লিখেছেন ভর্তি প্রস্তুতি সহায়ক অ্যাপ ‘চর্চা’র প্রতিষ্ঠাতা রাইহানুল ইসলাম
আমি এইচএসসি ২০২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী। করোনার কারণে আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত হয়নি; আগের পরীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছিল ফল। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতাটা ছিল বেশ অন্য রকম ও চ্যালেঞ্জিং। পুরো পরিস্থিতিটাই ছিল আমাদের জন্য নতুন আর অনিশ্চিত। সব মিলিয়ে নিজেকে ভর্তি পরীক্ষায় অনেক সফল একজন বলব না। তবে গত কয়েক বছরে আমাদের ২৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর প্ল্যাটফর্ম ‘চর্চা’য় বহু শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তাদের পড়াশোনার ধরন, ভুল এবং প্রস্তুতির বিভিন্ন পর্যায় দেখেছি।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আজকের লেখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীরা যে পাঁচটি সাধারণ ভুল করে, সেগুলো এবং কীভাবে এই ভুলগুলো এড়িয়ে চলা যায়, সেটাই তুলে ধরছি।
অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়ছে, কিন্তু কোন বিষয় কখন শেষ করবে, তার কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা নেই। ফলে পছন্দের অধ্যায়গুলো বারবার পড়া হয়, আর কঠিন অধ্যায়গুলো ‘পরে পড়ব’ বলে জমতে থাকে। তাই পুরো সিলেবাসকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে দৈনিক ও সাপ্তাহিক লক্ষ্য ঠিক করো। যেমন ‘আজ পদার্থবিজ্ঞান পড়ব’ না বলে ‘আজ দুটি টপিক রিভিশন করব এবং ৫০টি প্রশ্ন সমাধান করব।’ পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত, যা ব্যস্ত বা খারাপ দিনেও অন্তত কিছুটা অনুসরণ করা সম্ভব। ‘পরে পড়ব’—এই কথাটা কখনোই কাজে আসে না। পরে পড়তে পড়তে একসময় দেখবে সিলেবাস শেষ হয়নি, কিন্তু পরীক্ষা চলে এসেছে।
ভর্তি প্রস্তুতিতে শুধু বই, নোট ও সাজেশন পড়লেই হবে না; নিয়মিত প্রশ্ন সমাধান করাও জরুরি। একটি অধ্যায় কয়েকবার পড়লে মনে হয় সেটি পরিচিত, কিন্তু পরীক্ষায় সময়ের মধ্যে প্রশ্ন সমাধান করতে গেলেই বোঝা যায়, আসলে কতটুকু আয়ত্তে এসেছে। আমার ভর্তি প্রস্তুতির সময়ও এমন হয়েছে। কোনো টপিক পড়ে মনে হয়েছে সব পারব, কিন্তু পরীক্ষায় গিয়ে ছোট একটি ধারণাগত জায়গায় আটকে গেছি। তখন বুঝেছি, পড়া আর পারা এক জিনিস না। তাই প্রতিটি অধ্যায় ও টপিক পড়ার পরই প্রশ্ন সমাধান করো। প্রশ্নব্যাংক থেকে বিগত বছরের প্রশ্নে নিয়মিত পরীক্ষা দাও। খেয়াল রাখো, কোন বিষয়ে নম্বর কমছে, কোথায় বেশি সময় লাগছে এবং কোন টপিকে বারবার ভুল হচ্ছে। যত বেশি প্র্যাকটিস করবে, পরীক্ষার হলে তত বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকবে।
ভর্তি প্রস্তুতির সময় অনেকেই প্রশ্নের উত্তর, সূত্র বা তথ্য মুখস্থ করার দিকে বেশি ঝুঁকে যায়। এতে পরিচিত প্রশ্নের উত্তর হয়তো দেওয়া যায়, কিন্তু প্রশ্নের ধরন একটু বদলে গেলেই বাধে সমস্যা। তাই কোনো প্রশ্নের সমাধান দেখার আগে নিজে চেষ্টা করো। ভুল হলে কেন ভুল হয়েছে, সেটা বোঝো। একই ধারণা থেকে ভিন্নভাবে প্রশ্ন এলে যেন সমাধান করতে পারো, সেটাই হওয়া উচিত প্রস্তুতির লক্ষ্য।
বন্ধু কত ঘণ্টা পড়ছে, কত নম্বর পাচ্ছে বা কত দ্রুত সিলেবাস শেষ করেছে, এসব নিয়ে বেশি চিন্তা করলে নিজের প্রস্তুতির ওপর আস্থা কমে যায়। আমার ভর্তি প্রস্তুতির সময়ও আশপাশের অনেককে দেখে মাঝেমধ্যে মনে হতো, তারা হয়তো আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। পরে বুঝেছি, প্রত্যেকের শেখার গতি ও দুর্বলতা আলাদা। অন্যের রুটিন অনুসরণ করার চেয়ে নিজের দুর্বল জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করাই বেশি জরুরি। গত সপ্তাহের নিজের সঙ্গে এই সপ্তাহের নিজেকে তুলনা করো। তোমার নম্বর বাড়ছে কি না, ভুল কমছে কি না এবং একই প্রশ্ন সমাধানে আগের চেয়ে কম সময় লাগছে কি না, এই উন্নতিগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।
ভর্তি পরীক্ষার সময় পরিবার, বন্ধু কিংবা আশপাশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা থাকে। ধীরে ধীরে সেই প্রত্যাশাগুলো নিজের ওপর এতটাই চাপিয়ে ফেলি যে পড়াশোনার চেয়ে ‘আমাকে পারতেই হবে’ চিন্তাটাই বড় হয়ে যায়। নিজের জন্য লক্ষ্য ঠিক করো। প্রস্তুতির জায়গা থেকে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করো। তোমার কাজ হলো নিজের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা, কারও প্রত্যাশা পূরণ করা নয়।
শেষ পর্যন্ত ফলাফল তোমার প্রত্যাশামতো হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। তাই ফলাফল নিয়ে নিজেকে দোষারোপ না করে মনে রেখো, এটা তোমার পরীক্ষা, তোমার প্রস্তুতি এবং তোমার নিজের যাত্রা। তুমি তোমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দিয়েছ কি না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করার কোনো জাদুকরি সূত্র নেই। নিজের ভুলগুলো দ্রুত বুঝতে পারা এবং সেগুলো ঠিক করাই প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কত ঘণ্টা পড়েছ বা কতগুলো বই শেষ করেছ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যা পড়েছ, সেটা কতটা কাজে লাগাতে পারছ। নিয়মিত পরীক্ষা দাও, ভুলগুলো বিশ্লেষণ করো, দুর্বল জায়গাগুলোতে কাজ করো এবং লেগে থাকো।
ভর্তি পরীক্ষা একটি দীর্ঘ যাত্রা। এখানে এক দিনে অনেক দূর যাওয়ার চেয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।