শখ থেকেই শুরু করেছিলেন খাবারের ছবি তোলা। এখন অন্যদের ফুড ফটোগ্রাফি শেখান, নিজেও এ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন কানাডার সাউথ অ্যালবার্টা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। আন্তর্জাতিক ফুড ফটোগ্রাফি কমিউনিটিতে পরিচিতি পাওয়া বাংলাদেশি আলোকচিত্রী রোয়েনা মাহজাবীন–এর গল্প শোনাচ্ছেন রুহিনা তাসকিন

‘আমার জন্য ভালো আর তোমার জন্য খারাপ একটা খবর আছে’, স্বামী আহসানুল হকের কাছে এটুকু শুনেই রোয়েনা মাহজাবীন বুঝে গেলেন ঢাকার দিন ফুরিয়ে আসছে। বারান্দার গাছ, পোষা পাখি, দাদির কাছ থেকে আনা পুরোনো বাসনকোসন, ছবি তোলার নানা অনুষঙ্গ, একটু দূরে মায়ের বাড়ি, ছোটবেলার বান্ধবীরা—সব ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। ‘বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠেছিল’, ছয় বছর আগের কথা মনে করে বললেন রোয়েনা। ‘দেশ ছেড়ে এবার কানাডায় যেতে হবে।’
২০১৯ সালে ঢাকা শহর অনেক দূরে রেখে প্লেনটা নামল কানাডার এক শহরে। এক পরিবারের তিনজন মানুষ নতুন দেশে নতুন জীবন শুরু করলেন। তবে রোয়েনার মনজুড়ে রয়ে গেল ঢাকা শহর, বাংলাদেশের খাবার, ছবি তোলার শখ। একটু বিরতি পড়ল, তবে সেটি যেন নতুনভাবে ফিরে আসার জন্য। ঢাকায় রয়ে গেল প্রিয় চায়ের কাপ, অ্যান্টিক বাসনকোসন—কত কিছু। সঙ্গে এল ক্যামেরা, সংগ্রহের সামান্য একটি অংশ আর ছবি তোলার ইচ্ছা।
‘এখানে আসার কিছুদিন পর ছেলে হলো। ও হওয়ার এক মাসের মাথায় চলে গিয়েছিলাম আউটডোর ফটোগ্রাফি করতে’, বললেন রোয়েনা। আর এত দিনে সেই ছবি তোলার শখটা রোয়েনাকে এনে দিয়েছে নানা পুরস্কার, আন্তর্জাতিক ফুড ফটোগ্রাফি কমিউনিটিতে পরিচিতি। রোয়েনা এখন অনলাইনে ফটোগ্রাফি শেখান, নিজেও এ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন কানাডার সাউথ অ্যালবার্টা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে।
নিজে ভালো রাঁধেন, নিজের রান্না আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছা থেকেই রোয়েনার ফুড ফটোগ্রাফি শুরু। ডিজিটাল ক্যামেরা থেকে মিররলেস ক্যামেরায় হাত পাকানো। ‘২০১২-১৩ সাল থেকে ছবি তুলি। শুরুতে তো শখই ছিল শুধু। ধীরে ধীরে অন্য ফুড ফটোগ্রাফারদের সঙ্গে পরিচিত হলাম। ফেসবুক গ্রুপগুলোতে যুক্ত হলাম’, জানান রোয়েনা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় রোয়েনার তোলা ছবি জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল। নিজে রাঁধেন, নিজেই ছবি তোলেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে প্রথম আলোর ‘নকশা’ থেকে ডাক এল। শবে বরাতের বিশেষ সংখ্যায় রেসিপি দিতে হবে। এরপর প্রথম আলোসহ নানা পত্রিকার সঙ্গে কাজ করেছেন। ঢাকার বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় রেস্তোরাঁর খাবারেরও ছবি তুলে দিয়েছেন। তার পরও সেটি শখই ছিল। ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতাই ছিল রোয়েনার পেশা।
দু-তিন মাস ধরে মেসেজটা পড়ে ছিল ইনবক্সে। রোয়েনার রেসিপি আর ছবি ছাপতে চায় সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত গোরমে ম্যাগাজিন। অতি সাবধানী রোয়েনার সেটা ‘স্ক্যাম’ মনে হয়েছে। ২০১৬ সালের কথা।
বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করতে করতেই সেটি নিয়ে মজা করেন তিনি। সেই বান্ধবীই খোঁজ নিয়ে দেখেন, এটা তো সিঙ্গাপুরের বেশ নামী পত্রিকা। রোয়েনা নিজেই এবার যোগাযোগ করলেন। রেসিপি দেবেন, তবে শর্ত হলো বাংলাদেশি খাবার হতে হবে এবং দেশি খাবারের নামেই ছাপতে হবে। তাঁরাও মেনে নিলেন, তবে তাঁদের শর্ত হলো, বাংলাদেশি খাবারের সেই রেসিপিই তাঁরা ছাপবেন, যেগুলোর উপকরণ সিঙ্গাপুরের বাজারে সহজলভ্য। রোয়েনা তখন ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করলেন কী কী পাওয়া যায়। এভাবেই সিঙ্গাপুরের ম্যাগাজিনে জায়গা পেল বাংলাদেশি জিলাপি, মোয়া ও রসমালাইয়ের রেসিপি।
কাছাকাছি সময়েই প্রকাশ পেয়েছিল ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শেফ নাদিয়া হুসেইনের বিতর্কিত একটি বক্তব্য, বাংলাদেশের খাবারে নাকি ডেজার্টের তেমন গুরুত্ব নেই। ‘কথাটা শুনে কষ্ট পেয়েছিলাম। এ জন্যই বিদেশি একটি পত্রিকায় বাংলাদেশি মিষ্টির রেসিপি দিতে চেয়েছি’, বললেন রোয়েনা। আর তাঁর সেই চেষ্টার ফলেই বড় করে ছাপা হলো সাদা শাড়ি ও লাল চুড়ি পরা বাংলাদেশি মেয়ের হাতে রুপালি পাত্র ভরা জিলাপির ছবি। ছবিটি সে সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ সাড়া ফেলেছিল।
তবে এতকিছুর পরও একটু ভুল হয়েই গেল। রসমালাই ছাপা হলো ‘রাসমালাই’ নামে। রোয়েনা সেটি জানাতেই তাঁরা ক্ষমা চাইলেন। সঙ্গে এটাও জানান, এই খাবার তাঁরা এই নামেই চেনেন! ‘বাংলাদেশের ছোট ছোট রসমালাই; কিন্তু একটু আলাদা। এটা আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য। তবে সবাই তো সেটি জানে না’, বলেন তিনি। এই জানানোর কাজটাই করতে চান তিনি। ‘আমার রেসিপি দেখে ভিনদেশি কেউ হয়তো বানাবেন এসব খাবার, ‘আমার জন্য এটিই একটি বড় আনন্দের ব্যাপার ছিল।’
ফুলটাইম চাকরি, দুই-সন্তানসহ চারজনের পরিবার, বাসার কাজ, পড়াশোনা—এত সব করে ফটোগ্রাফির সময় কীভাবে বের করেন? ‘ফটোগ্রাফিতে ঢুকলে মাথা ঠান্ডা হয়ে যায়। অন্য সব কাজের কথা ভুলে যাই। এমনও হয়েছে, বাড়ির জন্য খাবার অর্ডার করে ফুড ফটোগ্রাফি নিয়ে বসে গেছি’, হাসতে হাসতে বললেন রোয়েনা।
জানালেন আরেকটা মজার গল্প। কিছুদিন আগে তাঁর ছোট একটা অস্ত্রোপচার হয়েছে জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে। রোয়েনার হাত কাঁপছে দেখে তাঁকে সহজ করার জন্য ডাক্তার গল্প জুড়ে দিলেন। ‘তুমি কি জানো রিসেপশনে যেসব ছবি দেখছ, সব আমার তোলা?’ গল্পে গল্পে কেটে গেল ৪০ মিনিট। শেষ সেলাইটা দিয়ে তিনি রোয়েনাকে বললেন, ‘ইউ আর রিয়েলি ইনটু ফটোগ্রাফি!’
তবে এভাবে ফটোগ্রাফি চালিয়ে যাওয়ার পেছনে স্বামীকেও ধন্যবাদ জানাতে চান তিনি। ‘গাড়ির পেছনে ছবি তোলার সব সরঞ্জাম ভরে কত দূরদূরান্তে গাড়ি চালিয়ে আমাকে সে নিয়ে যায়’, জানান রোয়েনা।
আলোকচিত্র ইতিহাস সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। খাবার তো আমাদের সংস্কৃতিরই একটি অঙ্গ। ছবির মাধ্যমে সহজেই খাবারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা যায়। ‘আমাদের দেশের মেয়েরা ফুড ফটোগ্রাফিতে ইদানীং আগ্রহী হচ্ছে। এর মাধ্যমে ধরে রাখা যায় আমাদের ইতিহাস। এটা একধরনের ডকুমেন্টেশনও বটে। যেমন শর্ষে ইলিশের কথা সবাই জানে, রেসিপিও হয়তো অনেকের জানা। এর সঙ্গে যদি একটা ছবিও তুলে রাখা যায়, সেটি তো অনেক বছর পরও আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরবে’, বলেন রোয়েনা।
নিজে তো শিখছেন, অন্যদেরও ছবি তোলা শেখাচ্ছেন। অনলাইনে চলছে তাঁর আলোকচিত্র প্রশিক্ষণ ক্লাস। নারীরাই শিক্ষার্থী। ‘রান্নার পাশাপাশি ঘরে বসেই করা যায় ফুড ফটোগ্রাফি। নারীদের জন্য তাই ফুড ফটোগ্রাফি কিছুটা সুবিধাজনক’, বলেন রোয়েনা। যেকোনো দেশ থেকেই অংশ নেওয়া যায় এই কোর্সে। ইকুইপমেন্ট বা পূর্ব প্রশিক্ষণেরও তেমন বাধ্যবাধকতা নেই।
মুনমুন মেহমুদের সঙ্গে রোয়েনার দীর্ঘদিনের পরিচয়, বন্ধুত্ব। মুনমুন নিজেও ফুড ফটোগ্রাফি করতেন। রোয়েনা যখন হাতে–কলমে শেখানো শুরু করলেন, মুনমুনও ভর্তি হয়ে গেলেন। ‘আমরা প্রায় একই সঙ্গে ফটোগ্রাফি শুরু করি। তবে রোয়েনার শিক্ষার্থী হয়ে বুঝলাম, ও যেমন ভালো ছবি তোলে, তেমনি শেখায়ও ভালো।’
মুনমুন একসময় বেকিং করতেন। নিজের পেজের জন্য ছবি তুলতে তুলতে পেশাদারত্বের সঙ্গে ফটোগ্রাফিও শুরু। ‘এখন খাবারের পাশাপাশি প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফিও করি। বিভিন্ন অনলাইন পেজের নানা পণ্য যেমন গয়না, প্রসাধনীরও ছবি তেলা হয়’, বললেন তিনি। সিরামিক বাসন তৈরির স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।
নাজনীন সুলতানার গল্পটা একটু ভিন্ন। বছর দুয়েক হলো ফটোগ্রাফি শুরু করেছেন। শুরুটা মুঠোফোন দিয়ে, সম্প্রতি ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনেছেন। ‘বেসিক ফটোগ্রাফি ক্লাসগুলো তো মুঠোফোন দিয়েই করেছি। অনেকে বলে ক্যামেরা লাগবেই, এটা ভুল ধারণা। (রোয়েনা) আপুর ক্লাসে মুঠোফোন দিয়েও শেখা শুরু করা যায়’, বললেন তিনি।
দুবাইতে থাকেন নাজনীন। এর মধ্যেই পরিচিতজনদের মধ্যে অনেকে জেনেছেন তাঁর দক্ষতার খবর। দুবাইতে তাঁদের কমিউনিটির শিশুদের ছবি তোলা শেখানোর পরিকল্পনা চলছে। এ ছাড়া নবজাতকের ছবি তুলতেও পছন্দ করেন তিনি।
‘আমি আর একটু শিখে তারপর কাজ করতে চাই। যদিও কাজের প্রস্তাব আসছে, আমি এখন শেখাতেই মনোযোগ দিচ্ছি।’
ছবি তোলা তো শুধু নয়; আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণা মিলিয়ে একেকটা ব্যাচে গড়ে ওঠে একেকটা পরিবার। লেভিটেশন ফটোগ্রাফি বা উড়ো খাবারদাবারের ছবি তোলার ব্যাপারে সবারই বেশ আগ্রহ। ‘ওটা মূলত এডিটিংয়ের খেলা’, হেসে জানিয়ে দিলেন রোয়েনা। দেশ ছেড়ে এসে এই শিক্ষার্থীদের আড্ডায় নস্টালজিয়ায় ডুবে যান তিনি। বেসিক, অ্যাডভান্সড ও ইন্টারমিডিয়েট—তিন ধরনের কোর্স করে পোর্টফোলিও বানাতে পারবেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অনেকেই এখন নিজেরাও ফুড ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।
প্রায় এক যুগ আগে বাংলাদেশ থেকে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, কানাডায় এসেও সে পথেই চলছেন। মন থেকে চান—শুধু দক্ষিণ এশীয় নয়, বাংলাদেশের খাবারেই সবাই চিনবে দেশের নাম।
রোয়েনার কাজের বিস্তারিত কিংবা তাঁর তোলা আরও ছবি দেখতে পারেন এখানে: www.roenamahjabeen.com