একটা দিন কিছু না করে কাটালে কী হয়, বার্নআউট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?

এক বছর কিচ্ছু না করে ছুটি কাটাবেন—পরামর্শটা কেমন? ঘুম থেকে উঠেই আবিষ্কার করবেন, আপনি অবসর যাপন করছেন। কোনো কাজ নেই, ই–মেইল নেই, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সহকর্মীদের মেসেজ নেই, বসের হুকুম নেই। অবসরে যা মন চাইছে, তা–ই করতে পারছেন। শুনেই ভালো লাগছে, তাই না? তবে কাজের ভিড়ে কিছু না করে বছর কাটানোর এই কথা ভীষণ আজগুবি বা স্বপ্নের মতোই শোনায়। অবশ্য কেউ কেউ এই অসম্ভব পথেও হাঁটছেন। কেন হাঁটছেন? এতে বার্নআউট থেকে মুক্তি মেলে?

এই প্রজন্মের অনেকের কাছেই ক্যারিয়ার ও রোজগার জীবনের সবকিছু নয়। বরং জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা কেবলই ক্যারিয়ারের পেছনে না দিয়ে নিজের মতো করে কাটাতে চান তাঁরা
মডেল: টুইঙ্ক ক্যারল। ছবি: সুমন ইউসুফ

জেন–জির মধ্যে ‘স্লো লিভিং’ ধারণাটি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, বিশেষত উন্নত দেশগুলোয়। শুধু জেন–জি নয়, মিলেনিয়াল প্রজন্মের শেষ দিকে জন্ম নেওয়া অনেকে এই পথের যাত্রী হচ্ছেন বা হতে চাইছেন।

এই প্রজন্মের অনেকের কাছেই ক্যারিয়ার ও রোজগার জীবনের সবকিছু নয়। বরং জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা কেবলই ক্যারিয়ারের পেছনে না দিয়ে নিজের মতো করে কাটাতে চান তাঁরা। যেখানে প্রাধান্য পায় আবেগ, শখ আর সম্পর্ক। সে কারণেই কাজের থেকেও বড় হয়ে উঠছে বিরতি। সহজ কথায় বলতে গেলে, অনেকের কাছে ছোটাছুটির বদলে প্রাধান্য পাচ্ছে বিশ্রাম।

সবাই কি পারেন

ইংরেজ লেখক, পডকাস্টার এবং উদ্যোক্তা এমা গ্যানন একটা বই লিখেছেন তাঁর ছুটি কাটানোর গল্প নিয়ে। ‘আ ইয়ার অব নাথিং’ বইয়ে তাঁর জীবনে কাটানো ১২ মাসের লম্বা ছুটির এক গল্প লিখেছেন।

২০২২ সালে টানা কাজ করতে করতে বার্নআউটের শিকার হয়েছিলেন এমা। সে সময় কাজ থেকে ছুটি নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না তাঁর।

এমা গ্যানন লিখেছেন, ‘মাথার ভেতর দপদপানি, কোনো কিছুর ওপর ফোকাস করতে না পারা, যেকোনো কাজ করতে গেলে বিভ্রান্তি—সবকিছু এড়িয়ে কাজ করছিলাম। নিজেকে বোঝাতাম, আমাকে তো যেভাবেই হোক কাজ চালিয়ে যেতে হবে। নইলে তো কিছুই চলবে না।’

ইংরেজ লেখক, পডকাস্টার এবং উদ্যোক্তা এমা গ্যানন একটা বই লিখেছেন তাঁর ছুটি কাটানোর গল্প নিয়ে

তবে ২০২২ সালে এমার শরীর একপ্রকার জোরপূর্বক শাটডাউন মোডে চলে যায়। এরপর টানা এক বছর এমা ছুটি কাটিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘আমাদের শরীর ও মন তৈরিই হয়েছে একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য, পার্কে হাঁটার জন্য। স্বাস্থ্যের চেয়ে দামি আর কিছু নেই।’

এমার মতো ভাগ্যবান হয়তো সবাই নন। টানা এক বছর ছুটি কাটানো অনেকের কাছেই অসম্ভব। কিন্তু তাই বলে চরম ক্লান্তি নিয়ে কাজ করাও অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

আপনার জন্য কোনো কিছু যেমন থেমে থাকবে না। একইভাবে শরীরকে প্রাধান্য না দিয়ে কাজ করলেও খুব বেশি পার্থক্য তৈরি হবে না জীবনে। তাই বিশ্রামকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয় সব সময়। বার্নআউট হয়ে যাওয়ার আগেই নিজেকে রিচার্জ করে নিন।

ক্লান্তির কারণ

আজকের যুগে ক্লান্তির প্রধান কারণ হাতের কাছে থাকা প্রযুক্তি

আজকের যুগে ক্লান্তির প্রধান কারণ হাতের কাছে থাকা প্রযুক্তি। ফোন যেমন যোগাযোগকে সহজ করেছে, তেমনি কাজের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে প্রতিটি মুহূর্ত থাকতে হয় তটস্থ।

করোনা জানান দিয়ে গিয়েছিল এই ইঁদুর–দৌড়ে সবাইকে না নামলেও চলবে, বরং শরীরটার একটু বিরতি প্রয়োজন।

কিন্তু অনেকের কাছেই ছুটি মানে যেন আরও কাজের চাপ। সারা সপ্তাহ কাজ করে শুক্রবারে যতটা না বিশ্রাম হয়, তার থেকে বেশি জমা হয় ক্লান্তি।

এই কাজ, সেই কাজ…সঙ্গে ঘরের কাজ মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম যেন সোনার হরিণ। ফলে বার্নআউট নিত্যসঙ্গী। ছুটির দিনেও কাজ করতে করতে চলে আসে নতুন সপ্তাহ, মানে আবারও কাজে ফিরে যাওয়া। ফলে বিশ্রাম থেকে যায় অধরা।

বার্নআউট থেকে বাঁচতে

বার্নআউট রুখতে নিজেকে সময় দিন

টানা ছুটি নেওয়া যখন বাস্তবসম্মত নয়, তখন উপায় কী? প্রথম কথা, বার্নআউট রুখতে নিজেকে সময় দিন। হুট করে অফিস থেকে একদিন ছুটি নিন। সেদিন কোনো কাজ না করে হয়তো শুয়েই থাকুন। একটা সিরিজ শেষ করে ফেলুন। নিজেকে কল্পনা করুন সিরিজের চরিত্র হিসেবে। সব মিলিয়ে সময়টা নিজেকে দিন।

জেন–জি থেকে শুরু করে মিলেনিয়াল—অনেকেই এখন এই পথে হাঁটছেন। চাকরিতে থাকা প্রতিটি ছুটি ব্যবহার করছেন নিজের জন্য। অফিস যেমন আপনার সময় কিনে নিচ্ছে, তেমনি অফিসের দেওয়া ছুটি ব্যবহার করুন নিজেকে সময় দেওয়া জন্য। কারণ, বার্নআউটের ভিড়ে নিজের জন্য সময় বের করতে পারাটা বড্ড জরুরি। নইলে কাজের ভিড়ে কখন হারিয়ে যাবেন, সেই জরুরি খবরটা পাওয়া হবে না কারও।

সূত্র: বিবিসি