
থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ হলো থাইরয়েড হরমোন নিঃসৃত করা, যা দেহের রক্তচাপ, রক্তপ্রবাহ, হৃৎস্পন্দন থেকে শুরু করে দেহের মেটাবলিজম, তাপনিয়ন্ত্রণ, প্রজনন ও বিকাশের জন্য পরিহার্য। থাইরয়েড হরমোনের আধিক্য হলে একে বলা হয় হাইপার-থাইরয়েডিজম এবং স্বল্পতা হলে হাইপো-থাইরয়েডিজম।
থাইরয়েড গ্রন্থির নানা সমস্যায় চোখ আক্রান্ত হয়ে থাকে। এতে চক্ষুকোঠরের মাংসপেশি, ফ্যাট ও অন্য কোষের বিপরীতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একধরনের সংবেদনশীলতা দেখা দেয়। এখানে প্রদাহ ও তারল্যের আধিক্য দেখা দেয়। এটি একটি অটোইমিউন প্রক্রিয়া, যেখানে দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) কাজ করে না।
থাইরয়েডের কারণে নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে উপসর্গ দেখা দেয়। চোখও ব্যতিক্রম নয়। থাইরয়েডের অটোইমিউন রোগে চক্ষুকোঠরে বিরাজমান কোষ, মাংসপেশি, ফ্যাট ইত্যাদির আধিক্য দেখা দেয়।
চোখের মাংসপেশিগুলো কয়েক গুণ ফুলেফেঁপে ওঠে। একে বলা হয় মায়োপ্যাথি। ক্রমবর্ধিষ্ণু মাংসপেশি একসময় দৃষ্টি পরিবাহী স্নায়ু অপটিক নার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং দৃষ্টিতে সমস্যা করে। একে বলে অপটিক নিউরোপ্যাথি। এটি একটি চোখের জরুরি অবস্থা। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে স্থায়ী অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে।
ক্রমবর্ধিষ্ণু মাংসপেশি, ফ্যাট, ইডিমা ইত্যাদি কারণে চক্ষুকোঠরে স্থান সংকুলানের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে চক্ষুগোলককে সামনের দিকে ঠেলে দেয় এবং চক্ষু সামনের দিকে ঠিকরে বের হয়ে আসে। এই অবস্থাকে বলা হয় প্রোপ্টোসিস।
প্রোপ্টোসিস, মায়োপ্যাথি, নিউরোপ্যাথি ছাড়াও চোখে অন্য যে উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে তার মধ্যে ড্রাই আই বা চোখে খচ খচ করা, ডাবল ভিশন বা একটি বস্তুকে দুটি দেখা, চোখে লালচে ভাব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
প্রথম দু-তিন বছর এটি বর্ধিষ্ণু অবস্থায় থাকলেও পরবর্তী সময়ে এটি নিস্তেজ বা ইনঅ্যাকটিভ হয়ে পড়ে। বেশির ভাগ সময় নিজে থেকেই সহনীয় অবস্থায় বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
সহনীয় অবস্থায় অধিকাংশ সময় ড্রাই আইয়ের জন্য ‘আর্টিফিশিয়াল টিয়ার’ দেওয়া হয়। মায়োপ্যাথিতে ডাবল ভিশন, অপটিক নার্ভে চাপ বা দৃষ্টি সমস্যায় জরুরিভাবে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দ্রুত চক্ষুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন।
স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। অনেক সময় ওষুধ ছাড়াও রেডিওথেরাপি এমনকি চক্ষুকোঠরে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
সাধারণত পুরুষের চেয়ে নারীদের ঝুঁকি ৫ গুণ বেশি। ধূমপায়ীদের ঝুঁকি দ্বিগুণ। ৩০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে আক্রান্ত হয়ে থাকে। পারিবারিক প্রভাব কাজ করে। রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিনে চিকিৎসাপ্রাপ্ত রোগীরা অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ।
অধ্যাপক ডা. মো. ছায়েদুল হক, চক্ষুবিশেষজ্ঞ ও সার্জন; উপাধ্যক্ষ, মার্কস মেডিক্যাল কলেজ, মিরপুর, ঢাকা