ার আগে এভাবে সবকিছু ধুয়ে ফেলতে হয়। এই ধুয়ে ফেলার প্রক্রিয়াও রীতিমতো এক মহাযজ্ঞ।
ব্লেন্ডিং শেষ হওয়ার পর আইবিসি থেকে কমপ্রেশন মেশিনের ওপরে সেট করা হলো। সেখান থেকে গ্র্যানুল হপারের মাধ্যমে নিচে পড়তে থাকল মিশ্রণ। তারপর মেশিনেই ট্যাবলেট তৈরি শুরু হয়।
আগেই বিএমআর অনুযায়ী মেশিনে সেট করা হয় ট্যাবলেটের আকার–আকৃতি ও মনোগ্রাম। উৎপাদনের শুরুতে কিছু ট্যাবলেটের ওজন কমবেশি হয়। স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব ট্যাবলেট বালতির মতো লাল রঙের পাত্রে চলে যায়। আর সঠিক ওজনের ট্যাবলেটগুলো সবুজ পাত্রে জমা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ট্যাবলেট কমপ্রেস হওয়ার পর ডিডাস্টারের মাধ্যমে ট্যাবলেটের গায়ের ধুলা পরিষ্কার করা হয়। এরপর মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে চেক করা হয়। মেটালের সামান্যতম উপস্থিতি থাকলেও মেশিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা বাতিল করে।
সেদিন ক্যাপসুল তৈরির কাজ বন্ধ ছিল। তবে কবির হোসেন ক্যাপসুলেশন ইউনিট দেখিয়ে বলেন, ‘ক্যাপসুলের দুটি অংশ থাকে—বডি ও ক্যাপ। পিলেট বা পাউডার যা–ই হোক না কেন, সেটাও আইবিসি থেকে হপারের মাধ্যমে নামতে থাকে। খালি ক্যাপসুল শেল হপারে দেওয়ার পর মেশিন বডি ও ক্যাপকে আলাদা করে অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফিল করে এবং পরে আবার ক্যাপ বন্ধ করে সঠিক ক্যাপসুল বের করে।’
এর মধ্যেই চলতে থাকে মান নিয়ন্ত্রণ। পুরো উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলাকালে নির্দিষ্ট সময় পরপর ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের বিভিন্ন প্যারামিটার পরীক্ষা করা হয়। ইন–প্রসেস কন্ট্রোল রুমে (আইপিসি) দেখা হয় ট্যাবলেটের ওজন, মাপা হয় কতটা শক্ত হয়েছে, ট্যাবলেটের ব্যাস ও পুরুত্ব ঠিক আছে কি না, ট্যাবলেট ভাঙার প্রবণতা বা ক্ষয় হওয়ার হার কেমন, ট্যাবলেটের আর্দ্রতা (ময়েশ্চার) ঠিকমতো আসছে কি না ইত্যাদি।
ইন–প্রসেস চেক শেষ হওয়ার পর যেসব ট্যাবলেট স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক ওজনে তৈরি সেগুলো সংশ্লিষ্ট রুমে পাঠানো হয়। এরপরের কাজ প্যাকেজিং বিভাগের। সবুজ বালতি নিয়ে গিয়ে তারা যন্ত্রের মাধ্যমেই ওষুধগুলো প্যাকেট করে ফেলে।
ফরমুলেশন ইউনিট–৫–এর এই ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া দেখে আমরা নিচে নেমে আসি। এর মধ্যেই ভবনের গুদামের সামনে থেকে একটি কাভার্ড ভ্যান বেরিয়ে যায়। সদ্য উৎপাদিত ওষুধগুলো এভাবেই পৌঁছে যায় ওষুধের দোকানে, আমাদের হাতে।
*বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫–এ প্রকাশিত