ডা. জারিন তাসনিম
ডা. জারিন তাসনিম

ইরাসমাসের পথে এক চিকিৎসকের যাত্রা

ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তি পেয়ে ইউরোপে পড়তে গেছেন ডা. জারিন তাসনিম। লিখেছেন তাঁর অভিজ্ঞতা।

সেপ্টেম্বরের এক সকালে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর আর কয়েক বছরের পেশাজীবনের স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে ইউরোপের উদ্দেশে রওনা হলাম। যেতে যেতে ভাবছিলাম, সত্যিই কি আবার ছাত্রজীবন ফিরে পেতে যাচ্ছি! আবারও ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা…! চিকিৎসক হিসেবে যে পথে হাঁটা শুরু করেছিলাম, সেই পথ কি অন্য দিকে বাঁক নেবে!

গন্তব্য স্পেনের ছোট্ট শহর ওভিয়েদো। ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তি নিয়ে সেখানে দুর্যোগকালীন জনস্বাস্থ্য বিষয়ে পড়তে যাচ্ছি। জানিয়ে রাখি, ইরাসমাস মুন্ডুস হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি উদ্যোগ, যেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হয়ে একটি পাঠ্যক্রম পরিচালনা করে। শিক্ষার্থীরা একাধিক দেশে পড়ার সুযোগ পান। পূর্ণ বৃত্তির আওতায় পড়াশোনা ও জীবনযাপনের জন্য আর্থিক সহায়তাও থাকে।

মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় ভবিষ্যৎ অনেকটাই সরল মনে হয়। রোগী আসবেন, রোগ নির্ণয় হবে, চিকিৎসা দেওয়া হবে, এই তো! কিন্তু পেশাজীবনে এসে বুঝতে শুরু করি, একজন মানুষ কেন অসুস্থ হলেন—এ প্রশ্নের উত্তর সব সময় তার শরীরের ভেতরে পাওয়া যায় না। সে কোথায় থাকে, কী তাঁর সামাজিক অবস্থান, কোথা থেকে সে পানি সংগ্রহ করে, কতখানি মানসিক চাপে থাকে, এসবের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে।

এই প্রশ্নগুলোই ধীরে ধীরে আমাকে চিকিৎসার পরিচিত গণ্ডি থেকে জনস্বাস্থ্যের দিকে নিয়ে যায়।

ইন্টার্নশিপের পরই ২০২০ সালে দিনাজপুরে আইসিডিডিআরবির একটা ক্লিনিক্যাল গবেষণায় যোগ দিয়েছিলাম। সেখানেই প্রথম কাছ থেকে বুঝতে পারি, চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এরপর সেভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গে রংপুরে কাজ করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মসূচি কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং কোথায় ঘাটতি, তা দেখার সুযোগ পাই।

এরপর পথ আমাকে নিয়ে যায় কক্সবাজারে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা আমার পেশাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, কাছ থেকে তা দেখেছি। বুঝেছি, সংকটের মধ্যে মানুষ শুধু চিকিৎসা চায় না; নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং নিজের জীবনের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণও ফিরে পেতে চান তাঁরা।

এখানেই আমার কাছে চিকিৎসকের ভূমিকার অর্থ বদলে যায়। আমি বুঝতে শুরু করি, সংকটের মধ্যে মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। সেখান থেকেই ইরাসমাস মুন্ডুস জয়েন্ট মাস্টার্স প্রোগ্রামের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

আবেদনপত্র পূরণ করা নয়, বরং আমার কাছে বৃত্তি পাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নিজের পথটা বোঝা। আমি কেন চিকিৎসাবিদ্যা থেকে জনস্বাস্থ্যে এলাম? আমার অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে কী শিখিয়েছে? কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো আমার জানা নেই? ভবিষ্যতে আমি কোথায় অবদান রাখতে চাই? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর যত পরিষ্কার হয়েছে, দুর্যোগকালীন জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়ালেখা আমার কাছে ততই প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, একটি শক্তিশালী বৃত্তির আবেদন তৈরি হয় তখনই, যখন একজন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা, আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন। অন্য কারও মতো ‘নিখুঁত প্রার্থী’ হওয়ার চেয়ে নিজের গল্পটা সৎভাবে বলতে পারাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেনের ওভিয়েদোতে থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে। এরপর সুইডেনের কারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটে পড়ব। প্রতিটি ধাপে নতুন শিক্ষক, নতুন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নতুন সমস্যা, সঙ্গে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও পাব।

আজও নিজেকে প্রথমে একজন চিকিৎসক হিসেবেই দেখি। তবে সেই পরিচয়ের অর্থ বদলেছে। এখন মনে হয়, একজন চিকিৎসকের কাজ কখনো একজন রোগীর পাশে দাঁড়ানো, কখনো একটি জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করা, কখনো গবেষণার মাধ্যমে একটি সমস্যাকে দৃশ্যমান করা, আবার কখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রমাণ পৌঁছে দেওয়া।

আজ ওভিয়েদোতে বসে মনে হয়, দিনাজপুর থেকে রংপুর, রংপুর থেকে কক্সবাজার, আর সেখান থেকে ইউরোপ—প্রতিটি জায়গাই আমাকে একই প্রশ্নের কাছে ফিরিয়ে এনেছে—সংকটের মধ্যেও কীভাবে আরও বেশি মানুষের কাছে, আরও ন্যায়সংগতভাবে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো যায়।

হয়তো এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সামনে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।