কালার ক্রেজ নামের একটি উদ্যোগের স্বত্বাধিকারী মারুফা আক্তার স্বর্ণা
কালার ক্রেজ নামের একটি উদ্যোগের স্বত্বাধিকারী মারুফা আক্তার স্বর্ণা

২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু, এখন ভাড়া আর বেতন বাবদই দেন ১৪ লাখ টাকার বেশি

সঞ্চারী, রোকেয়া, কাদম্বিনী, জ্যোতির্ময়ী, ইন্দুবালা, তিয়ানা, ইরাবতী—এগুলো সব শাড়ির নাম। মারুফা আক্তার স্বর্ণার নকশা করা শাড়ি। নামগুলোও তাঁর দেওয়া। এসব নামের পেছনে আছেন তাঁর মা, কাছের কোনো ব্যক্তি বা অনেক বছরের পুরোনো কোনো ক্রেতা। কালার ক্রেজ নামের একটি উদ্যোগের তিনি স্বত্বাধিকারী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমসে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় বারিধারা মহিলা সমিতি থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ২০১৪ সালে ব্যবসাটা শুরু করেছিলেন মারুফা। বললেন, ‘বাবা–মায়ের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল। তবে আমি ছোটবেলা থেকেই নিজে কিছু করতে চেয়েছি।’

মা-বাবা–বোন চাইতেন বিসিএস ক্যাডার, ব্যাংকার, চিকিৎসক—এমন কোনো পেশা বেছে নিক মারুফা। আর মারুফার জেদ, তিনি ব্যবসা করবেন বা উদ্যোক্তা হবেন। পড়াশোনা শেষ করার পর এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে অঘোষিত যুদ্ধ লাগে। মারুফা বলেন, ‘বলতে গেলে বাসায় আমাকে একঘরে করে রাখা হয়েছিল। মা–বাবা আত্মীয়দের বলতেন, “ও আর কী করবে, শাড়ি বেচবে, হকার হবে।” বিয়ের পরও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গেও ফাইট করতে হয়েছে। সব মিলে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম। শুধু জেদের কারণে আজ এ অবস্থায় আসতে পেরেছি।’

নিজের নকশা করা একটি শাড়ি নিয়ে শুরু করা কালার ক্রেজের এখন উত্তরা, ধানমন্ডি আর বেইলি রোডে তিনটি শোরুম। আছে স্টুডিও, ডিসপ্লে জোন। মিরপুর ১২ নম্বরে ফ্যাক্টরি। ফ্যাক্টরি ও শোরুম ভাড়া, প্রায় ৫০ জন কর্মীর বেতন বাবদ মাসে খরচ সাড়ে ১৪ লাখ টাকা। সব খরচ বাদে লাভ যা থাকে, তাতে সন্তুষ্ট কি না, জানতে চাইলে হেসে মারুফা বললেন, ‘২০১৯ সাল থেকে পুরোদমে ব্যবসাটা করে যাচ্ছি। যা লাভ হয়, তাই দিয়ে একটু একটু করে ব্যবসাটা বড় করছি। নিজের বিয়েতে মা–বাবার পাশাপাশি নিজে দেড় লাখ টাকা খরচ করেছি। ঢাকায় নিজের টাকায় একটি ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছি। ব্যাংকে এখন কোনো দেনা নেই। সব মিলে ভালো আছি।’ যে বাবা একসময় মেয়ে ব্যবসা করুক চাইতেন না, তিনিই এখন ফ্যাক্টরি দেখভাল করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই যোবায়ের বিন হাবিবের সঙ্গে মারুফার পরিচয়। ভালোবেসে বিয়ে করেন তাঁরা। মারুফা বললেন, ‘স্বামী সব সময় মানসিক সাপোর্ট দিয়েছেন। এখন নিজেই ব্যবসার আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো দেখেন, ব্যবসার ফটোগ্রাফির কাজটি করেন।’

মারুফা আক্তার স্বর্ণা

তাঁদের একটিমাত্র ছেলে আলিশের যোবায়ের শুদ্ধ, বয়স ৩ বছর ৩ মাস। এই সন্তানকে পেটে নিয়েই ব্যবসার সব কাজ করেছেন মারুফা। নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে কাপড় কেনা, ফ্যাক্টরিতে কাজের তদারকি করেছেন। মারুফা বলেন, ‘আমার পণ্যের লাইভ আমি নিজেই করি। সন্তান জন্ম দেওয়ার এক দিন আগেও কোনো মেকআপ ছাড়াই লাইভ করেছি। ২৯ দিন বয়স থেকে ছেলে আমার সঙ্গে জামদানি হাট থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া শুরু করেছে। গাড়িতে তখন স্বামী, বাবা বা মা থাকতেন। বাচ্চাটা কোনোভাবেই যাতে বঞ্চিত না হয়, সে চিন্তাটা মাথায় থাকে সব সময়। বাচ্চা যখন ছোট ছিল, রাতে ঘুমাত না, দিনেও সারা দিন সঙ্গে থাকত। তাই প্রেশার গেছে অনেক।’

মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য কাউন্সেলিংকে সব সময় গুরুত্ব দেন মারুফা, ‘সন্তানের জন্ম দেব, এ পরিকল্পনা করার পর থেকেই কাউন্সেলিং নিয়েছি। এখনো নিই। কঠিন সময় আসছে, এটা মনে হলে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।’ বললেন, ২০২৫ সালে তাঁর একজন কর্মী হিসাবে ২২ লাখ টাকার গরমিল করেছিলেন। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর তিনি ওই টাকাটা ফেরত দিয়েছেন। তখন খুব খারাপ সময় গেছে।

মারুফার ভাষায় এটি তাঁর নিজের শ্রম-ঘামের ব্যবসা। এ উদ্যোগের ৯৮ শতাংশ পণ্যই দেশীয়। কিছু কাপড় বিদেশ থেকে আনেন। কালার ক্রেজ নিয়ে মারুফার আরও অনেক স্বপ্ন, ‘আমার পণ্য বহু আগে থেকেই বিদেশে থাকা বাংলাদেশি ক্রেতারা নিচ্ছেন। আমি চাই, আমার পণ্য বিদেশি ক্রেতার জন্যও তৈরি হবে। থাইল্যান্ডসহ যেকোনো দেশে আমার শোরুম থাকবে। এটা অসম্ভব কিছু না। আমাকে একটু পড়াশোনা করতে হবে আর আন্তর্জাতিক মার্কেট ধরার জন্য নকশাটা একটু মডিফাই করতে হবে।’

ছেলেকেও ব্যবসায়ী বানাবেন কি না জানতে চাইলে মারুফা বলেন, ‘ছেলে কী হতে চায়, সে নিজেই ঠিক করবে। আমি পরিবারে চাপের মধ্যে বড় হয়েছি। আমি চাই আমার ছেলে কোনো চাপ না নিয়ে বড় হবে। তাই স্কুলে তাকে প্রথম হতেই হবে, এমন কোনো শর্ত থাকবে না।’