৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে সুগন্ধি নারীদের পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকে
৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে সুগন্ধি নারীদের পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকে

বিশ্বের বিখ্যাত এই সুগন্ধি তৈরি হয়েছিল একটি ভুল থেকে

গ্যাব্রিয়েল বনাখ শ্যানেল, ফ্যাশন দুনিয়ায় পরিচিত কোকো শ্যানেল নামে। জন্ম ১৮৮৩ সালের ১৯ আগস্ট, ফ্রান্সের সমুর নামে এক ছোট্ট শহরে হতদরিদ্র কুমারী মায়ের ঘরে। মা মারা যাওয়ার পর তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অবাজিনের একটি অনাথ আশ্রমে। কিশোরী বয়সের বেশির ভাগ সময় সেখানেই কাটে তাঁর। শ্যানেল খুব পরিচ্ছন্ন থাকতেন। সুঘ্রাণ নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। শুরুতেই এ তথ্য জানাচ্ছি, কারণ বিশ্বখ্যাত শ্যানেল ফাইভ সুগন্ধির জন্ম তাঁর এই পরিপাটি অভ্যাস থেকেই। ধনী ব্যক্তিদের সঙ্গিনীদের সঙ্গে কাজ করার সময় তাঁদের শরীরের গন্ধ তাঁর ভালো লাগত না। তাই একসময় সিদ্ধান্ত নেন যে একটি সুগন্ধি বানাবেন। সুগন্ধিতে দেবেন পরিষ্কার ও সতেজ অনুভূতি। একই সঙ্গে চেয়েছিলেন, সেটা বাজারের বাকি সব সুগন্ধির চেয়ে পুরোপুরি আলাদা হবে। কোকো শ্যানেলের জন্মদিন উপলক্ষে জেনে নেওয়া যাক তাঁকে এবং তাঁর বিখ্যাত সুগন্ধি শ্যানেল ফাইভ সম্পর্কে নানা তথ্য।

১৯২০ সালের গ্রীষ্মের শেষ দিকে কোকো শ্যানেল তাঁর প্রেমিক গ্র্যান্ড ডিউক দিমিত্রি পাভলোভিচের সঙ্গে কোট দাজুরে বেড়াতে যান। সেখানেই আর্নেস্ট বো নামের এক রসায়নবিদের কথা জানতে পারেন। আর্নেস্ট তখন পারফিউমার হিসেবেও নামকরা এবং কাজ করছিলেন রাশিয়ার রাজপরিবারের জন্য
সে সময় সতেজ ঘ্রাণের জন্য লেবু, বার্গামট ও কমলার মতো সাইট্রাসজাতীয় ফল ব্যবহার করা হতো। ঘ্রাণগুলো সতেজ হলেও ত্বকে বেশিক্ষণ থাকত না। তত দিনে রসায়নবিদেরা অ্যালডিহাইড নামের জৈব যৌগ আবিষ্কার করেছিলেন, যা কৃত্রিমভাবে এ ধরনের ঘ্রাণ উৎপাদন করতে পারে। তবে এটি খুব শক্তিশালী হওয়ায় পারফিউমাররা ব্যবহার করতে ভয় পেতেন
ফরাসি-রুশ রসায়নবিদ আর্নেস্ট বোর সাহায্য চাইলেন শ্যানেল। বো তাঁকে কয়েকটি সুগন্ধির নমুনা দিলেন। প্রতিটির সঙ্গে ছিল আলাদা নম্বর। শ্যানেল বেছে নিলেন ৫ নম্বরটি। ১৯২১ সালে সেখান থেকেই শুরু হয় শ্যানেল ফাইভ
সে সময় সাধারণত একটি ফুলের ঘ্রাণের ওপর ভিত্তি করেই সুগন্ধি তৈরি করা হতো। কিন্তু শ্যানেল ফাইভ ছিল অ্যালডিহাইড ও বিভিন্ন ফুলের ঘ্রাণের মিশ্রণ। ফলে এর ঘ্রাণ ছিল অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা ও রহস্যময়। এ আলাদা বৈশিষ্ট্যই ধীরে ধীরে শ্যানেল ফাইভকে কিংবদন্তি সুগন্ধিতে পরিণত করে। ১০৫ বছর পর আজও শ্যানেল ফাইভ বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় সুগন্ধিগুলোর একটি
অভিজাত এ সুগন্ধি আদতে গবেষণাগারের একটি ভুলের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল। রসয়ানবিদ বোয়ের সহকারী সুগন্ধি তৈরির সময় এমন পরিমাণ অ্যালডিহাইড মিশিয়েছিলেন, যা আগে কখনো কোনো সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়নি
কোকো শ্যানেল পরে বলেছিলেন, ‘এমন একটি সুগন্ধিরই অপেক্ষায় ছিলাম, যা অন্য সব সুগন্ধি থেকে আলাদা। একজন নারীর জন্য এটি এমন সুগন্ধি, যাতে নারীর নিজস্ব ঘ্রাণ থাকবে।’ জুঁই, গোলাপ, চন্দন ও ভ্যানিলার মিশেলে তৈরি সুগন্ধি দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর পেছনে শ্যানেলের বুদ্ধিদীপ্ত প্রচারণারও ভূমিকা ছিল।
সুগন্ধিটি উদ্ভাবনের পর বিষয়টি উদ্‌যাপন করতে কোকো শ্যানেল ও আর্নেস্ট বো কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে রিভেরার একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় যান। সেখানে শ্যানেল টেবিলের চারপাশে শ্যানেল ফাইভ ছড়িয়ে দেন। রেস্তোরাঁয় যাতায়াতের সময় একের পর এক নারী থেমে জানতে চাইছিলেন, সুগন্ধিটি কী এবং কোথায় পাওয়া যায়। ‘দ্য সিক্রেট অব শ্যানেল নাম্বার ফাইভ: দ্য ইনটিমেট হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ফেমাস পারফিউম’ বইয়ের লেখক টিলার মাজেও লিখেছেন, ‘শ্যানেলের জন্য সেটিই ছিল বিশেষ মুহূর্ত। কারণ, প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষ এমন একটি সুগন্ধির ঘ্রাণ পেয়েছিল, যা তারা আগে কখনো পায়নি।’
শ্যানেল ফাইভকে অনেক সময় ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট’ সুগন্ধি বলা হয়। কারণ, এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ফুলের ঘ্রাণ দিয়ে তৈরি করা হয়নি। বরং অনেক ঘ্রাণের সুন্দর এক মিশ্রণ। ত্বকে লাগানোর পর ধীরে ধীরে এর ঘ্রাণ বদলাতে থাকে
শ্যানেল ফাইভের বোতলটিও ভেতরে থাকা সুগন্ধির মতো বিখ্যাত। সাধারণ নকশার এ বোতল কিন্তু সে সময় ছিল খুবই আকর্ষণীয়। নতুন ধরনের স্বচ্ছ কাচের বোতলের ভেতরে থাকা গাঢ় সোনালি রঙের পারফিউম সহজেই নজর কাড়ে। বোতলের এ সরল নকশাই আধুনিকতার প্রকাশ। বোতলটি তৈরির পর থেকে খুব সামান্যই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটি আজও বিলাসিতা ও আভিজাত্যের প্রতীক। সাদাকালো লেবেল ও সাধারণ লেটারিং বোতলটির পুরোনো ও চিরকালীন সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে
সুগন্ধিটি ফ্যাশন, সিনেমা, গানসহ বিভিন্ন অঙ্গনের তারকাদেরও বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। হলিউড তারকা মেরিলিন মনরো একবার বলেছিলেন, রাতে ঘুমানোর সময় তাঁর গায়ে থাকে শুধু কয়েক ফোঁটা শ্যানেল ফাইভ। তাঁর এ মন্তব্যের পর পারফিউমটির আকর্ষণ ও আবেদন আরও বেড়ে যায়
যুগে যুগে বিভিন্ন সিনেমা, বিজ্ঞাপন ও শিল্পকর্মে শ্যানেল ফাইভের উপস্থিতি দেখা যায়। আর এভাবেই শ্যানেল ফাইভ কেবল একটি পণ্য নয়, নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও তৈরি করেছে। আভিজাত্যের আরেক নাম হয়ে উঠেছে শ্যানেল ফাইভ। সুগন্ধিটির জনপ্রিয়তায় অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই পরে এ রকম পারফিউম বানিয়েছে, তবে শ্যানেল ফাইভের মতো খ্যাতি আর কোনোটি পায়নি
শ্যানেল ফাইভ বিভিন্ন বয়সের নারীর কাছে প্রিয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কয়েকটি সংস্করণ এসেছে। এসব মূল সুগন্ধির হালকা বা গাঢ় সংস্করণ। তবে মূল ভাবনা বা ঘ্রাণ এখনো একই। কোকো শ্যানেলের স্বপ্ন সত্যি হয়েছে, তাঁর এই সুগন্ধি আজও নারীত্ব, সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক

সূত্র: বিবিসি ও মাইপারফিউমশপ