
ওজন কমানোর জন্য বারবার নতুন ডায়েট চার্ট মেনে আপনি কি ক্লান্ত? ডায়েট বন্ধ করলেই ওজন আবার আগের জায়গায় ফিরে আসছে, আর সেই সঙ্গে সঙ্গী হচ্ছে অপরাধবোধ। কঠোর ডায়েট কালচারের শৃঙ্খল ভেঙে নতুন এক জীবনের সন্ধান দিয়েছে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান—‘ইনটিউটিভ ইটিং’ বা ‘সহজাত খাদ্যাভ্যাস’। এটি মূলত শরীর ও মনের ভাষা বুঝে খাওয়ার এক বিজ্ঞানসম্মত জীবনশৈলী।
সহজ কথায়, ইনটিউটিভ ইটিং হলো নিজের শরীরের প্রাকৃতিক খিদে ও তৃপ্তির সংকেত চিনে খাবার খাওয়া। এটি কোনো নির্দিষ্ট খাবারকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ হিসেবে আলাদা করে না।
এখানে ডায়েট চার্টের কড়াকড়ি বা কোনো খাবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে না; বরং শরীরের অভ্যন্তরীণ সংকেত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কখন, কী এবং কতটুকু খাওয়া উচিত।
দ্রুত ওজন কমানোর কোনো মিশন এটি না, বরং খাবার ও নিজের শরীরের সঙ্গে একটি সুন্দর ও সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি।
১. ডায়েট মানসিকতা ত্যাগ করুন: সাময়িক ও কঠোর ডায়েট প্ল্যানের ওপর ভরসা করা বন্ধ করুন। ডায়েট মেনে চলতে না পারলে নিজেকে অপরাধী ভাবা ছেড়ে দিন।
২. ক্ষুধাকে সম্মান জানান: শরীর যখন শক্তির অভাব বোধ করে, তখন তাকে পর্যাপ্ত পুষ্টি দিন। অতিরিক্ত ক্ষুধা চেপে রাখলে পরে অনিয়ন্ত্রিত খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
৩. খাবারের সঙ্গে বন্ধুত্ব করুন: পছন্দের খাবার খাওয়া একদম বন্ধ করবেন না। কোনো খাবারকে ‘নিষিদ্ধ’ ভাবলেই সেটির প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়।
৪. ‘খাদ্য পুলিশ’কে থামান: মনে মনে যে নেতিবাচক কণ্ঠস্বরটি আপনাকে নির্দিষ্ট কিছু খাওয়ার জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করে, তার কথা শোনা বন্ধ করুন।
৫. খাবারের তৃপ্তি চিনুন: শুধু পেট ভরানো নয়, সুন্দর পরিবেশে পছন্দের খাবার উপভোগ করে খাওয়া শরীর ও মন উভয়কেই তৃপ্ত করে।
৬. তৃপ্তির অনুভূতি বুঝুন: খাওয়ার মাঝে একটু বিরতি দিয়ে নিজের শরীরকে জিজ্ঞাসা করুন, পেট কতটুকু ভরেছে? আরামদায়ক অনুভূতির পর খাওয়া থামান।
৭. আবেগকে খাবার দিয়ে ঢাকবেন না: দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব বা রাগ সামলাতে খাবারের আশ্রয় নেবেন না। আবেগের আসল কারণ খুঁজে সমাধান করুন।
৮. নিজের শরীরকে সম্মান করুন: সবার শারীরিক গঠন এক নয়। নিজের বংশগত ও স্বাভাবিক শারীরিক গঠন মেনে নিয়ে শরীরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন।
৯. আনন্দের জন্য শরীরচর্চা: শুধু ক্যালরি বার্ন করার জন্য নয়, শরীরকে চাঙা ও সতেজ রাখতে ব্যায়াম উপভোগ করুন।
১০. নমনীয় পুষ্টিবিধান: স্বাস্থ্য ও রুচির সঙ্গে মিল রেখে খাবার বেছে নিন। একদিন একটু অগোছালো খেলে স্বাস্থ্যের বড় ক্ষতি হয়ে যায় না, সার্বিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই আসল।
গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত ইনটিউটিভ ইটিং মেনে চলেন, তাঁদের জীবনে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসে:
মানসিক প্রশান্তি: খাবার নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অপরাধবোধ কমে।
আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: শরীরের গঠন নিয়ে হীনম্মন্যতা দূর হয় ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
শারীরিক উন্নতি: রক্তচাপ, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক মেজাজ ভালো রাখতে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
যাঁদের জন্য উপযোগী: যাঁরা বারবার ডায়েট করে ব্যর্থ হয়েছেন বা খাবারের পর অনুশোচনায় ভোগেন, তাঁদের জন্য এটি আদর্শ।
যাঁদের সতর্কতা প্রয়োজন: আগে থেকে গুরুতর ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’ থাকলে, নিউরোডাইভারজেন্ট (যেমন এডিএইচডি বা অটিজম) হলে, কিংবা শারীরিক কোনো জটিল রোগ থাকলে এই পদ্ধতি অনুসরণের আগে নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্যকর জীবন মানে নিখুঁত ডায়েট অনুসরণ নয়, বরং নিজের শরীরকে বোঝা ও ভালোবাসাই হলো আসল সুস্থতা।
ডা. আফলাতুন আকতার জাহান, জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগ স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা