আমরা আর্জেন্টাইনরা কষ্ট সহ্য করতে জানি, বলছেন ম্যাক অ্যালিস্টার

প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলেছিলেন ২০২২ সালে। কেমন ছিল সেই রোমাঞ্চ? সেটাই প্লেয়ারস ট্রিবিউনে লিখেছেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। পড়ুন তাঁর লেখার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।

আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার
ছবি: এএফপি

মাকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরা দরকার। সে না থাকলে এসবের কিছুই হতো না। প্রিমিয়ার লিগে চ্যাম্পিয়ন হতাম না। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তো কোনোভাবেই না। আমার নামটাও হয়তো আপনাদের জানা হতো না।

২০২০ সালের ডিসেম্বরের কথা। মায়ের সঙ্গে ফেসটাইমে কথা বলছিলাম আর ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম। আমি তখন ব্রাইটনে আমার ফ্ল্যাটে। আর মা বহুদূর—বুয়েনস এইরেসে, আমাদের বাড়িতে। আমি বলছিলাম, ‘মা, আর পারছি না। বাড়ি চলে আসব। এখান থেকে আমার বেরোনো দরকার।’

সেই সময়ে ব্রাইটনের হয়ে খেলার সুযোগ পাচ্ছিলাম না বললেই চলে। ভীষণ লজ্জা লাগত। কারণ, আমার গায়ে তখন প্রিমিয়ার লিগে খেলা একটা ক্লাবের ১০ নম্বর জার্সি, আর্জেন্টিনায় যেটা অনেক শিশুর কাছে স্বপ্নের মতো। অথচ দলে আমার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। নামের কোনো মূল্য ছিল না। মনে হতো, আমার ওপর কোনো অভিশাপ আছে।

বিষণ্নতায় ডুব

২০২০ সালের শুরুতে বোকা জুনিয়র্স থেকে যখন প্রথম ইংল্যান্ডে আসি, একটা ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নেমেছিলাম। তার মাত্র কয়েক দিন পরই পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেল। কোভিড। ব্যস, সব বন্ধ। ফুটবল নেই। বন্ধু নেই। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো, আমি এমন এক দেশে আটকা পড়েছিলাম, যে দেশের ভাষাই জানি না। বাধ্য হয়ে জুমে ইংরেজির প্রাথমিক পাঠ নেওয়া শুরু করি।

ফুটবলাররা নাকি অল্প বয়সেই ‘বড়’ হয়ে যায়। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে আমরা আদতে সেই জেদি বাচ্চাটাই থাকি। আমি প্রতিদিন মাকে ফেসটাইম করতাম। কীভাবে ওভেন চালু করব, ডিটারজেন্ট কোথায় দেব—কত প্রশ্ন! একে তো একা একা থাকা, তার ওপর খেলতে না পারা, বিষণ্নতায় ডুবে গিয়েছিলাম। অনেকেই জানে না, সেবার বড়দিনের সময়ে আমি ব্যাগ গুছিয়ে ফেলেছিলাম। সত্যি! ক্লাব ছাড়ার জন্য আমার কাছে দুটো প্রস্তাব ছিল—একটা রাশিয়া থেকে, অন্যটা স্পেন থেকে। সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিলাম।

কিন্তু মা তো মা-ই! তাঁরা ঠিক জানেন, কোন সময়ে কী বলতে হয়।

মা আমাকে সেই দিনগুলোয় ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন, যখন আমি প্রতিদিন ভাইদের সঙ্গে পেছনের উঠানে ফুটবল খেলতাম। গরমের শুরুতে যে উঠানের ঘাসগুলো একদম সবুজ, মসৃণ আর নিখুঁতভাবে ছাঁটা থাকত, শেষে দেখা যেত সেটাই গর্তে ভরা। এক ভাইয়ের পায়ের আঙুল কাটা, আরেক ভাইয়ের গালে ক্ষত, অন্যজনের হয়তো কপাল ফেটে রক্ত ঝরছে!

ছোটবেলায় শিক্ষকেরা যখন জিজ্ঞেস করতেন বড় হয়ে কী হতে চাই, তাঁদের দিকে এমনভাবে তাকাতাম, যেন তাঁরা পাগল হয়ে গেছেন।

‘কী হতে চাই মানে! ফুটবলার, ফুটবলার এবং ফুটবলার।’

বাবাও ফুটবলার ছিলেন। তিনি আমার সঙ্গে একটা চুক্তি করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘তোমার কাছে হাজারটা চাওয়া আমার নেই। শুধু চাই, তুমি যা-ই বেছে নাও না কেন, মন থেকে সেটাই কোরো।’

অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার

বিশ্বকাপের স্মৃতি

বিশ্বকাপের তখন ১১ মাস মাত্র বাকি। মনে আছে বাবা বলেছিলেন, ‘আলে, যদি প্রিমিয়ার লিগে মূল একাদশে খেলা চালিয়ে যেতে পারো, তুমি আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা করে নেবে।’

আমি বলেছিলাম, ‘পাগল! দল এখন একদম টাইট। মাত্রই কোপা আমেরিকা জিতেছে। এটা অসম্ভব।’

বাবা পরিসংখ্যান আর অ্যানালিটিকস নিয়ে খুব ঘাঁটাঘাঁটি করেন। আমাকে একের পর এক স্ক্রিনশট পাঠাচ্ছিলেন...‘আলে দেখো, এই খেলোয়াড় তার ক্লাবের হয়ে মাত্র ৫১ শতাংশ ম্যাচে খেলেছে। আর তুমি এখন খেলছ ৭৩ শতাংশ।’

হেসে বলেছিলাম, ‘আচ্ছা বাবা ঠিক আছে ঠিক আছে।’

কিন্তু সত্যিই তা-ই হলো। যেই আমি ব্রাইটনের হয়ে বদলি বেঞ্চ থেকে মাঠে নামার সুযোগ পাচ্ছিলাম না, কদিন পর দেখা গেল সেই আমিই আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছি।

প্রথম ম্যাচে ইতিহাস ঘটল বটে। সৌদি আরবের কাছে আমরা হেরে বসলাম।

দ্বিতীয়ার্ধে, আমরা ততক্ষণে পিছিয়ে পড়েছি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে গা গরম করছিলাম কয়েকজন। আমি খুব আশা নিয়ে বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম কোচ আঙুল উঁচিয়ে ইশারায় ডাকছেন, ‘এসো, মাঠে নামো!’

আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। অবশেষে বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছি! বেঞ্চের দিকে দৌড় লাগালাম। কিন্তু তখনই কোচ হাত নেড়ে বোঝালেন, ‘না না। তুমি না। তোমার পেছনের জন।’

ভাবুন, ঘটনাটা বিশ্বকাপের! সবচেয়ে লজ্জার ব্যাপার হলো, আমার পরিবারের সদস্যরা ঠিক ডাগআউটের পেছনের সিটেই বসে ছিল। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম বাবা মাথা নাড়ছেন, যেন বলছেন, ‘এটা কী হলো!’

সৌদি আরব ৯০ মিনিট ধরে জানপ্রাণ দিয়ে লড়ে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। এরপর ছিল আমাদের কষ্ট পাওয়ার পালা। গণমাধ্যমগুলো রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছিল। চাপটা সবাই টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু ভাগ্যিস, লিও ছিল কথা বলার জন্য। সে বলেছিল, সমর্থকেরা যেন বিশ্বাস না হারায়, আমরা দেশকে হতাশ করব না। খুব সাদামাটা কথা। কিন্তু যখন লিও এ কথা বলে, তখন মনে সত্যিই বিশ্বাসটা জেগে ওঠে।

সৌদি আরবের বিপক্ষে সেই হারের পর আমাদের ওপর যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তবে আমরা আর্জেন্টাইনরা কষ্ট সহ্য করতে জানি। এটা আমাদের ডিএনএতে আছে। আমার মনে হয়, এটাই আমাদের গোপন রহস্য। হয়তো আমরা এই পাগলামিটা একটু উপভোগও করি।

আর্জেন্টিনার ধরনই এটা। আমরা সহজ পথে হাঁটতে পছন্দ করি না। হ্যাঁ, আমরা জিততে চাই, কিন্তু কষ্ট সহ্য করাটা শিখতেও চাই। আমাদের সৌন্দর্য হয়তো এটাই। (ঈষৎ পরিমার্জিত)