ডা. রায়হান রাব্বানী
ডা. রায়হান রাব্বানী

সাক্ষাৎকার

সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে আক্রান্ত না হওয়ার

এক বছর ধরে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা করছেন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন, আইসিইউ ও কোভিড ইউনিটের কনসালট্যান্ট ডা. রায়হান রাব্বানী। গত বছর থেকে এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের তাণ্ডব দেখছেন তিনি। প্র স্বাস্থ্যের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কোভিড–১৯ আক্রান্ত রোগী, হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন তিনি। গত ২৭ এপ্রিল স্কয়ার হাসপাতালে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ডা. তানজিনা হোসেন

প্রশ্ন

প্রায় এক বছর হতে চলল দেশের একটি নামকরা হাসপাতালের কোভিড ইউনিট ও কোভিড আইসিইউর (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রোগীদের চিকিৎসা করছেন। এই এক বছরে বাংলাদেশে কোভিড–১৯ রোগীদের সেবা ও এর চ্যালেঞ্জ বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা বলুন।

ডা. রায়হান রাব্বানী: স্কয়ার হাসপাতাল মূলত কোভিড রোগীদের সেবা দিতে শুরু করে গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের মে মাসের দিকে। তবে এর আগে থেকেই সমস্যার গুরুত্ব বুঝে একটা প্রস্তুতিকাল চলছিল আমাদের। প্রস্তুতির প্রথম পর্যায়েই আমরা আমাদের কোভিড ইউনিট, আইসোলেশন (সঙ্গনিরোধ) শয্যা আর আইসিইউ সম্পূর্ণ পৃথক দালানে, মানে বর্ধিত ভবনে আলাদা করে ফেলি। ওই ভবনে যেসব সেবা তখন অব্যাহত ছিল, সেগুলোকে ধাপে ধাপে স্থানান্তর করে মূল ভবনে নিয়ে আসা হয়। শুধু কোভিড শয্যাই নয়, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বন্দোবস্ত করা হয়। যেমন লিনেন ও অন্যান্য বস্তু জীবাণুমুক্ত করার পদ্ধতি, রন্ধনশালা বা প্যান্ট্রির তৈজসপত্র জীবাণুমুক্ত করা, আলাদা এক্স–রে, আলট্রাসনোগ্রাফি যন্ত্র চালানো ইত্যাদি ব্যবস্থা। যেসব কর্মী এসবে নিয়োজিত থাকবেন, তাঁদেরও আলাদা করা হয় এবং সুরক্ষাসামগ্রী বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

প্রথম থেকেই কোভিড ইউনিটে কনসালট্যান্ট হিসেবে ছিলেন ডা. আহমেদ মুরসেল আনাম, ডা. শিহান মাহমুদ রেদোয়ানুল হক ও ডা. দীপঙ্কর কুমার বসাক। পরে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন ডা. প্রতীক দেওয়ান।

মোট কথা, শুরু থেকেই একটা প্রপার ট্রায়াজ (কোভিড, নন কোভিড এবং সন্দেহভাজন কোভিড রোগীর পৃথক রাখা) ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়, যাতে নন কোভিড রোগী বা স্বাস্থ্যকর্মীরা অকারণ ঝুঁকিতে না পড়েন। ফলে সাধারণ সেবা ব্যাহত না করেই এত দিন ধরে আমরা এত বেশিসংখ্যক কোভিড রোগীকে সেবা দিতে পেরেছি। নিশ্চয় প্রপার ট্রায়াজ ব্যবস্থা সঠিকভাবে ধরে রাখা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কোভিড সেবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তা না হলে হাসপাতাল নিজেই সবার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটাও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। আমরা শুরু থেকেই চিকিৎসক, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর সুরক্ষাসামগ্রী, সঠিক মাস্ক ও পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী) ইত্যাদি সরবরাহে সর্বাত্মক মনোযোগ দিয়েছি। কারণ, স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপদ ও সুস্থ না থাকলে পুরো সিস্টেমই ভেঙে পড়বে। তারপর আছে অন্যান্য আনুষঙ্গিক সেবা। যেমন একজন কোভিড রোগীর ডায়ালাইসিস লাগলে তা যেন সেখানেই করা যায়। বিশেষজ্ঞ সহায়তা, যেমন কার্ডিওলজি, নেফ্রলজি ইত্যাদি যখন যা দরকার হয়, তখন যেন পাওয়া যায়। এর বাইরে নিজস্ব পিসিআর ও মলিকুলার ল্যাবের সাপোর্ট, যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি হাসপাতালে কোভিড রোগীদের সঠিক সেবা দিতে হলে সব কিছুর সম্মিলিত ভূমিকা আছে। এত কিছুর পরও আমাদের অনেক চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন ও হচ্ছেন।

প্রশ্ন

আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আপনারা কি কোনো বিশেষ সহায়তা দিয়ে থাকেন?

ডা. রাব্বানী: নিশ্চয়। আমাদের যেসব স্টাফ এখানে কাজ করেন, তাঁদের জন্য কোভিড পিসিআর পরীক্ষা বিনা মূল্যে করা হয়। তাঁদের জটিলতা হলে আর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হলে সেটাও বিনা মূল্যে করা হয়। তাঁদের চিকিৎসার ব্যয়ভার পুরোটাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন করে। স্বাস্থ্যকর্মীদের যাতায়াতের জন্য পরিবহনের ব্যবস্থাও করা হয়, যদি কেউ চান। অনেক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী কোভিড ইউনিটে কাজ করেন বলে বাড়িতে পরিবারের কাছে যেতে দ্বিধাবোধ করেন, তাঁদের থাকার জন্য ব্যবস্থাও আছে। যাঁরা কোভিডে আক্রান্ত, তাঁদের জন্য আইসোলেশন কেন্দ্র আছে, যেন এখানেই থাকতে পারেন। আমরা প্রত্যেকের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন

২০২০ থেকে ২০২১—এই এক বছরে বাংলাদেশে কোভিড রোগীদের বিশেষত্ব, জটিলতা, গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে কি?

ডা. রাব্বানী: গত বছর আমরা যেসব রোগী পেয়েছি, তাঁদের মধ্যে তীব্রতা বা সিভিয়ারিটি এখনকার তুলনায় একটু কমই ছিল। দ্বিতীয় ঢেউয়ে এবার যে রোগীরা আসছেন তাঁদের খুব দ্রুত তীব্র জটিলতা তৈরি হচ্ছে আর একবার খারাপ হয়ে গেলে তাঁরা আর প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে খুব ভালো রেসপন্সও করছেন না। আরেকটি পার্থক্য হলো, এ বছর আমরা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী অনেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখছি, যা গতবার দেখিনি। আমার মনে আছে, গত বছর ৩০ বছরের নিচে তীব্র কোভিডে আক্রান্ত রোগী ছিল মাত্র একজন। আর এবার প্রথম থেকেই ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সী বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তাঁদের অনেকেরই অক্সিজেন লাগছে, কেউ কেউ আইসিইউ পর্যন্ত যাচ্ছেন। গতবারের তুলনায় এবার নারীদের সংখ্যাও বেশি, যদিও সামগ্রিক সংখ্যা বিবেচনায় এখনো নারীর সংখ্যা কম, তবু এটা বাড়ছে।

ডা. রায়হান রাব্বানী
প্রশ্ন

কোন ধরনের রোগীরা বেশি খারাপ হচ্ছেন বা মৃত্যুঝুঁকিতে যাচ্ছেন?

ডা. রাব্বানী: প্রথমেই বলব বয়স্ক যাঁরা, ৫৫ বছরের বেশি হলেই ঝুঁকি একটু বেড়ে যাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে যাঁদের ডায়াবেটিস আছে, বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনি জটিলতা আছে, আর যাঁরা ধূমপায়ী। যাঁরা দেরি করে আসছেন হাসপাতালে, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দেখছি, দেখব করে সময় নষ্ট করেছেন, তাঁদের মধ্যে জটিলতা বেশি, মৃত্যুহারও বেশি।

প্রশ্ন

বর্তমানে আক্রান্তদের জন্য আপনার উপদেশ কী?

ডা. রাব্বানী: প্রথমে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে আক্রান্ত না হওয়ার। যেহেতু আবার একটা ঢেউ এসেছে, তাই ব্যক্তিগত সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। মাস্ক অপরিহার্য। কেবল সঠিক পদ্ধতিতে পরা সঠিক মাস্কই আপনার জীবন বাঁচাতে পারে এই মুহূর্তে, আর কিছু না। তারপর হাত ধোয়ার অভ্যাস চালু রাখা, যা থেকে আমরা একটু সরে এসেছি। অহেতুক ঘোরাঘুরি, ভিড়ের মধ্যে যাওয়া বাদ দিতে হবে। খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়ার কোনোই দরকার নেই। এত সাবধানতার পরও যদি সংক্রমিত হয়ে যান, আর বিন্দুমাত্র উপসর্গ দেখা দেয়, যেমন জ্বর, শরীর ব্যথা, স্বাদ চলে যাওয়া, কাশি—তবে সময় নষ্ট না করে পরীক্ষা করুন। যত দ্রুত আপনি নিশ্চিত হবেন আর চিকিৎসকের পরামর্শের আওতায় আসবেন, তত বেশি আপনার পরিবার ও নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারবেন।

দয়া করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাসতে থাকা কোনো ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন দেখে কিংবা এর–ওর কথা শুনে নিজে নিজে ওষুধ খাবেন না। বেশির ভাগ রোগীই হাসপাতালে আসার আগে নানা ধরনের বিচিত্র সব ওষুধ খেয়ে আসেন। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তো আছেই, পরবর্তী সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যবস্থা (রেজিস্ট্যান্স) তৈরি হয় আর জটিলতা আরও বাড়ে।

এরপর নিজেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ (মনিটর) করুন। চিকিৎসকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখুন। ১৪ দিনের মধ্যে অন্তত তিনবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোন কোন পরিস্থিতিতে দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে, তা জেনে রাখুন। পরীক্ষায় কোভিড নেগেটিভ হলেও করোনা হতে পারে, সে ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক পরীক্ষা–নিরীক্ষাগুলো সাক্ষ্য দেবে। তাই নেগেটিভ বলে উপসর্গ সত্ত্বেও নিশ্চিন্তে বসে থাকবেন না।

প্রশ্ন

কোভিড চিকিৎসা দিতে গিয়ে আনন্দ–বেদনার অভিজ্ঞতা হয়েছে নিশ্চয়।

ডা. রাব্বানী: যেকোনো রোগীর মৃত্যুই বেদনার। এই অতিমারিতে আমাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেক অনেক মৃত্যুর সাক্ষী হতে হলো—এটা ভীষণ বেদনাদায়ক। মর্মান্তিক সব ঘটনার সাক্ষী হতে হয়েছে আমাদের। যেমন একজন ৮০ বছর বয়স্ক ভদ্রলোক আমাদের এখানে ভর্তি থাকা অবস্থায় তাঁর মধ্যবয়স্ক ছেলেকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে। হৃদয়বিদারক এক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে স্বামী ও স্ত্রী দুজনকেই মারা যেতে দেখেছি। দেখেছি সন্তানদের এক দিনের মধ্যে অনাথ হয়ে যেতে। এসব ঘটনা হয়তো সারা জীবনেও ভোলার নয়।

আরেকটি মর্মান্তিক বিষয় হলো যে আমরা আমাদের শ্রদ্ধেয় ডা. মির্জা নাজিমউদ্দিন স্যারকে হারিয়েছি। এ ছাড়া আরেকজন কম বয়স্ক সহকর্মী ডা. কাজী নাসের আহমেদকেও হারিয়েছি। নিজেদের হাসপাতালে সবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও তাঁদের আমরা বাঁচাতে পারিনি—এ দুঃখ রাখার জায়গা নেই।

ভালো অভিজ্ঞতা হলো যে এই মহামারি চিকিৎসক–রোগীর সম্পর্ককে আরও নিবিড় করেছে বলেই আমার বিশ্বাস। যাঁরা সুস্থ হয়েছেন, বাড়ি গেছেন, তাঁরা অনেক তৃপ্তি ও কৃতজ্ঞতা নিয়েই বাড়ি ফিরেছেন। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ দিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে মনেও রেখেছেন। অন্য স্বজনেরা আক্রান্ত হলে সুপরামর্শ দিয়েছেন, রেফার করেছেন। এই সংস্কৃতি তো একেবারেই ছিল না। আসলে কোভিড ইউনিটে একজন রোগী খুবই একাকী আর অসহায় অবস্থায় থাকেন, এই সময় তাঁদের একমাত্র স্বজন, সবচেয়ে বড় নির্ভরতার জায়গা চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয় এঁরা। এই করোনাকালে স্বাস্থ্যকর্মীরাও সব ভয়–সংকোচ ভুলে রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সবটুকু নিংড়ে দিয়েছিলেন—এটা একটা আস্থা ও ভালোবাসার জমি তৈরি করেছে।

করোনাকালে আমাদের দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এমন অনেকেই সেবা নিয়েছেন, যাঁরা জীবনে কোনো দিন দেশে চিকিৎসা নেননি, সব সময় বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন, তাঁরাও নিজের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। চিকিৎসক হিসেবে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

প্রশ্ন

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ডা. রাব্বানী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সহযোগিতা: ডা. রাফিয়া আলম