
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক এম রিজওয়ান খান। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. সাইফুল্লাহ
প্রকৌশলী ও প্রকৌশলের শিক্ষার্থীদের জন্য এআই কতখানি সম্ভাবনা ও কতখানি শঙ্কা নিয়ে আসছে—আপনার কী মনে হয়?
এম রিজওয়ান খান: ৫ থেকে ১০ বছরের মধে৵ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বিশাল পরিবর্তন আনবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি টুল সঠিকভাবে ব্যবহার করলে যেমন উপকারে আসতে পারে, তেমনি ভুলভাবে ব্যবহার করলে ক্ষতিও হতে পারে। আমি মনে করি, প্রযুক্তিকে আমরা কী করে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে পারি, সেটিই আমাদের ভাবতে হবে। যেমন আজকাল প্রচুর ফেক নিউজ আসছে, তাই বলে কি আপনার কাজ আপনি বন্ধ করে দেবেন? হ্যাঁ, এটা ঠিক, প্রকৌশলীদের মানসিকতায়ও বড় পরিবর্তন আনতে হবে; কিন্তু কাজের সুযোগ কমে যাবে, এমনটা আমি মনে করি না। আগামী কয়েক বছরে সবকিছু দ্রুত বদলাবে। এই পরিবর্তনের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই যদি বলি, আপনারা কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
এম রিজওয়ান খান: প্রথমত, আমরা সব কোর্সে এআই যুক্ত করার চেষ্টা করছি। শুধু বিজ্ঞান বা প্রকৌশলে নয়; এআইয়ের ধারণা সবার থাকতে হবে। ধরা যাক, আপনি যে কোম্পানিতে চাকরি করছেন, সেখানে একটি রিপোর্ট তৈরি করতে বলা হলো। হোক সেটি ফাইন্যান্স, ম্যানেজমেন্ট বা মার্কেটিং রিপোর্ট। আপনি যদি এআই না জেনে কাজটা করতে যান, অন্য কেউ আপনার ১০ ভাগের ১ ভাগ সময়ে কাজটা করে ফেলবে। ফলে আপনি চাকরি হারাবেন। তাই প্রতিটি কোর্সে যেসব ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব থাকতে পারে, সেসব জায়গায় আমরা এআই যুক্ত করছি। শুধু পাঠ্যক্রমে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কাজেও এআই ব্যবহার শুরু করেছি। ধরা যাক, আপনি একজনকে নিয়োগ দেবেন। ৭০০ সিভি জমা পড়ল। এখন এই ৭০০ সিভি একটা একটা করে বিশ্লেষণ করা তো আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমরা একটি সিস্টেম তৈরি করছি, যেখানে এআইকে দিলেই পুরো একটি টেবিল তৈরি করে দেবে। সেখানে কার কত সিজিপিএ, কার কী অভিজ্ঞতা, সব উল্লেখ থাকবে।
কিছুদিন আগে একটি প্রতিবেদন পড়লাম; যেখানে বলা হচ্ছে, এআইয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের এখন আর গভীরভাবে চিন্তার চর্চা হচ্ছে না। তাঁদের চিন্তাশক্তির চর্চা কমে যাচ্ছে। আপনি কি এর সঙ্গে একমত?
এম রিজওয়ান খান: না। আমার মতে, এখন এটা মনে হচ্ছে। কারণ, এআই যেভাবে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, আমরা এখনো আমাদের পাঠ্যক্রমটাকে সেই অনুযায়ী সাজাতে পারিনি। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার পদ্ধতিটা তৈরি করতে পারিনি। আমাদের সময় আমরা স্লাইড রুল দিয়ে গণনা করতাম। যখন ক্যালকুলেটর এল, তখন বড় বড় হিসাবও দুই মিনিটেই করে ফেলা সম্ভব হলো। এখন কেউ কি বলবে, ক্যালকুলেটরের জন্য আমি অঙ্ক শিখতে পারিনি? কারণ, ক্যালকুলেটর আসার পর আমরা প্রশ্নের ধরন বদলেছি। আমাদের সময় মানসাঙ্ক বলে একটি ব্যাপার ছিল। অর্থাৎ মনে মনে অঙ্ক করা। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো মানসাঙ্কের নাম শোনেনি। তাই বলে কি তাদের বুদ্ধি কমে গেছে? ওরা কি অঙ্ক কম শিখছে? ওরা শুধু মস্তিষ্কটাকে একটু ভিন্নভাবে কাজে লাগাচ্ছে। ওদের মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে বিকশিত হচ্ছে।
এখনকার সময়ে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমির এক হয়ে কাজ করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনারা কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন?
এম রিজওয়ান খান: আমাদের এখানে পাঠ্যক্রমে যেকোনো পরিবর্তন আনার সময় বিএইটিইর (বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন) মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক। ওরা কিন্তু জানতে চায়, ইন্ডাস্ট্রিতে যা চাওয়া হচ্ছে, আমরা আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের সেটি দিচ্ছি কি না। তাই আমরাও প্রতিনিয়ত নিজেদের হালনাগাদ (আপডেটেড) রাখার চেষ্টা করি। আরেকটি দিক হলো ইউআইইউর ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড রিসার্চের (আইএআর) সঙ্গে অনেকগুলো কোম্পানির এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) আছে। তাঁরা যখন কোনো সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসে, আমরা একত্রে সমাধানের চেষ্টা করি। যেমন নিউরোমার্কেটিং নিয়ে কাজ হচ্ছে। ধরা যাক, আপনি একটি মুঠোফোনের বিজ্ঞাপন করছেন। মুঠোফোন হাতে একজন মডেলের ছবিসহ একটি বড় বিলবোর্ড লাগালেন। এখন আপনার সম্ভাব্য ক্রেতা কি মুঠোফোনটি দেখবেন, নাকি মডেলকে দেখবেন? এটা বিশ্লেষণ করাই হলো নিউরোমার্কেটিং। অন্যদিকে আমরা স্যাটেলাইট বা ড্রোনের ইমেজ নিয়ে কাজ করছি। এর ফলে ফসলের ছবি বিশ্লেষণ করেই বলে দেওয়া যাবে শস্যের উৎপাদন কেমন, সার লাগবে কি না, পোকা ধরেছে কি না…ইত্যাদি। ফলে হ্যাঁ, আমরা আমাদের গবেষণা আর পাঠ্যক্রম দুটিই উন্নত করছি।
পাশের দেশের প্রকৌশল গ্র্যাজুয়েটদের তুলনায় আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের অবস্থান কেমন? বিশ্বে কি আমরা প্রভাব ফেলতে পারছি? আপনার কী মনে হয়?
এম রিজওয়ান খান: বাইরের দেশে বুয়েটের গ্র্যাজুয়েটদের কী পরিমাণ চাহিদা, আপনি ভাবতে পারবেন না। কিছুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে একজন আমাকে ই–মেইল করেছে। বলছে, তোমাদের বুয়েটের দুজন স্টুডেন্ট আমাকে দাও। বুয়েট ছাড়া অন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভালো করছে। তবে হ্যাঁ, আমাদের অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ালেখায় বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে। বুয়েট ভালো করার একটি বড় কারণ হলো ওরা বেছে ভালো শিক্ষার্থীদেরই নেয়। কিন্তু লাখো ছেলেমেয়ে জিপিএ ৫ পাচ্ছে, বুয়েটে সুযোগ পাচ্ছে হাজারখানেক, বাকিরা কোথায় যাচ্ছে? আমি তো দেখি, এমন অনেক ছেলেমেয়ে জিপিএ ৫ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, যারা গণিত বা পদার্থবিজ্ঞানের বেসিক প্রশ্নেরও সঠিক জবাব দিতে পারে না। ভিতটা নড়বড়ে বলেই উচ্চশিক্ষায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। প্রায় ১৮ কোটি লোকের দেশ আমাদের, এখান থেকে আরও অনেক মেধাবী উঠে আসার কথা ছিল।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য তাহলে আপনার পরামর্শ কী হবে
এম রিজওয়ান খান: আমি আমার ছেলে-মেয়েদের বলতাম, বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত সব পড়তে। সাজেশন নিয়ে পড়া উচিত না। ক্লাসে অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, বেসিক ইন্টিগ্রেশন পারে না। কারণ, পরীক্ষায় ডিফারেন্সিয়েশনের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন অপশনাল ছিল। ইন্টিগ্রেশন না জেনে জিপিএ ৫ পাওয়া যায়; কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার তো হওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের নিজ উদ্যোগে দুটি বিষয় খুব ভালো করে শিখতে হবে—গণিত ও ইংরেজি। ইংরেজির কথা বলছি কারণ, বৈশ্বিক পর্যায়ে টিকে থাকতে হলে ইংরেজিটা লাগবেই। পরীক্ষার জন্য পড়লে হবে না, গণিত ও ইংরেজি আনন্দ নিয়ে পড়তে হবে।