নিয়মিত সুডোকু মেলানোর মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার মতো অসুস্থতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়
নিয়মিত সুডোকু মেলানোর মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার মতো অসুস্থতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়

মস্তিষ্কের এই প্রধান ৫টি রোগ থেকে কীভাবে সুস্থ থাকবেন

মস্তিষ্কই মূলত আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই মস্তিষ্ক আক্রান্ত হলে মানুষের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত হয়ে চলনশক্তি, এমনকি খাবার গিলে খাওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন বহু মানুষ। কখনো কখনো স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যায়। কখনো চেতনা বা জ্ঞানই লুপ্ত হয়। ২২ জুলাই বিশ্ব মস্তিষ্ক দিবস উপলক্ষে মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে করণীয় সম্পর্কে জেনে নিন আজ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহানা মোছলেহউদ্দিন-এর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম

বিশ্বজুড়ে ৫ ধরনের সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয় মস্তিষ্ক। এর অনেকগুলোই সুস্থ জীবনাচরণের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তরুণদের চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের সমস্যায় বেশি ভুগতে দেখা যায়। কিন্তু তরুণ বয়সের স্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাসই মস্তিষ্ককে দীর্ঘদিন রাখতে পারে সচল ও সুস্থ।

স্ট্রোক

মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে এর কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নামই স্ট্রোক। এটাকে বলে ইশকেমিক স্ট্রোক। আরেক রকমের স্ট্রোক আছে যা মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে ভেতরে রক্তক্ষরণ হওয়ার কারণে ঘটে থাকে। এর নাম হেমোরেজিক স্ট্রোক।

বিশ্বজুড়ে স্ট্রোক মানুষের অকালমৃত্যু ও পঙ্গুত্বের অন্যতম কারণ। স্ট্রোক হলে মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, অসংলগ্ন আচরণ বা কথাবার্তা, এমনকি কথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও হতে পারে। গিলতে না পারার কারণে নাকের নলের মাধ্যমে খাবার দিতে হয় অনেক রোগীকে। অনেকেই প্রস্রাব-পায়খানার স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ হারান। অনেকেই চলনশক্তি হারিয়ে পুরোপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। অথচ স্ট্রোক প্রতিরোধযোগ্য রোগ।

স্ট্রোকের পেছনে মূল কারণগুলো হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তে ক্ষতিকর চর্বির আধিক্য, ধূমপান ইত্যাদি। আজকাল অনেক অল্প বয়সেই স্ট্রোক হচ্ছে। এ দুর্বিষহ সমস্যা এড়াতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস করুন আজ থেকেই—

  • সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা আর পর্যাপ্ত ঘুম।

  • উদ্ভিজ্জ খাবার (শাকসবজি, ফলমূল) গ্রহণ করুন বেশি করে। গোটা শস্য (হোল গ্রেইন) থেকে তৈরি করা খাবার বেছে নিতে হবে।

  • খাদ্যতালিকায় নানা রকম বাদাম, ডাল ও বীজ রাখুন।

  • প্রক্রিয়াজাত খাবার (রিফাইনড বা পরিশোধিত শস্যদানা, প্রক্রিয়াজাত মাংস ইত্যাদি) এড়িয়ে চলুন। ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় বর্জনীয়।

  • চিনি ও বাড়তি লবণসমৃদ্ধ খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলুন। সস বা কেচাপ, সয়া সস, পনির, মেয়োনেজ, চিপস, চানাচুর, কাসুন্দি, শর্ষে প্রভৃতিতে বাড়তি লবণ থাকে।

  • ধূমপান অবশ্যই বর্জন করুন। এড়িয়ে চলুন অ্যালকোহল।

  • নিজে চাপমুক্ত থাকুন। সন্তানদের চাপমুক্ত রাখুন।

  • ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসা নিন।

স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে পরিবারের সবার সতর্কতা দরকার। স্ট্রোক হওয়ার পর প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। দ্রুততম সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আধুনিক চিকিৎসার সুযোগসমৃদ্ধ হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলে মস্তিষ্কের ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।

ডিমেনশিয়া

ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের অন্যতম কারণ আলঝেইমারস ডিজিজ। ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর পদার্থ (বিটা অ্যামাইলয়েড) জমা হতে হতে এ রোগ বাসা বাঁধে মস্তিষ্কে। তাই রোজ সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমান। ডিমেনশিয়া এড়াতে ছোট ছোট দৈনন্দিন অভ্যাস কার্যকর। যেমন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিস শিখুন।

নতুন ভাষা শিখতে পারেন, পরিবারের সবাই মিলে বৃদ্ধিবৃত্তিক খেলা (যেমন পাজল, শব্দজব্দ, সুডোকু ইত্যাদি) খেলুন। বই পড়ুন। মনোযোগ দিতে হয় এমন কাজের অভ্যাস বাড়ান। পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে সময় কাটান। নিয়মিত ব্যায়াম আর সুষম খাবারও আবশ্যক।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর তেল (যেমন অলিভ অয়েল) গ্রহণ করতে পারেন। তবে সে তেলের সঠিক ব্যবহারবিধিও জানা থাকা চাই। মাছের তেলেও ওমেগা–৩ আছে, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছে। তাই সপ্তাহ অন্তত দুই থেকে তিন দিন মাছ খাওয়া উচিত।

পারকিনসনস ডিজিজ

পারকিনসনস ডিজিজে আক্রান্ত হলে হাত কাঁপে

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আজকাল অনেকেই পারকিনসনস ডিজিজে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ রোগের সাধারণ উপসর্গ হাত কাঁপা, ধীরতা, ছোট পদক্ষেপ, হাতের লেখা ছোট হয়ে আসা। সেই সঙ্গে স্মৃতিশক্তিও কমে যায়। মস্তিষ্কের এই রোগও যে কারও স্বাভাবিক জীবনধারাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত নানা ধরনের ব্যায়াম এ রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

খাবার ও পরিবেশ থেকে আসা নানান ক্ষতিকর পদার্থের কারণে এ রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেমন কীটনাশক ও রাসায়নিক সার। তাই শাকসবজি ও ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসা সত্ত্বেও রোগটি বাড়তে থাকে, তবে সঠিক ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি, পরিচর্যার মাধ্যমে রোগ নিয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।

মস্তিষ্কে আঘাত

বিশ্বজুড়ে মস্তিষ্কের ক্ষতির অন্যতম কারণ হলো দুর্ঘটনাজনিত মস্তিষ্কের আঘাত। এসব দুর্ঘটনার অনেকগুলোই ঘটে সচেতনতার অভাবে, অসতর্কতার কারণে।

  • পথে তাড়াহুড়া করবেন না। বেপরোয়া গতি দুর্ঘটনার কারণ। রাস্তা পার হবেন নিয়ম মেনে। রাস্তা পারপারের সময় কখনোই মুঠোফোন ব্যবহার করবেন না।

  • বাইক চালানোর সময় হেলমেট এবং গাড়ি চালানোর সময় সিটবেল্ট ব্যবহারে অবহেলা করবেন না।

  • মাথা ঘোরা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, রক্তে শর্করা বা ইলেকট্রোলাইট কমে যাওয়ার কারণে হঠাৎ পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এসব অস্বাভাবিকতাকে অবহেলা করবেন না।

  • পিচ্ছিল পথে সাবধানে হাঁটুন। ঘর বা বাথরুম যেন পিচ্ছিল না থাকে। স্যান্ডেল বা পাপোশ পিছলেও অনেকে পড়ে যান। বিশেষ করে বাড়িতে বয়স্ক ব্যক্তি থাকলে এসব বিষয়ের দিকে নজর দিন।

  • বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ভারসাম্য বা ব্যালান্স নষ্ট হয়। পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এটি প্রতিরোধে তরুণ বয়স থেকেই ভারসাম্যের ব্যায়াম চর্চা করা ভালো।

  • বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির জন্য ঘর ও বাথরুমের বিভিন্ন দেয়ালে হাতলজাতীয় অনুষঙ্গ বসিয়ে নিতে পারেন। ভারসাম্য রক্ষার জন্য লাঠি বা ওয়াকারের ব্যবস্থা রাখুন।

খিঁচুনি

কিছু জ্বর বা সংক্রমণ আছে, যার সঙ্গে খিঁচুনি হওয়াটা স্বাভাবিক

জিনগত কারণে খিঁচুনি হলে প্রতিরোধ করার উপায় নেই। চিকিৎসার মাধ্যমে সমস্যাটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। তবে যাঁদের শৈশবে খিঁচুনি ছিল না, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর খিঁচুনি হয়েছে, তার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খিঁচুনির কারণ মস্তিষ্ক বা মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ, স্ট্রোক, রক্তের সুগার কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসেমিয়া), ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, মস্তিষ্কের টিউমার প্রভৃতি।

  • মেনিনজাইটিসের টিকা নিন। বিশেষত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকলে কিংবা মেনিনজাইটিসের প্রাদুর্ভাব আছে এমন জায়গায় ভ্রমণের আগে। হজের আগেও এ টিকা নেওয়ার নিয়ম আছে।

  • কানের পর্দায় ছিদ্র থাকলে সেটির চিকিৎসা করান। এসব ছিদ্রের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

  • ডায়রিয়া বা বমি হলে নিয়মমাফিক স্যালাইন ও অন্যান্য তরল গ্রহণ করুন।

  • তীব্র মাথাব্যথা কিংবা অতিরিক্ত বমি হলে চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না।

  • ডায়াবেটিস থাকলে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকুন। দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকবেন না।