ছবি: এআই/প্রথম আলো
ছবি: এআই/প্রথম আলো

প্রশান্ত মনে ইবাদত

মানসিক চাপ সামলানো ও আত্মিক শুদ্ধি

যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ত কোলাহল, কাজের চাপ, প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড় ও হাজারো ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের মধ্যে আমাদের মন আজ বড্ড ক্লান্ত। স্ট্রেস বা মানসিক চাপ আমাদের নিত্যসঙ্গী। এই চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার বা মানসিক প্রশান্তি খোঁজার সময়টুকুও যেন আমাদের নেই। প্রাচীনকাল থেকেই নানাবিধ থেরাপি ও চিত্তবিনোদনের মাধ্যমে চিকিৎসক ও মনস্তাত্ত্বিকেরা সাধারণ মানুষের মানসিক চাপ হ্রাসের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও কার্যকর থেরাপি হিসেবে ইবাদত শুধু প্রথাগত নিয়মের সমষ্টি নয়; বরং এটি স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ও আত্মিক শুদ্ধির এক অন্যতম মাধ্যম।

যুগে যুগে নবী-রাসুলেরা উম্মতের আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তির জন্য ইবাদতকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়েছেন। আমরা যখন জাগতিক সব চিন্তা দূরে সরিয়ে একাগ্রচিত্তে স্রষ্টার সামনে দাঁড়াই, তখন আমাদের মনে যে তৃপ্তি আসে, তা থেরাপির থেকে কোনো অংশেই কম নয়। একাগ্রচিত্তে প্রার্থনার সময় মানুষের স্নায়ুতন্ত্র শিথিল হয় এবং ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা হ্রাস পায়। প্রার্থনার সময় স্রষ্টার কাছে নিজের সব অসহায়ত্ব ও উদ্বেগ সমর্পণ করার মাধ্যমে মনের ওপর চেপে থাকা বিশাল বোঝা মুহূর্তেই হালকা হয়ে যেতে পারে।

শুরু হয়েছে পবিত্র মাহে রমজান। এ সময় অফিসের কর্মসময় একটু কমলেও সেই সময়ে কাজের চাপ কমেনি। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও মায়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, মানসিক চাপের প্রধান কারণগুলো মূলত পরিবেশগত প্রতিকূলতা, জীবনের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি সম্মিলিত ফলাফল। বর্তমান বিশ্বে আমাদের কাজের চাপই আমাদের মানসিক ব্যাধির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেডলাইনের কারণে মাল্টিটাস্কিং বা একই সময়ে অনেকগুলো কাজ একসঙ্গে করার প্রবণতা আমাদের স্নায়ুর ওপর যে প্রভাব ফেলে, তা প্রচলিত উপায়ে সমাধানের বিকল্পও হতে পারে ইবাদত এবং ইবাদত শুরু করার অন্যতম সময় পবিত্র মাহে রমজান।

নিয়মিত ইবাদত করার ফলে মানুষ সময়ানুবর্তী হয়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং জিকির মানুষকে রুটিনের ভেতর নিয়ে আসে। এই সময়ানুবর্তিতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফজরের ওয়াক্তে নামাজের জন্য উঠলে যেমন কাজ করার জন্য একটি পুরো দিন পাওয়া যায়, তেমন রাতের ঘুমও সময়মতো আসে। এই রমজানে সংযম ও আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি ইবাদত ও কাজের ভারসাম্য ধরে রাখার মাধ্যমে একজন পেতে পারে মানসিক চাপ থেকে মুক্তি। তবে এ সময়  ইবাদত ও কাজের ভারসাম্য ধরে রাখা অনেকের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। এ জন্য রমজানের শুরু থেকেই কিছু নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তুললে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যাবে—

  • দিনের পূর্বপরিকল্পনা: সাহ্‌রির পর মানুষের শক্তির মাত্রা (এনার্জি লেভেল) তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজগুলো সকালের দিকেই সেরে ফেলার চেষ্টা করুন।

  • যাতায়াতের সময়ের সদ্ব্যবহার: যানজটে বসে থাকা বা অফিসে যাতায়াতের সময়টুকু সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করে সময় নষ্ট না করে জিকির, কোরআন তিলাওয়াত শোনা বা উপকারী কোনো পডকাস্ট শোনার কাজে লাগাতে পারেন।

  • কাজের ফাঁকে ইবাদত: কাজের ফাঁকে ফাঁকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি কর্মবিরতির থেকে বেশি মানসিক আরোগ্যসাধন হিসেবে কাজ করে। যখন কেউ একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করেন, তখন তিনি জাগতিক কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে যান  ও মনের বিক্ষিপ্ততা কমে অন্তরের স্থিরতা ফিরে আসে। কাজের একঘেয়েমি ও ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়।

  • কাইলুলা: রমজানে রাতে ঘুম কিছুটা কম হয়। তাই সুযোগ থাকলে দুপুরে কাজের ফাঁকে অল্প সময়ের জন্য একটি ‘পাওয়ার ন্যাপ’ বা হালকা বিশ্রাম (সুন্নাহ অনুযায়ী কাইলুলা) নিতে পারেন। এটি শরীরকে সতেজ রাখে এবং রাতের ইবাদতে পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।

  • পরিশেষে ইবাদতকে দৈনন্দিন কাজের একটি ‘টু-ডু লিস্ট’ হিসেবে না দেখে দিনের সবচেয়ে প্রশান্তিময় সময় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত এবং এই রমজানে তাড়াহুড়ো না করে, ধীরস্থিরভাবে স্রষ্টার সঙ্গে কাটানো একান্ত সময়টুকুই হতে পারে আমাদের আধুনিক জীবনের চাপ মোকাবিলার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ এবং আত্মিক মুক্তির পথ।