জার্মান নিউরোসায়েন্টিস্টের মতে, সকালের যে পাঁচ অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে সারা দিন কেমন যাবে

আমরা বেশির ভাগ মানুষই ঘুম থেকে উঠে একাধিক ভুল কাজ করি। সে রকম পাঁচটি ভুল অভ্যাস নিয়েই এই আলোচনা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৪ শতাংশ মানুষ ঘুম থেকে ওঠার মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই ফোন চেক করে
সকালের অভ্যাস

অ্যালার্ম বাজল। চোখটা আধো খোলা রেখেই হাতটা চলে গেল বালিশের পাশে। স্মার্টফোনটা হাতে নিয়ে নোটিফিকেশন চেক করা শুরু করলেন। চেনা দৃশ্য, তা–ই না?

আপনার দিনটা কেমন যাবে, মেজাজ কেমন থাকবে কিংবা কাজে কতটা মনোযোগ দিতে পারবেন, সবই নির্ভর করে ঘুম ভাঙার পর প্রথম ৬০ থেকে ৯০ মিনিটের ওপর।

জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান কগনিটিভ অ্যান্ড ব্রেইন সায়েন্সের নিউরোসায়েন্টিস্ট প্যাট্রিসিয়া শ্মিট। তিনি দেখেছেন, বেশির ভাগ মানুষ সকালটা শুরু করে এমন কিছু ভুল অভ্যাস দিয়ে, যা অজান্তেই মস্তিষ্কের বারোটা বাজিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক গবেষণার ডেটা দেখলে চমকে যাবেন। সেখানে দেখা গেছে—

  • ৮৪ শতাংশ মানুষ ঘুম থেকে ওঠার মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই ফোন চেক করে।

  • শুধু তা–ই নয়, ৬৮ শতাংশ মানুষ টয়লেটে বসেও ফোন চাপে।

  • ৫৬ শতাংশ মানুষ রাতের খাবার খাওয়ার সময়ও ফোন হাতছাড়া করে না।

  • এমনকি ৪৬ শতাংশ মানুষ স্বীকারই করেছে যে তারা ফোনে আসক্ত।

এই যে সকালে উঠেই ভুল পথে যাত্রা, এর ফলে সারা দিন আপনি ক্লান্ত থাকেন, মনোযোগ দিতে পারেন না। প্যাট্রিসিয়া নিজেও একসময় এসব ভুল করতেন। কিন্তু নিউরোসায়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বোঝার পর তিনি ৫টি অভ্যাস পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন। সেসব অভ্যাসই আমরা জানব।

১. চোখ খুলেই ফোনের স্ক্রিনে তাকানো

আগেই বলেছি, ৮৪ শতাংশ মানুষ ঘুম থেকে ওঠার ১০ মিনিটের মধ্যেই এটা করে। এটাকে মহামারি বললে ভুল হবে না। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম ৩০-৪৫ মিনিট আমাদের শরীরে কর্টিসোল অ্যাওয়েকেনিং রেসপন্স ঘটে। এটি হলো কর্টিসোল হরমোনের একটি স্বাভাবিক বৃদ্ধি, যা আপনাকে সারা দিনের জন্য প্রস্তুত করে।

কিন্তু আপনি যখনই ফোনের স্ক্রিনে তাকান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অফিসের মেইল বা নেতিবাচক খবর দেখেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় চাপে পড়ে যায়। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া তখন বাধাগ্রস্ত হয়।

ফলে সারা দিন একটা অস্থিরতা কাজ করে। ডোপামিনের ভুল ব্যবহার আপনার মেজাজ খারাপ করে দিতে পারে। তাই ঘুম ভাঙার পর অন্তত ৪৫ মিনিট ফোন থেকে দূরে থাকুন। আপনার শরীর ও মস্তিষ্ককে প্রাকৃতিকভাবে দিনটার জন্য তৈরি হতে দিন।

ঘুম থেকে ওঠার ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রাকৃতিক আলোতে যান

২. সকালের আলো গায়ে না মাখা

আমরা এখন ঘরকুনো হয়ে গেছি। অফিস থেকে বাসা, আবার বাসা থেকে অফিসের মধ্যেই আমাদের সবকিছু। প্রাকৃতিক আলো প্রায় গায়েই লাগে না। এখানেই মূল সমস্যা। আমাদের দেহের ভেতর একটা ঘড়ি আছে, একে বলে সার্কেডিয়ান রিদম। এই ঘড়ি চলে আলোর ইশারায়।

সকালে চোখের রেটিনায় আলো পড়লে মস্তিষ্কের সুপ্রাকায়াজমেটিক নিউক্লিয়াস নামে একটি অংশ সজাগ হয়ে ওঠে। এটি কর্টিসোল বাড়াতে সাহায্য করে এবং মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া সকালের আলো মস্তিষ্কে সেরোটোনিন তৈরি করে, যা আপনার মন ভালো রাখে। সকালে আলো না পেলে সারা দিন ঝিমুনি আসবে এবং রাতে ভালো ঘুম হবে না।

তাহলে সমাধান কী? ঘুম থেকে ওঠার ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রাকৃতিক আলোতে যান। অন্তত ১০ মিনিট রোদে থাকুন। সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানোর দরকার নেই, জানালা খুলে বা বারান্দায় দাঁড়ালেই হবে। বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলে খুব উজ্জ্বল বাতির সামনে কিছুক্ষণ থাকতে পারেন।

৩. ঘুম থেকেই উঠেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া

অনেকে ভাবেন, সকালে উঠে সতেজ মনে কঠিন কাজটা সেরে ফেলবেন। তাই বিছানা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়েন। ঘুম থেকে ওঠার পর আমাদের মস্তিষ্ক আড়ষ্টতায় ভোগে। তখন চিন্তা করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধীর থাকে। সময়টা সৃজনশীল কাজের জন্য ভালো হতে পারে, কিন্তু গভীর মনোযোগের কাজের জন্য মোটেও জুতসই নয়।

মস্তিষ্কের পুরোপুরি সজাগ হতে এবং কর্টিসোল রেসপন্স ঠিকঠাক কাজ করতে কিছুটা সময় লাগে। গাড়ির ইঞ্জিন যেমন স্টার্ট দেওয়ার পরপরই ফুল স্পিডে চালানো ঠিক নয়, মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও তা–ই। তাই ঘুম থেকে উঠেই একটু সময় নিন। একটু হাঁটাহাঁটি করুন, গায়ে আলো–বাতাস লাগান, পানি খান। কঠিন কাজগুলো এরপর শুরু করুন।

৪. চিনিযুক্ত নাশতা দিয়ে দিন শুরু করা

পাউরুটি-জ্যাম বা চিনি দেওয়া চা আমাদের অনেকেরই প্রিয় খাবার ও পানীয়। সকালে খালি পেটে বেশি চিনি বা শর্করা খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হুট করে বেড়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই সেটা আবার ধপাস করে নিচে নামে।

গ্লুকোজের এই ওঠা–নামা মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। কারণ, মস্তিষ্ক চলে গ্লুকোজের ওপর। গ্লুকোজ কমে গেলে মনোযোগ কমে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং ব্রেইন ফগ তৈরি হয়।

ব্রেইন ফগ কোনো রোগ নয়। এটা মূলত একটা অনুভূতির মতো। সব আছে, কিন্তু পরিষ্কার নয়। ব্রেইন ফগ হলে মানুষ সহজ জিনিসও গুলিয়ে ফেলে। মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। আগে যা খুব সহজে মনে থাকত, তা মনে পড়তে চায় না।

ঘুম কম হলে বা ঘুম ঠিক না হলেও এমনটা হতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, দীর্ঘদিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা বা ঠিকমতো পানি না খাওয়ার কারণেও এমনটা হতে পারে। তাই প্রোটিন বা আমিষের দিকে নজর দিন। সকালের নাশতায় ২৫-৩৫ গ্রাম প্রোটিন খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকবে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ঠিক থাকবে।

ঘুম থেকে উঠেই এক গ্লাস পানি খান

৫. পানি না খাওয়া

রাতে ঘুমালে দীর্ঘ সময় আমাদের শরীর পানি পায় না। অথচ নিশ্বাস ও ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। ফলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময় আমরা কিছুটা পানিশূন্য বা ডিহাইড্রেটেড থাকি। আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরের বড় অংশই পানি। সকালে এই ঘাটতি পূরণ না করলে মস্তিষ্কের কাজ করার গতি কমে যায়, মেজাজ খারাপ থাকে এবং মাথাব্যথা হতে পারে।

ডিহাইড্রেশন কর্টিসোল লেভেল বাড়িয়ে দেয়। ফলে সকালের প্রশান্তি নষ্ট হয়। তাই ঘুম থেকে উঠেই এক গ্লাস পানি খান। বিছানার পাশেই পানির বোতল রাখুন, যাতে চোখ মেললেই মনে পড়ে।

এই ৫টি অভ্যাস হয়তো খুব ছোট মনে হচ্ছে। কিন্তু এসব দিনের পর দিন আপনার মস্তিষ্কের ক্ষতি করে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ৫৩ শতাংশ মানুষ ২৪ ঘণ্টার বেশি ফোন ছাড়া থাকতেই পারে না। এই আসক্তি ও ভুল রুটিন থেকে বেরিয়ে আসুন। ছোট ছোট এসব পরিবর্তনই আপনার দিনটাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।

সূত্র: মিডিয়াম