সাদামাটা কিছু উপসর্গ নিয়ে গত আগস্টে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন সালেহ আহমেদ। ধরা পড়ে কিডনির ক্যানসার। জানা গেল, নীরবে–নিভৃতে দেহে ছড়িয়েও পড়েছে ক্যানসার। চতুর্থ স্টেজ। চিকিৎসা শুরু করতে করতেই একসময় স্বাভাবিক হাঁটাচলার ক্ষমতা হারালেন। দেখা দিল নানান জটিলতা। ১৮ জুন বিশ্ব কিডনি ক্যানসার দিবস। দিবসটি সামনে রেখে সালেহ আহমেদের জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন রাফিয়া আলম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার পর পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছিলেন সালেহ আহমেদ। স্ত্রী নুসরাত জাহান এবং একমাত্র কন্যাকে নিয়ে সালেহ আহমেদের ছিমছাম সংসার। ভালোই চলছিল সব। এর মধ্যেই গত আগস্টে বুকের বাঁ পাশে নিচের অংশে মাঝেমধ্যে ব্যথা হতো। তাই একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেন। পেটের আলট্রাসনোগ্রামে ধরা পড়ল ডান কিডনির টিউমার। তাঁর বয়স তখন ৪৬ বছর। পরে সিটি স্ক্যানে দেখা গেল, মেরুদণ্ডেও আছে আরেকটা টিউমার।
ইউরোলজিস্ট, অনকোলজিস্ট, ইউরোঅনকোলজিস্ট, নিউরোসার্জন—বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে সব মিলিয়ে ১৫ জন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন সালেহ আহমেদ। গঠিত হয়েছে মেডিক্যাল বোর্ড। করা হয়েছে এক্স-রে, এমআরআই, পেট সিটি স্ক্যান আর নানা রকম রক্ত পরীক্ষা। তবে বায়োপসি এবং অস্ত্রোপচারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান সালেহ আহমেদ।
শেষে স্ত্রী এবং চার বছর বয়সী কন্যাকে নিয়ে ছুটলেন চীন। সেখানেও চলল পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ক্যানসারের উপস্থিতি সম্পর্কে সেখানকার চিকিৎসকেরাও নিশ্চিত। কিন্তু মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের ব্যাপারে তাঁরাও ভরসা দিতে পারলেন না। জানালেন, এ অস্ত্রোপচারে যেকোনো কিছুই ঘটে যেতে পারে। আর সেখানে থাকতে হবে আরও ছয় সপ্তাহ। এর মধ্যে চীনে যে দুই সপ্তাহ ছিলেন, তাতে সালেহ আহমেদ এবং তাঁর কন্যা স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। কষ্ট করে থাকলেও সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। তাই দেশেই ফিরে এলেন।
আর দেশে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে এরই মধ্যে শল্যচিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে রাখলেন তাঁর বন্ধুরা।
ডিসেম্বরের শেষার্ধে দেশে ফিরলেন সালেহ আহমেদ। সেই মাসের শুরু থেকেই হাঁটার গতি কমতে থাকল। কিন্তু দেশেও অস্ত্রোপচার বিষয়ে ভরসা দিতে পারছিলেন না কোনো চিকিৎসক। তবে যত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হলো, তাঁদের মধ্যে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের অনকোলজিস্ট ডা. অরুনাংশু দাসকেই তাঁর কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে হলো। তিনি শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা করাতে হবে দ্রুত। তাই তাঁর কাছেই চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সালেহ আহমেদ।
শেষে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে অ্যানজিওগ্রাম করা হলো। ৪০-৪৫ মিনিট ধরে চলা সেই পরীক্ষার সময় সালেহ আহমেদকেও মনিটরে দেখানো হলো, রক্তনালির অবস্থা কতটা জটিল। তাই টিউমার অপসারণ করতে গেলে স্থায়ীভাবে হাঁটাচলার শক্তি হারানোর ঝুঁকিটা প্রবল।
এই ঝুঁকি এড়াতে সেখানে কর্মরত ভারতীয় চিকিৎসক ডা. অমিত কাপুর তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ফিক্সেশন করে দিলেন। মেরুদণ্ডে বারোটা স্ক্রু লাগাতে হলো। অস্ত্রোপচার হলো এ বছরের ১৮ জানুয়ারি। পরদিন থেকেই উঠে দাঁড়াতে পারলেন সালেহ আহমেদ। পরের দিন কিছুটা সহযোগিতা নিয়ে হাঁটতেও পারলেন।
কিন্তু অস্ত্রোপচারের সাত–আট দিন পর থেকে আর উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না। ১০ দিনের মধ্যে প্রস্রাব-পায়খানা আটকে গেল। মেরুদণ্ডের টিউমারের চাপেই এমন সব স্নায়বিক জটিলতা।
এভাবে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণত তা আর সারে না। তাই তাঁকে বলা হলো, ক্যাথেটার আজীবনের সঙ্গী হয়ে গেল। তবু মনের জোর হারাননি সালেহ আহমেদ। শুরু থেকেই তিনি সব কঠিন সত্য মেনে নিয়ে ইতিবাচক থেকেছেন। বিশ্বাস রেখেছেন, সেরে উঠবেন। অস্ত্রোপচারের দুই সপ্তাহের মধ্যে রেডিওথেরাপি নেওয়া যাবে না। তাই আবার অপেক্ষা।
ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ডা. অরুনাংশু দাসের তত্ত্বাবধানে শুরু হলো ক্যানসারের মূল চিকিৎসা। ১০টি রেডিওথেরাপির পর দেওয়া হলো টার্গেটেড থেরাপি। ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হলো চারটি।
রেডিওথেরাপি চলার সময় পায়ের আঙুল নাড়ানোর ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন সালেহ আহমেদ। তাঁকে দোতলা বাসা থেকে নিচে নামাতে তিনজনের সহযোগিতা প্রয়োজন হতো। লিফট না থাকায় এভাবেই চিকিৎসার জন্য বের হতে হয়েছে। বলছিলেন, ‘তখন আমি ছিলাম একটা ব্যাগের মতো। যেখানে রেখে দেওয়া হবে, সেখানেই পড়ে থাকব। চলাফেরার জন্য তখন অন্তত দুজনের সহায়তা লাগত।’
ইমিউনোথেরাপি শুরুর আগের দিন পায়ের আঙুল নাড়াতে পারলেন। চিকিৎসক জানালেন, এটি খুব ভালো লক্ষণ। শুরু হলো ফিজিওথেরাপি। সেটা ছিল মার্চ মাস। ধীরে ধীরে শারীরিক উন্নতি হতে থাকে। মে মাসে পেট সিটি স্ক্যান করে দেখা গেল, মেরুদণ্ডের টিউমারটি আর নেই। চিকিৎসায় দারুণ কাজ হয়েছে। কিডনির টিউমারও ছোট হয়েছে। আরও জানা গেল, তাঁর শরীরে ক্যানসার এখন আর সক্রিয় নেই।
সালেহ আহমেদ বলেন, ‘ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধটা একা লড়া যায় না। আর্থিক ও মানসিক সাপোর্ট খুব প্রয়োজন হয়। ভাইবোন, দুলাভাইসহ শ্বশুরবাড়ির স্বজনেরা সবাই সব সময় পাশে ছিলেন। আর সব সময় হাসিমুখে চিকিৎসার নির্দেশনা নিয়ে পাশে ছিলেন ডা. অরুনাংশু দাস।’
মে মাস থেকে ইমিউনোথেরাপির ডোজ কমানো হলো। ঈদুল আজহার আগে ক্যাথেটার খুলে ফেলা সম্ভব হলো। উঠেও দাঁড়ালেন নিজের পায়ে। ডা. অরুনাংশু দাসও সেদিন উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে হাত মেলালেন।
কিছুটা সহায়তা নিয়ে এখন নিজেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে পারেন সালেহ আহমেদ। আরও একটি ইমিউনোথেরাপি নিয়েছেন গেল রোববার। এখনো বেশ কিছু কাজ বাকি। কিডনির টিউমারটি অপসারণের জন্য ইউরোঅনকোলজিস্টের কাছে যেতে হবে। পুরো লড়াইয়ে সার্বক্ষণিক সঙ্গী তাঁর স্ত্রী। ব্যথায় কাতর স্বামীর পাশে কত যে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন, হিসাব নেই।
সব কষ্ট পেরিয়ে, ক্যানসারকে পরাজিত করে সুস্থতার পথে এখন সালেহ আহমেদ। খুব কম মানুষই হাসিমুখে এমন কঠিন লড়াই লড়তে পারেন। চিকিৎসকেরাও বিস্মিত, সত্যিই অবিশ্বাস্য তাঁর এই সেরে ওঠা।