উৎসব, অতিথি আপ্যায়ন, পারিবারিক আয়োজন আর ও ছুটির দিনগুলোর বিশেষ পদ মানেই যেন গরু অথবা খাসির মাংস। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে মানুষের জীবনযাপনের ধরন। এখন হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে বাড়তি কোলেস্টেরলের মতো রোগগুলোর বাড়বাড়ন্তি দেখা যাচ্ছে। ফলে লাল মাংস (রেড মিট) খাওয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—কোন বয়স পর্যন্ত এটি তুলনামূলক নিরাপদ, আর কোন বয়স থেকে ধীরে ধীরে এতে লাগাম টানা ভালো।
যেসব মাংসে মায়োগ্লোবিনের পরিমাণ বেশি থাকে ও কাঁচা অবস্থায় টকটকে লাল দেখায়, সেগুলোই হলো লাল মাংস। গরু, খাসি, ভেড়া কিংবা মহিষের মাংসকে সাধারণত রেড মিট বা লাল মাংস বলে।
পুষ্টিগুণের দিক থেকে লাল মাংস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ভিটামিন বি–১২সহ নানা প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান, যা শরীর গঠন, পেশি মজবুত ও রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লাল মাংসের মূল সমস্যা হলো এর অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট। এই সম্পৃক্ত চর্বি বেশি বেশি গ্রহণ করলে একটা বয়সের পর রক্তে খারাপ চর্বির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তখন হৃদ্রোগ ও মস্তিষ্কে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। লিভার বা যকৃতে চর্বি জমে বাড়তে পারে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরও বদলাতে থাকে। যে খাবার একসময় সহজেই হজম হতো, যে খাবার খেয়ে শরীরেও তেমন প্রভাব পড়ত না, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে একই খাবার কখনো কখনো রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। লাল মাংসের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমন। শিশু–কিশোর ও তরুণ বয়সে শরীরের বৃদ্ধি হয় দ্রুত। এ সময় পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন ও ভিটামিন বি–১২ শরীরের জন্য খুব প্রয়োজন।
লাল মাংস এসব পুষ্টির ভালো উৎস। তাই তরুণ বয়স পর্যন্ত (বিশেষ করে ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে) সুস্থ ও সক্রিয় জীবন যাপন করলে পরিমিত লাল মাংস তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ। এই বয়সে শরীরের বিপাকক্রিয়াও তুলনামূলক দ্রুত থাকে, ফলে অতিরিক্ত চর্বি সহজে জমে না। যাঁরা খেলাধুলা করেন, নিয়মিত পরিশ্রম করেন বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন, তাঁদের শরীর অতিরিক্ত ক্যালরি ও চর্বি সহজেই ঝরাতে পারেন।
তবে বয়স ৩০ পেরোলেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। হাঁটাচলা, খেলাধুলা কমে যায়, বাড়ে বসে বসে কাজের প্রবণতা। ওজন বাড়তে থাকে, শরীরে জমতে শুরু করে অতিরিক্ত চর্বি। এই বয়সে লাল মাংসের অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে। বাড়তে পারে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।
যাঁদের পরিবারের নিকট আত্মীয়ের মধ্যে হৃদ্রোগের ইতিহাস আছে, আরও আগে থেকেই তাঁদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বয়স ৪০–এর কোঠায় গেলে লাল মাংসে লাগাম টানা ভালো। তার মানে এই নয় যে লাল মাংস পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।
এই বয়সে খাওয়ার প্লেট থেকে লাল মাংসের পরিমাণ কমানো দরকার। বদলে মাছ, মুরগি, ডাল ও শাকসবজির দিকে ঝোঁক বাড়ানো ভালো। সপ্তাহে এক বা দুই দিন, অথবা মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণে চর্বি ছাড়া টাটকা মাংস খাওয়া তুলনামূলক নিরাপদ। তবে প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস এড়িয়ে চলা উচিত।
আর যাঁরা ইতিমধ্যেই হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, শরীরের ওজন অতিরিক্ত বা রক্তে উচ্চ মাত্রার খারাপ কোলেস্টেরল আছে, তাঁদের লাল মাংস গ্রহণে আরও সতর্ক হওয়াই ভালো। আর ৩০ বছরের পরও যাঁরা জানেন না, তাঁদের রক্তচাপ, রক্তের কোলেস্টেরল এবং সুগারের মাত্রা কত, তাঁদের উচিত এগুলো পরীক্ষা করে জেনে নেওয়া।
লাল মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে রান্নার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে পারেন। মাংস বড় টুকরা করে না কেটে, পাতলা স্লাইস করে কেটে নিন। অতিরিক্ত চর্বি ফেলে কম তেলে রান্না করুন। তাতে অতিরিক্ত চর্বিজনিত ঝুঁকি কমে। একবার রান্না করা মাংস বারবার গরম করে খাওয়া ঠিক নয়। এতে অক্সিডাইজড ফ্যাট ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
লাল মাংস পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়, তবে বয়স, শারীরিক সক্রিয়তা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে পরিমিত গ্রহণই সবচেয়ে নিরাপদ। সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।