হৃদ্রোগ মানেই কিন্তু চিরতরে শয্যাশায়ী বা শরীর অকেজো হয়ে পড়া নয়। সঠিক নিয়ম ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে একজন হৃদ্রোগীও সাধারণ মানুষের মতো সক্রিয় জীবন যাপন করতে পারেন। হার্টে রিং পরার পরও ব্যায়াম করা নিরাপদ। এটি বরং হৃদ্যন্ত্রের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমিয়ে দেয় প্রায় ২২ শতাংশ।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর প্রথম কয়েক দিন কেবল শরীরকে সচল করার দিকে নজর দিন।
হালকা কাজ: বাড়ির ভেতর অল্প হাঁটাচলা বা সহজ গৃহস্থালি কাজ দিয়ে শুরু করুন।
সিঁড়ি ব্যবহার: খুব ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা যেতে পারে। হাঁপিয়ে উঠলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্রাম নিতে হবে। তবে চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া ঘর মোছা, ভ্যাকুয়াম বা লন পরিষ্কারের মতো ভারী কাজ থেকে বিরত থাকুন।
হৃদ্রোগীদের জন্য হাঁটা সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম। রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে এটি ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
সময় ও গতি: দিনের শুরুতে ৫ থেকে ১০ মিনিট সমতল জায়গায় আরামদায়ক গতিতে হাঁটুন। কয়েক সপ্তাহ পর সময় বাড়িয়ে ৩০ মিনিটে নিয়ে যান।
ওয়ার্মআপ ও কুলডাউন: হাঁটার শুরুতে পাঁচ মিনিট শরীর গরম করে নিন এবং শেষে পাঁচ মিনিট ধীরে হেঁটে শরীর শীতল করুন।
অনেকে ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো দৌড়ঝাঁপের খেলায় ফিরতে চান। এ ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নিয়ম প্রযোজ্য।
রিং বা স্টেন্ট থাকলে: প্রথম কয়েক সপ্তাহ ভারী পরিশ্রম পুরোপুরি নিষেধ। প্রতিযোগিতামূলক খেলায় হঠাৎ দৌড়ানো বা ধাক্কা লাগার ঝুঁকি থাকে, যা হৃদ্যন্ত্রে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই মাঠে নামার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ইকো ও ইটিটি পরীক্ষা করে হার্টের সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
পেসমেকার থাকলে: এটি একটি সূক্ষ্ম যন্ত্র। ফুটবল বা ফিল্ডিংয়ের সময় সরাসরি ডিভাইসের ওপর আঘাত লাগলে যন্ত্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই কন্টাক্ট স্পোর্টস বা ধাক্কা লাগার আশঙ্কা আছে, এমন খেলা এড়িয়ে চলাই ভালো।
পেশির শক্তি বাড়াতে হালকা ওজন তোলা যেতে পারে, তবে কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। যেমন:
শ্বাসপ্রশ্বাস: ওজন তোলার সময় কখনোই দম বন্ধ করে রাখবেন না, এটি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।
ওজন: শুরুতে বাড়িতে থাকা এক লিটারের পানির বোতল দিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারেন। ১০ বার অনায়াসে তোলা যায়, এমন ওজন দিয়ে শুরু করুন।
আবহাওয়া হৃদ্রোগীদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
তাপমাত্রা যদি ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি বা ১২ ডিগ্রির নিচে হয়, তবে বাইরে ব্যায়াম করবেন না।
অতিরিক্ত শীত বা গরমে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হার্টের ওপর চাপ বাড়ায়। এ ছাড়া ‘হট ইয়োগা’ হৃদ্রোগীদের জন্য একেবারেই অনুচিত।
ব্যায়াম বা খেলাধুলার সময় নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ থেমে যান এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
বুকে ব্যথা, চাপ বা ভারী বোধ করা।
ব্যথা চোয়াল, ঘাড় বা বাঁ হাতে ছড়িয়ে পড়া।
অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট বা বুক ধড়ফড়।
হঠাৎ মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা চরম ক্লান্তি।
ওষুধে অবহেলা নয়: চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত সেবন হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা ঠিক রাখে।
রুটিন মেনে চলা: প্রতিদিন একই সময়ে ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন, এতে এটি অভ্যাসে পরিণত হবে।
নিরাপদ দূরত্ব: শুরুতে পরিচিত পথে বা বাড়ির আশপাশে হাঁটুন। সঙ্গে মোবাইল বা জরুরি ওষুধ রাখুন।
মনোবল: কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রামে যোগ দিন। এটি আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
ধীরে শুরু: হুট করে পূর্ণ শক্তিতে ফিরতে না চেয়ে ধীরে ধীরে শারীরিক সক্ষমতা বাড়ান।
হৃৎপিণ্ডের রোগে সুস্থ থাকার জন্য মনের সাহস ও আত্মবিশ্বাস খুব দরকার। নিজেকে চাপমুক্ত রাখুন এবং চিকিৎসকের গাইডলাইন মেনে সক্রিয় থাকুন। সঠিক ব্যবস্থাপনায় আপনার হৃৎপিণ্ড তাহলে আবারও কর্মক্ষম হয়ে উঠবে।