‘জামাটা তো নতুন কেনা। ধুতে হবে কেন?’ সাধারণত এমনটিই আমরা ভাবি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝকঝকে নতুন কাপড়টিতেই লুকিয়ে থাকতে পারে জীবাণু এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন কাপড় পরার আগে ধোয়া উচিত। প্যাকেট থেকে সদ্য বের করা একদম নতুন পোশাকেও লেগে থাকতে পারে রোগজীবাণু, ময়লা কিংবা ক্ষতিকর রাসায়নিক।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কর্নেল কলেজের ফাইবার সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাপারেল ডিজাইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লারিসা শেফার্ড বলেন, ‘কাপড় তৈরি করার প্রক্রিয়া অনেক ধাপে সম্পন্ন হয়। অনেক সময় এই প্রক্রিয়ার একেকটি ধাপ হয় একেকটি দেশে। এসব কাপড় অনেক মানুষ স্পর্শ করে, গুদামে রাখা হয়, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পরিবহন করা হয়। এ ছাড়া কাপড় তৈরির সময় ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক ও রং কাপড়ে লেগে থাকতে পারে।’
আর শুধু রাসায়নিকই নয়, ‘দ্য জার্ম গাই’ নামে পরিচিত কানাডার টরন্টোর জীবাণুবিদ জেসন টেট্রো বলেন, ‘নতুন কাপড় অনেক সময় খুবই নোংরা থাকে। কাপড় বিভিন্ন পরিবেশের মধ্য দিয়ে যায়, আর সে সময় এতে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস লেগে যেতে পারে।’
নতুন কাপড়ে অনেক ধরনের রাসায়নিক থাকতে পারে। এর মধ্যে অতিরিক্ত রং (ডাই) এবং ফরমালডিহাইড থাকতে পারে, যা কাপড় কুঁচকে যাওয়া ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়।
শেফার্ড বলেন, ‘আমাদের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার কারণে কাপড়ে ঠিক কী কী রাসায়নিক আছে, তা জানা কঠিন।’
আপনার মনে হতে পারে, দামি বা ব্র্যান্ডেড কাপড় কেনা কম ঝুঁকিপূর্ণ। এতে কিছুটা সত্যতা আছে। কিন্তু এতেও নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বেশি টাকা খরচ করলেই যে কাপড় একদম পরিষ্কার ও ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
শেফার্ড বলেন, ‘অনেক সময় দামি বা ডিজাইনার কাপড় ভালো মানের হয়; কাপড় মজবুত থাকে, চকচকে হয় ইত্যাদি। কিন্তু কাপড় তৈরির সময় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, তেল, ফিনিশিং প্রক্রিয়া আর সংরক্ষণের বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, কাপড় তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটাই অনেক সময় ‘নোংরা’ হয়। তাই কাপড় সস্তা হোক বা দামি, ব্যবহারের আগে ধুয়ে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। বিশেষ করে যাঁদের ত্বক সংবেদনশীল, তাঁদের জন্য এটা আরও বেশি জরুরি।
না। এমন কোনো কথা নেই। অর্গানিক কাপড় কিনলেই যে তাতে কোনো রাসায়নিক থাকবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। ২০২২ সালে স্পেনের অর্গানিক ও নন-অর্গানিক তুলার তৈরি শিশুদের ও নারীদের মাতৃত্বকালীন পোশাক নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। দুই ধরনের কাপড়েই ফরমালডিহাইড পাওয়া গিয়েছিল। যেসব কাপড় ধুয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেসবে ফরমালডিহাইড আর পাওয়া যায়নি।
এর অর্থ পরিষ্কার। কাপড় অর্গানিক হোক বা নামী ব্র্যান্ডের হোক, নতুন কাপড় পরার আগে অবশ্যই ধুয়ে নেওয়া উচিত।
জেসন টেট্রোর মতে, নতুন কাপড়ে সবচেয়ে বেশি যে ব্যাকটেরিয়াগুলো পাওয়া যায়, তার মধ্যে আছে স্ট্যাফাইলোকক্কাস। এটি সাধারণত মানুষের ত্বকে থাকে। এ ছাড়া ই-কোলাইও থাকতে পারে। হাত ভালোভাবে না ধুলে হাতের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া কাপড়ে লেগে থাকতে পারে নোরোভাইরাস। এই ভাইরাস পেটের অসুখ সৃষ্টি করে এবং অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ থেকে ছড়াতে পারে।
কাপড় তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় নোংরা হাত ও বিভিন্ন পৃষ্ঠের সংস্পর্শে এসে এসব জীবাণু কাপড়ে লেগে যায়। কাপড় বানাতে হলে মানুষের হাতের স্পর্শ লাগবেই।
এ কারণেই কাপড় ধোয়া ছাড়া সরাসরি পরে নেওয়া একটি বড় ভুল। নতুন কাপড় পরার আগে ধুয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
নতুন কাপড়ে থাকা জীবাণু স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। যদি কাপড়ে স্ট্যাফাইলোকক্কাস থাকে এবং তা আপনার ত্বকের সংস্পর্শে আসে, তাহলে কঠিন চর্মরোগ বা ত্বকের সংক্রমণ হতে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাঁদের জন্য এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ছাড়া আপনার আগে যে ব্যক্তি ওই কাপড় ট্রায়াল দিয়েছেন বা দোকানে যাঁরা কাপড়টি ধরেছেন, তাঁদের কাছ থেকেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। যদি তাঁরা কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত থাকেন, তাহলে তাঁদের শরীরের জীবাণু কাপড়ে লেগে যাবে।
সর্দি, ফ্লু, কোভিড এবং শ্বাসযন্ত্রের অন্যান্য ভাইরাস কাপড়ের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে এবং পরে তা আপনার শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। কাপড় তৈরির সময় ব্যবহৃত রাসায়নিকগুলোও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ফরমালডিহাইড ত্বক, চোখ ও নাকের ভেতরের অংশে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। শুধু তা–ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সির (ইপিএ) মতে, এটি একটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক।
তবে ভালো খবর হলো, কাপড় একবার ভালোভাবে ধুয়ে নিলেই এই ক্ষতিকর রাসায়নিক অনেকটাই দূর হয়ে যায়। এসব কারণেই নতুন কাপড় পরার আগে ধুয়ে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন কাপড় কিছুদিন আলাদা করে রেখে দিলেই ধোয়া বাদ দেওয়া নিরাপদ নয়। কাপড়ে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক অনেক দিন থেকে যায়। কাপড় তৈরিতে ব্যবহৃত ভিওসি, অর্থাৎ কার্বনভিত্তিক রাসায়নিকগুলোকে ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ বলা হয়। এসব সহজে দূর হয় না। তবে জীবাণুগুলোর জীবনকাল একটু আলাদা।
টেট্রো বলেন, ‘কাপড় আলমারিতে রেখে দিলে কিছু ভাইরাস কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ব্যাকটেরিয়া মাসের পর মাস টিকে থাকতে পারে।’
তাই নতুন কাপড় সস্তা হোক বা দামি, এখনই পরুন বা পরে, না ধুয়ে পরা উচিত নয়।
নতুন কাপড় অবশ্যই কাপড়ের ট্যাগে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ধুতে হবে। সম্ভব হলে মৃদু লন্ড্রি ডিটারজেন্ট ব্যবহার করুন। এর সঙ্গে জীবাণুনাশক উপাদান, যেমন এনজাইম বা ডিসইনফেকট্যান্ট থাকলে আরও ভালো।
রং অনুযায়ী কাপড় আলাদা করে ধোয়া জরুরি। কারণ, নতুন কাপড়ে অতিরিক্ত রং থাকতে পারে। ধোয়ার সময় সেই রং ছড়িয়ে অন্য কাপড়ে লেগে যেতে পারে। যদি দেখেন নতুন কাপড় ধোয়ার সময় রং ছাড়ছে, তাহলে পরার আগে আরেকবার ধুয়ে নেওয়া ভালো। এতে আপনার ত্বকে এবং অন্য কাপড়ে রং লেগে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।
কাপড়ের কোনো ক্ষতি না হলে অবশ্যই ড্রায়ার ব্যবহার করবেন। ড্রায়ার জীবাণু ধ্বংস করতে খুবই কার্যকর।
যদি নতুন কেনা কাপড়ে ধোঁয়ার গন্ধ, স্যাঁতসেঁতে বা পচা গন্ধ থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সেটি ভালো পরিবেশে সংরক্ষণ বা পরিবহন করা হয়নি। এমন হলে সরাসরি কাপড়টি ওয়াশিং মেশিনে ধুয়ে নিন।
কিন্তু যদি কাপড়ে তীব্র রাসায়নিক গন্ধ থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও চিন্তার। শেফার্ড বলেন, ‘যদি কাপড়টি প্লাস্টিক ব্যাগে মোড়ানো না থাকে এবং রাসায়নিকের তীব্র গন্ধ আসে, তাহলে সেটি অবশ্যই দুশ্চিন্তার বিষয়। আমি হলে কাপড়টি অবশ্যই ফেরত দিয়ে আসব।’
শেফার্ড আরও বলেন, ‘কিছু ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ড আছে, যেসব এড়িয়ে চলাই ভালো। এর মধ্যে কিছু ব্র্যান্ডের কাপড়ে ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিকের মাত্রা বেশি থাকার অভিযোগ আছে।’
শেফার্ড যদিও নির্দিষ্ট করে কোনো নাম বলেননি, তবে বিভিন্ন সূত্রে ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘শিন’–এর দিকে আঙুল তুলেছেন। এমনকি ‘গ্রিনপিস জার্মানি’ তাদের কাপড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ কোরিয়া শিন, টেমু ও আলিএক্সপ্রেসকে নিরাপত্তা মান পূরণে ব্যর্থ হওয়ার জন্য চিহ্নিত করেছে।
শেষ কথা হলো, কাপড় কেনার সময় সচেতন থাকুন। পরার আগে অবশ্যই ধুয়ে নিন।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট