৫০ বছরের পর থেকে প্রস্টেট গ্রন্থি দ্রুত বড় হতে শুরু করে
৫০ বছরের পর থেকে প্রস্টেট গ্রন্থি দ্রুত বড় হতে শুরু করে

প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা পুরুষের জন্য যখন ভয়ের কারণ

প্রোস্টেট ছোট সুপারির মতো একটি গ্রন্থি, যা পুরুষের মূত্রথলির ঠিক নিচে থাকে। বীর্য তৈরিতে সহায়ক একটি আঠালো তরল পদার্থ তৈরি করা এই গ্রন্থির মূল কাজ। ৫০ বছরের পর থেকে প্রস্টেট গ্রন্থি দ্রুত বড় হতে শুরু করে।

চিকিত্সাবিজ্ঞানে একে বলা হয় বিনাইন এনলার্জমেন্ট অব প্রোস্টেট (বিইপি)। এই গ্রন্থি বড় হতে থাকলে অনেকেরই প্রস্রাবের সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি পুরুষের এতই পরিচিত একটি সমস্যা যে অনেকে একে বয়সজনিত একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে থাকেন। প্রোস্টেট বড় হওয়া বা বিইপি মানেই কিন্তু প্রোস্টেট ক্যানসার না, অনেকে বিষয়টি না বুঝে গুলিয়ে ফেলেন।

প্রোস্টেট সমস্যার লক্ষণ

মূত্রনালিটি যেহেতু প্রোস্টেট গ্রন্থির ভেতর দিয়ে গেছে, তাই এটি বড় হলে প্রস্রাবের নানা সমস্যা হতে পারে। যেমন—

  • বারবার প্রস্রাব হওয়া (সাধারণত দিনে ১০ বারের বেশি)

  • প্রস্রাবের চাপ এলে ধরে রাখতে না পারা

  • অনেক সময় টয়লেটে যাওয়ার আগেই প্রস্রাব হয়ে যাওয়া

  • রাতে ঘুম থেকে উঠে প্রস্রাব করতে হয়

  • প্রস্রাব শুরু করতে সময় লাগে

  • প্রস্রাবের গতি কমে যায়

  • থেমে থেমে প্রস্রাব

  • প্রস্রাব করতে অনেক সময় লাগা

  • প্রস্রাব শেষের দিকে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়তে থাকা

  • প্রস্রাব করার পর মনে হয় প্রস্রাব থলিতে খানিকটা থেকে যাচ্ছে

যেসব সমস্যা দেখা দেবে

এ সমস্যা বাড়তে বাড়তে একসময় প্রস্রাব হঠাৎ সম্পূর্ণ আটকে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যাকে বলে অ্যাকিউটর রিটেনশন।

দীর্ঘদিন প্রস্রাব মূত্রথলিতে জমে থাকতে থাকতে কিডনি ফুলে গিয়ে হাইড্রোনেফ্রোসিস এবং এ থেকে কিডনি ফেইলিওর হতে পারে।

রোগের শুরুতেই সঠিক চিকিত্সা নিলে এসব জটিলতা পরিহার করা যায়। প্রোস্টেট বড় হলেই যে সব সময় রোগের সব লক্ষণ থাকবে, তা–ও কিন্তু নয়।

প্রোস্টেট ক্যানসার হলেও একই ধরনের লক্ষণ থাকতে পারে, মেরুদণ্ডের হাড়ে ব্যথা ক্যানসারের আরেকটি লক্ষণ।

রোগ নির্ণয়ে কী করতে হবে

অনেক সময় অভিজ্ঞ চিকিত্সক রোগীর মলদ্বার দিয়ে আঙুলের সাহায্যে প্রোস্টেট কতটুকু বড় হয়েছে, ইনফেকশন অথবা ক্যানসারের আশঙ্কা আছে কি না, তা বুঝতে পারেন।

কিডনি, মূত্রথলি ও প্রোস্টেটের আলট্রাসনোগ্রাম করে প্রোস্টেট গ্রন্থি কতটা বড় হয়েছে, প্রস্রাব কতটুকু মূত্রথলিতে থেকে যাচ্ছে এবং এ জন্য প্রেশার পড়ে কিডনি ফুলে গেছে কি না, তা বোঝা যায়।

ইউরোফ্লোমেট্রি টেস্টের মাধ্যমে প্রস্রাবের গতি কতটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, জানা যায়। প্রস্রাবের ইনফেকশন হলে ঘন ঘন প্রস্রাব ও জ্বালাপোড়া থাকে, তাই ইউরিন রুটিন টেস্ট ও ক্ষেত্রবিশেষে কালচার/সেনসিটিভিটি করতে হয়।

ক্যানসার থেকে পার্থক্য করার জন্য রক্তের পিএসএ করা প্রয়োজন। প্রোস্টেট গ্রন্থির প্রদাহে, কিন্তু এই পিএসএ সাময়িকভাবে বাড়তে পারে।

পিএসএ স্থায়ীভাবে বেশি থাকলে সুচের মাধ্যমে মলদ্বার দিয়ে আলট্রাসনোগ্রাম গাইডেড প্রোস্টেট গ্রন্থির বায়োপসি করে ক্যানসার নিশ্চিত করা হয়।

চিকিত্সা কী

প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে গেলেই যে ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা দিতে হবে, তা নয়। চিকিত্সা মূলত নির্ভর করে রোগের লক্ষণ কত প্রকট, তার ওপর। যদি লক্ষণ স্কোর কম হয়, প্রস্রাবের সর্বোচ্চ গতি সেকেন্ডে ১৫ মিলিলিটারের বেশি হয় এবং মূত্রথলিতে ৫০ মিলিগ্রামের কম প্রস্রাব জমা থাকে, তাহলে ওষুধের প্রয়োজন নেই।

এ ক্ষেত্রে চা-কফি ও পানি হিসাব করে খাওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়। আজকাল প্রায় ৯০ শতাংশ বিইপি রোগীকে ওষুধের সাহায্যেই চিকিত্সা দেওয়া যায়। ওষুধে কাজ না হলে কিছু ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্রন্থির অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়।

অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হলে এখন আর পেট কাটার দরকার পড়ে না। প্রস্রাবের পথে মেশিনের সাহায্যে ইলেকট্রিক লুপ বা লেজারে প্রোস্টেট গ্রন্থির মাংসগুলো ছোট টুকরা করে কেটে বের করা হয়। এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই সফল হয়।

প্রোস্টেট গ্রন্থির ক্যানসার হলে

ক্যানসার গ্রন্থির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে অপারেশন করে এটি পুরোপুরি ফেলে দেওয়া হয়। পেট কেটে, ল্যাপারোসকোপি বা রোবটিক সার্জারির মাধ্যমে এটি করা যায়।

বিকল্প হিসেবে র‍্যাডিক্যাল রেডিওথেরাপি দেওয়া যেতে পারে। পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন কমিয়ে ফেললে এই ক্যানসারের বৃদ্ধি বন্ধ করা যায়।

প্রোস্টেট গ্রন্থি সুস্থ রাখতে

বিইপি ও প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধের কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই। তবে জীবনযাত্রার ধরন ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে। খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের ওজন ঠিক রাখতে হবে।

স্থূল ব্যক্তিদের প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে। খাদ্যতালিকায় প্রচুর ফল ও শাকসবজি, ফাইবারযুক্ত খাবার, মাছ, বাদাম, অলিভ অয়েল থাকা ভালো। অতিরিক্ত লাল মাংস, বেশি প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য, চিনিযুক্ত পানীয়, ধূমপান, অ্যালকোহল বাদ দিতে হবে।

৫০ বছর পর রক্তের এএসএ পরীক্ষা করেন এবং যাঁদের পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস আছে, তাঁদের বিআরসিএ জিনের মিউটেশন আছে কি না, জেনে নেওয়া জরুরি। এতে প্রাথমিক স্তরে ক্যানসার শনাক্ত করে সফল চিকিত্সা সম্ভব।

বিইপির জন্য যাঁরা ওষুধ খান, তাঁরা ইউরোলজিস্টের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না। সন্ধ্যায় অত্যধিক পানি, চা, কফি, অ্যালকোহল পরিহার করলে উপকার পাবেন।

কিছু ওষুধ যেমন অ্যান্টিহিস্টামিন খেলে অনেক সময় বয়স্কদের প্রস্রাব হঠাৎ আটকে যেতে পারে। সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চললে প্রোস্টেট গ্রন্থির এসব সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

ডা. আজফার উদ্দিন শেখ: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইউরোলজি ও অ্যান্ড্রোলজি, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা