
পুরান ঢাকায় ২০ ফুট সড়কের পাশের একটা ৫ কাঠা জমিতে ডিসেম্বরের আগে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৯০০ বর্গফুটের ভবন নির্মাণ করা যেত। ফ্ল্যাট করা যেত সর্বোচ্চ ৬টি। সেই একই জমিতে বর্তমানে ১১ হাজার ৭০০ বর্গফুট আয়তনের ভবন করা যাবে। অর্থাৎ ভবনের আয়তন বেড়েছে ২ হাজার ৩৪০ বর্গফুট। আর ফ্ল্যাট করা যাবে ১২টি, অর্থাৎ দ্বিগুণ।
রাজধানীর নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ সংশোধন করে এভাবেই ঢাকার কিছু এলাকায় আগের চেয়ে বেশি আয়তন ও ইউনিটের ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। ফলে ঢাকায় এলাকাভেদে ভবনের আয়তন ও ইউনিটের তফাত অনেকটাই কমে এসেছে। ড্যাপের এমন সংশোধনকে আবাসন ব্যবসায়ীরা স্বাগত জানালেও পরিকল্পনাবিদদের অনেককে ক্ষুব্ধ করেছে।
ঢাকা মহানগরের একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা হচ্ছে ড্যাপ। এর মাধ্যমেই ঢাকা ও আশপাশের এলাকার ভূমি ব্যবহার, আবাসন, পরিবহন, পানিনিষ্কাশন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন, সামাজিক ও নাগরিক সেবা নির্ধারিত হবে। সহজ ভাষায় বললে, ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার নগর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কীভাবে হবে, তা এই দলিলের আলোকেই ঠিক হবে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালের আগস্টে ড্যাপ কার্যকর করে। ঢাকাকে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন এই ড্যাপে ভবনের আয়তন ও ফ্ল্যাটের সংখ্যা আগের থেকে কমানো হয়। এতে জমির মালিক ও আবাসন ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হন। ড্যাপ সংশোধনের দাবি জানান তাঁরা। ফলে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কিছু সংশোধনী আনে সরকার। তাতেও সন্তুষ্ট হননি ব্যবসায়ীরা। সে কারণে আবারও ড্যাপ সংশোধনের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এ কমিটির সুপারিশেই গত ডিসেম্বরে দ্বিতীয়বারের মতো ড্যাপ সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
ড্যাপ সংশোধনের মাধ্যমে আবাসিক ভবনের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর বা ফার) বাড়ানো হয়েছে। যেমন এত দিন ৬ মিটার বা প্রায় ২০ ফুট প্রশস্ত সড়কের ফার ছিল ২ দশমিক ৭৫। সেটি এখন বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ২৫। আর ৯ মিটার (৩০ ফুট) প্রশস্ত সড়কের ফার ৩ দশমিক ২৫ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে সাড়ে ৩। ১২ মিটার (৪০ ফুট) সড়কের ফার ৩ দশমিক ৭৫ থেকে বাড়িয়ে ৪ করা হয়েছে। আর ১৮ মিটার (৬০ ফুট) সড়কের ফার ৪ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ২৫ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২৪ মিটার (৭৯ ফুট) বা তার বেশি আয়তনের সড়কের ফার ৪ দশমিক ৫০ থেকে বৃদ্ধি করে ৪ দশমিক ৭৫ করা হয়।
একইভাবে ৬৮টি জনঘনত্ব ব্লকের মধ্যে পুরান ঢাকা, মগবাজার, শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর, আফতাবনগর-বনশ্রী, রাজাবাজার, শুক্রাবাদ, পান্থপথ, মিরপুর, বাড্ডা, নিকেতন, বারিধারাসহ বিভিন্ন এলাকায় এলাকাভিত্তিক ফার বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ও সাঁতারকুলের এলাকাভিত্তিক ফার কমানো হয়েছে। আর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, জলসিঁড়িসহ কয়েকটি এলাকার এলাকাভিত্তিক ফার আগের মতো রাখা হয়েছে।
এলাকাভেদে কাঠাপ্রতি আবাসন ইউনিটের হার মূল ড্যাপ থেকে বাড়ানো হয়েছে। এতে কয়েকটি এলাকায় ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়বে। যেমন মূল ড্যাপে পুরান ঢাকায় আবাসন ইউনিটের হার ছিল ১ দশমিক ২। সেটি বাড়িয়ে দ্বিগুণ, অর্থাৎ ২ দশমিক ৪ করা হয়েছে। এর মানে পুরান ঢাকায় ৫ কাঠা জমিতে ৬টির পরিবর্তে সর্বোচ্চ ১২টি ফ্ল্যাট করা যাবে। পুরান ঢাকা ছাড়াও দক্ষিণখান, ফরিদাবাদ, মিরপুর, গুলশান–বনানী, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, ধানমন্ডি, পূর্বাচল নতুন শহরসহ কয়েকটি এলাকার আবাসন ইউনিটের হার মূল ড্যাপ থেকে বাড়ানো হয়েছে।
সড়কের প্রশস্তের ভিত্তিতে ফার, এলাকাভিত্তিক ফার ও কাঠাপ্রতি আবাসন ইউনিটের হার বাড়ানোর কারণে ভবনের আয়তন ও ইউনিট কতটা বাড়বে? উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মোহাম্মদপুরে ২০ ফুট সড়কের পাশের একটি ৫ কাঠার প্লটে এত দিন সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৭২০ বর্গফুট আয়তনের ভবন করা যেত। ফ্ল্যাট হতো ৯-১০টি। এখন নির্মাণ করা যাবে ১১ হাজার ৭০০ বর্গফুট। আর ইউনিট করা যাবে ১১টি।
মিরপুরে ২০ ফুট সড়কের পাশের একটি ৫ কাঠার প্লটে এত দিন সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৯০০ বর্গফুট আয়তনের ভবন করা যেত। ফ্ল্যাট করার সুযোগ ছিল ৯-১০টি। বর্তমানে সেই একই জমিতে ১১ হাজার ৭০০ বর্গফুট আয়তনের ভবন নির্মাণ করার অনুমতি মিলবে। তাতে ফ্ল্যাট বেড়ে হবে ৯–১০টি।
আগে গুলশান-বনানী এলাকায় ২০ ফুট সড়কের পাশের ৫ কাঠা জমিতে ৯ হাজার ৯০০ বর্গফুট আয়তনের ভবন করার সুযোগ ছিল। ফ্ল্যাট বা ইউনিট হতো ৮-৯টি। এখন একই জমিতে ১১ হাজার ৭০০ বর্গফুট আয়তনের ভবন করা যাবে। ফ্ল্যাট ৯-১০টি পর্যন্ত হতে পারে।
দ্বিতীয় দফার সংশোধনে ড্যাপের আওতাধীন এলাকার কৃষিজমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে অনুমোদন নিয়ে কৃষিজমিতে পোলট্রি, গবাদিপশুর খাবার, ফিশারি ইত্যাদির জন্য অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা যাবে। এত দিন কৃষিজমিতে মুদিদোকান, ফার্মেসি, সরকারি প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয়ের মতো স্থাপনা করা যেত। এখন থেকে সেগুলো আর থাকছে না।
ড্যাপ সংশোধনের পাশাপাশি একই দিন ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০২৫–এর প্রজ্ঞাপনও জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০০৮ সালের বিধিমালা দিয়েই এত দিন নির্মাণকাজ হচ্ছিল। ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদন, আপিল ও মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন ফি আগে ছিল ১ হাজার টাকা। এখন প্রতিবারের জন্য দিতে হবে ৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ব্লকভিত্তিক আবাসিক ইউনিট নির্মাণ আবেদনের ক্ষেত্রে প্রতি কাঠায় নতুন করে ৫ হাজার টাকা ফি আরোপ হতে পারে, যা এত দিন ছিল না।
আবাসিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিতে প্রতি বর্গমিটারে ৫০ টাকা ফি দিতে হবে। বাণিজ্যিক, শিল্পকারখানা ও গুদামের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারে ১৫০ টাকা ফি লাগবে। এত দিন আবাসিক ভবনের মোট মেঝে এলাকা (ফ্লোর এরিয়া) অনুযায়ী নির্ধারিত ফি দিতে হতো। যেমন কোনো ভবনে মোট ৩ হাজার বর্গমিটার মেঝে এলাকা থাকলে এত দিন ইমারত নির্মাণ অনুমোদন ফি দিতে হতো ২৬ হাজার টাকা। এখন সেটি বেড়ে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা হবে।