অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
অলংকরণ: সব্যসাচী মিস্ত্রী

বিশ্ব হার্ট দিবস

আধুনিক হার্ট সার্জারিতে আছে অনেক রকমের সুবিধা

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০; বিশ্ব হার্ট দিবস। প্রতিবছর বিশ্বে অন্তত পৌনে দুই কোটি মানুষ হৃদ্‌রোগে মৃত্যুবরণ  করে। এ জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের উদ্যোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের এক শর বেশি দেশে দিবসটি পালিত হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান ফরচুন নিবেদিত হৃদয় দিয়ে জয় করি। এবারের বিষয়: কার্ডিওভাসকুলার সার্জারির ভবিষ্যৎ।

ডা. ফাইজা রাহলার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকার কার্ডিওথোসারিক অ্যান্ড ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সোহেল আহমেদ। অনুষ্ঠানটি ২৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

বাংলাদেশে দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বয়স্ক রোগীর পাশাপাশি এ দেশে কম বয়সী রোগীর সংখ্যাও অনেক। হৃদ্‌রোগের অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে সার্জারি। তবে সব হৃদ্‌রোগেই সার্জারির দরকার হয় না। বয়স্কদের মধ্যে হার্টের ব্লক বা এস্কেমিক হার্ট ডিজিজ, ভালভুলার হার্ট ডিজিজ বা হার্টের দুটি ভালভের সমস্যা, অ্যায়োরটিক অ্যানিউরিজম বা হার্টের ধমনি স্ফীতির সমস্যা হলে সার্জারির প্রয়োজন হয়।

শিশু বা কম বয়সীদের হার্টে ছিদ্র বা ভিএসডি বা এএসডি হলে সার্জারি করা হয়। এ ছাড়া যেসব শিশু জন্মের পরপর নীল হয়ে যায়, অর্থাৎ যাদের হার্টের ছিদ্র থাকার পাশাপাশি ফুসফুসের রক্তনালি সরু থাকে, তাদের সার্জারি করা হয়।

বর্তমানে কার্ডিয়াক সার্জারিতে বেশ কিছু আধুনিক পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে। অনুষ্ঠানে সেসব সম্পর্কে জানা গেল ডা. সোহেল আহমেদের আলোচনা থেকে। আগে বাইপাস বা ভালভুলার সার্জারিতে বক্ষপিঞ্জরের মধ্যে যে মোটা হাড় বা স্টারনাম থাকে, তা কেটে সার্জারি করা হতো। কিন্তু এখন এই হাড় পুরোপুরি না কেটে এক পাশে কেটে অপারেশন করা হচ্ছে। যেমন মহাধমনিতে রক্ত আসার মুখে যে ভাল্‌ভ বা অ্যায়োরটিক ভাল্‌ভ সার্জারি করতে স্টারনাম কাটার দরকার হয় না। দেড় থেকে দুই ইঞ্চি মাপে সামান্য একটু কেটেই এই সার্জারি করা যায়। এ ছাড়া এই সার্জারি করতে বুকের ডান দিকে ছোট করে দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি মাপে ইনসিশন করা হয়। মাইট্রাল ভাল্‌ভ সার্জারিতেও বুকের এক পাশে ছোট করে কেটে সার্জারি করা হয়।

ছোট বাচ্চাদের হার্টের ছিদ্র ঠিক করতে একইভাবে পুরো স্টারনাম না কেটে বুকের এক পাশে সামান্য কেটে সার্জারি করা হয়। এ ধরনের সার্জারিগুলোকে মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি বলে। এ ছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে হার্টের ছিদ্র বন্ধ করতে ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিকে বলা হয় পিএসডি বা এএসডি ডিভাইস ক্লোজার। আমাদের দেশে এখন কিছু কিছু জায়গায় টিএভিআর বা ট্রান্সকেথেটার আওরটিক ভাল্‌ভ রিপ্লেসমেন্ট করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে কোনো রকম কাটাছেঁড়ার দরকার হয় না।

এমন আরও অনেক আধুনিক পদ্ধতির সার্জারি আছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশে হচ্ছে। বাংলাদেশেও খুব অল্প পরিমাণে এ ধরনের সার্জারি হলেও এখানকার চিকিৎসকেরা ধীরে ধীরে সেই পদ্ধতিগুলো ভালোভাবে অনুসরণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
প্রচলিত ধারার হার্ট সার্জারির থেকে আধুনিক হার্ট সার্জারিতে অনেক রকমের সুবিধা আছে। এ ধরনের সার্জারি হলে রোগীকে কম সময় ধরে হাসপাতালে থাকতে হয়। কনভেনশনাল সার্জারিতে যেখানে রোগীর এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে থাকা লাগে, সেখানে মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি হলে রোগী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে বাসায় ফিরতে পারে। এ ধরনের সার্জারিতে রক্তপাত কম হয় এবং ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম।

প্রতীকী ছবি

আবার অনেকে, বিশেষ করে কম বয়সী মেয়েরা চায় না যে সার্জারির পর বুকের মধ্যে কোনো দাগ থাকুক। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া প্রায় সব মানুষেরই সার্জারি নিয়ে একটা ভীতি কাজ করে। কনভেনশনাল সার্জারিতে বুক কেটে অপারেশনের কথা শুনলে অনেকে খুব বেশি ঘাবড়ে যান। এ সময় বিকল্প হিসেবে তাঁদের যদি মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারির কথা বলা হয়, তাঁরা বেশ স্বচ্ছন্দে এই পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে কনভেনশনাল সার্জারির থেকে মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি একটু জটিল। আর যেসব সার্জন এ পদ্ধতিতে একেবারেই নতুন, তাঁদের সার্জারি করতে বেশি সময় লাগে। আর দক্ষ হয়ে গেলে খুব কম সময়ে এ সার্জারি সম্পন্ন করা সম্ভব। আর এই মিনিমাল ইনভেসিভ সার্জারি খুব ব্যয়বহুল। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালেই শুধু এই সার্জারির করা হয়।

অনেক রোগীর সার্জারির সময় অ্যানেসথেসিয়া নিয়ে একটা ভয় কাজ করে। সার্জারির পর জ্ঞান ফিরবে কি না, এটা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করতে দেখা যায়। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমানে যে ধরনের অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা হয়, সেগুলো খুবই নিরাপদ। নির্দিষ্ট যে সময়ের জন্য এটি দেওয়া হয়, ঠিক ততটুকু সময় পর্যন্ত এর কার্যক্ষমতা থাকে। এরপর রোগীর ফুসফুস ও কিডনি ফাংশন যদি ভালো থাকে, তাহলে রোগী নিজে নিজেই স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেন।

অনুষ্ঠানে এস্কেমিক হার্ট ডিজিজের সার্জারির বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলো। হার্টে রক্ত চলাচল কমে যাওয়াকে এস্কেমিক হার্ট ডিজিজ বলে। এটি হলে এনজিওগ্রামের মাধ্যমে দেখে নেওয়া হয়, হার্টে বা এর রক্তনালিতে কয়টি ব্লক আছে। সব রকমের ব্লকেই যে সার্জারি করা লাগে, ব্যাপারটি এমন নয়। যদি ছোট ব্লক হয় বা একটি দুটি ব্লক থাকে তাহলে সেটি স্টেন্ট বা রিং দিয়ে সারিয়ে তোলা যায়। যাদের একের অধিক ব্লক ধরা পড়ে, তাদের সার্জারি করতেই হবে।

অনেকে মনে করেন, ব্লকের সার্জারি একবার হয়ে গেলে সেটি আর হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞ শোনালেন অন্য কথা। অতিরিক্ত ধূমপান করলে, ডায়াবেটিস লাগামহীন থাকলে এবং শারীরিক পরিশ্রমের ধারে-কাছে না গেলে আবার ব্লক হবেই। এ জন্য অপারেশনের আগে-পরে রোগীকে চিকিৎসকেরা বিশেষভাবে কাউন্সেলিং করে থাকেন। এই কাউন্সেলিংয়ে সার্জারি করার পর যাপনের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।

ডা. সোহেল আহমেদ বেশ দুঃখের সঙ্গে বললেন, ‘আমাদের দেশে খুব অল্প বয়সীদের মধ্যে হার্টে ব্লক বেশি দেখা যায় এবং তাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য একের অধিক সার্জারি করা লাগে।’

যেকোনো ধরনের হার্ট সার্জারিই খুব ব্যয়বহুল। সার্জারি এড়াতে অবশ্যই আগে থেকে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করতে হবে। এ জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করতে হবে, ধূমপান ত্যাগ করতে হবে এবং যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সেটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাহলেই হৃদ্‌রোগহীন স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব হবে।