বর্ষা এলেই ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে কার না ইচ্ছে হয়। বৃষ্টির দিনে চা হাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, নয়তো প্রকৃতির মধ্যে ঘোরাঘুরি করেই চলে বর্ষাযাপন।

ছোটবেলায় যখন আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমে আসত, আমাদের আজিমপুর কলোনির ছেলেমেয়েরা নিচে নেমে ভেজার জন্য আঁকুপাঁকু করত। মায়েরা তখন গরম চোখে তাকিয়ে ঠান্ডা করতেন, খবরদার, সামনে পরীক্ষা! ঠান্ডা লেগে যাবে!
বৃষ্টি উদ্যাপন করতে সেই মায়েরা নিজেরাই তারপর চুলায় খিচুড়ি বসিয়ে দিতেন, আগের রান্না তরকারি ফ্রিজে রেখে দিয়ে বের করতেন ইলিশ। কলোনির বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ ভেসে আসত, আর তেলে বেগুন পড়ার ছ্যাৎ ছ্যাৎ শব্দ। কখনো বিকেলে শর্ষের তেল ও পেঁয়াজ দিয়ে মাখা হতো মুড়ি ও চানাচুর।
তারপর আঁধার ছাপিয়ে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলে বারান্দার কাপড় ওঠানোর জন্য ছোটাছুটি শুরু হতো। কেউ হয়তো শুকাতে দিয়েছিল আচারের আম, ছোটরা দৌড়ে যেত সেটা তুলে আনতে।
সুযোগ বুঝে মুখেও পুরে দিত দু–একটা শুকনা আমের টুকরা। হঠাৎ কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসত হারমোনিয়াম আর গলা সাধার শব্দ, ‘এসো শ্যামল সুন্দর’। কলোনির পুকুর উপচে রাস্তায় পানি উঠে এলে সেই পানিতেই ফুটবল খেলতে শুরু করত কেউ কেউ।
আমাদের সময় মাঝেমধ্যে স্কুলে রেইনি ডের ছুটি দেওয়া হতো, এখনো কি তেমন হয়? জানতে ইচ্ছা করে, এখনকার জেন–জিরা বৃষ্টি এলে কী করে? কানে ব্লুটুথ ডিভাইস লাগিয়ে জানালার ধারে বসে গান শোনে?
কফি শপে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিতে দিতে কাচের জানালায় বৃষ্টিভেজা শহর দেখে? ঝাপসা উইন্ডস্ক্রিনে বৃষ্টির জল মুছতে মুছতে গাড়ি নিয়ে দূরে কোথাও চলে যায়? কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েরা কি এখনো আমাদের মতো বৃষ্টি এলে রিকশার হুড উদোম করে দেয়?
দুনিয়ার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যের একটি আমবাগানে অপু ও দুর্গার বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য। গ্রামে কি শহরে, দেশে কি বিদেশে, বৃষ্টি নামলেই এই দৃশ্য মনে পড়ে। ট্রেনের বা গাড়ির জানালা দিয়ে কতবার যে মুগ্ধ হয়ে দেখেছি শিশুদের বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য।
বৃষ্টি দেখার জন্য তাই বর্ষা এলেই মন উড়ু উড়ু হয়, মনে হয় দূরে কোথাও চলে যাই। বর্ষা দেখতেই কেবল কয়েকবার শ্রীমঙ্গলে গেছি। বালিশিরা নামের এক জায়গায় বৃষ্টির দাবড়ানিতে দুদিন ঘর থেকেই বেরোতে পারিনি। রুমের বারান্দায় বসে সারা দিন বৃষ্টির তাণ্ডব দেখেছি।
ডাইনিংটা ছিল রুম থেকে খানিক দূরে, হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটিয়ে জল পেরিয়ে ছাতা মাথায় প্রতিবার খেতে যেতে হয়েছে। রিসোর্টের পেছনে একটা ছোট টিলা থেকে অবিরত বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ার রিমঝিম শব্দ শুনতে শুনতে রাতে ঘুমিয়েছি।
চেয়ারে পা তুলে বৃষ্টি দেখতে দেখতে বই পড়ে সময় কেটেছে। এই বাংলার এ এক আশ্চর্য রূপ। কোনো ছোটাছুটি নয়, কোনো অ্যাকটিভিটিস নয়, ছয়–সাতটা পয়েন্ট দর্শন নয়, প্যারাগ্লাইডিং ও স্কুবা ডাইভিং নয়, স্রেফ একটা পাহাড়ের কোলের নির্জন ঘরে বা হাওরের বুকে নৌকায় বসে বর্ষা দেখেই অবকাশ কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব।
বর্ষার দিনে পদ্মার বুকে কি কক্সবাজারে আঁধার করে আসা সৈকতে একটা বিকেলই যথেষ্ট মন উদাস করে দেওয়ার জন্য।
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে বন্ধুদের সঙ্গে হাউসবোটে বসে চা খেতে খেতে সেটাই বলছিলাম। হাউসবোটের ছোট্ট জানালার ওপারে ধু ধু পানি। গাঢ় নীল জলরাশির মধ্যে হঠাৎ মাথা উঁচিয়ে থাকা একটা একলা গাছ।
দূরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো জেগে থাকা একটা বাড়ির চালা। আরও দূরে নীল আকাশের বুকে মিশে থাকা নীলাভ পাহাড়ের জলরঙা আউটলাইন।
জানালা দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই শুরু হলো বৃষ্টি। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে হাওরের পানিতে। ফোঁটাগুলো পড়তে না পড়তে আবার ট্রিং করে লাফিয়ে উঠছে ওপরে। মুহূর্তে চারদিক ঝাপসা হয়ে এল।
দূরের নীল পাহাড় ও আকাশ বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। যেন এক মহান চিত্রকর হাতে রংতুলি নিয়ে খেলছেন। কী অপূর্ব, কী অপূর্ব! বাংলার প্রকৃত সৌন্দর্য আসলে এই বর্ষা। এই ঝুম বৃষ্টি। এই নদী–নালা, খাল–বিল ও হাওর–বাঁওড়।
অন্যদের হয়তো আছে ঝাঁ–চকচকে সমুদ্রসৈকত, উঁচু উঁচু পর্বত আর ট্র্যাকিং লাইন, আর নানা রকম থ্রিলিং অ্যাকটিভিটি। কিন্তু আমাদের যা আছে, তা আর কোথাও নেই। এই চরাচরব্যাপী জল আর জল।
নদীর তীরে শিশুদের খালি গায়ে ঝুপ করে পানিতে লাফিয়ে পড়া কিংবা দূরে একটা জেলে নৌকা থেকে জাল ছুড়ে মারার দৃশ্য। গভীর নিস্তব্ধ হাওরে বজরার ছাদে বসে পূর্ণিমা দেখা।
সেই ভরা পূর্ণিমায় চরের বুক চিরে মাঝির ভাওয়াইয়া গান ভেসে আসা—‘ও রে আষাঢ় শাওন মাসে, দেওয়া ঝরে কানাই মধু রসে রে। তাক দিব আমি গলার চন্দ্রহার রে, ও হো পার করিলে মুই নারী তোমার রে।’
একবার মিঠামইন গেছি বর্ষার শুরুতে। প্রখর রোদে অটোরিকশায় ঘুরে বেড়াচ্ছি, তখন এক অদ্ভুত লোকের সঙ্গে দেখা। গনগনে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাঁজ পড়া কর্কশ হাত দিয়ে কপাল ঢেকে বয়স্ক লোকটা বললেন, ‘আপনাদের আইজকেই চইলা যাইতে হইব।’
কিশোরগঞ্জের বুক চিরে চলে গেছে যে সাবমারসিবল রোড, তার দুই ধারে এখনো পানি উঠি উঠি করছে, মাথাসমান পানির বুকে এখনো উঁচিয়ে আছে লম্বা লম্বা ঘাস–গুল্ম, রাস্তায় এখনো সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর সাইকেল চলছে দু–একটা।
শুনেছি, ভরা বর্ষায় এই রাস্তা প্লাবিত হয়ে যায়, একূল–ওকূল কিছু আর তখন দেখা যায় না, গোটা এলাকা রূপান্তরিত হয় বিশাল এক হাওরে। কিন্তু সে তো নিশ্চয় দেরি আছে। তাই প্রশ্ন করি, কেন? আজই যেতে হবে কেন? আমাদের কাল যাওয়ার কথা।
জবাবে লোকটি অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলেন, আকাশের দিকে আবার তাকিয়ে বললেন, ‘বিষ্টি শুরু হইব। আর যাইতে পারবেন না।’
ধুর! কোথায় বৃষ্টি! রোদে ভালোভাবে তাকানোই যাচ্ছে না। লোকটি চলে গেলে তাচ্ছিল্য করে অটোরিকশায় উঠি আবার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফিরতে হবে। এক চিকিৎসা গবেষক দলের সঙ্গে যেচে পড়ে ভিড়ে গেছিলাম দুদিন আগে।
গবেষক দলের সদস্যরা দিনভর মাঠপর্যায়ের গবেষণা করছেন আর আমি টো টো করে ঘুরছি। ওমা, দুপুরের খাবার খেতে বসতে না বসতেই শুরু হলো বৃষ্টি। যেন তেন বৃষ্টি নয়, মনে হচ্ছে আকাশ উপুড় করে দিয়েছে কেউ। ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে চারদিক।
এমন বৃষ্টি জীবনে দেখিনি। দেখতে না দেখতে স্বাস্থকেন্দ্রের উঠান, প্রাঙ্গণ ও রাস্তা পানিতে থই থই। দুটি জিপ আর একটি মিনিবাস নিয়ে এসেছে দলটি। সাবমারসিবল রোড ডুবে গেলে পাক্কা চার মাস আর গাড়ি বের করা যাবে না।
তখন কেবল নৌকাই ভরসা এ অঞ্চলে। উপজেলা কর্মকর্তার জরুরি ফোন এল স্যারের কাছে। গাড়ি নিয়ে ফিরতে হলে এক্ষুনি রওনা দিতে হবে। রাস্তা ডুবতে শুরু করেছে। আর এক ঘণ্টা দেরি হলেই আটকা। উত্তেজিত ভঙ্গিতে ছোটাছুটি শুরু করেছে সবাই।
জিনিসপত্র গুছিয়ে হুড়মুড় করে সবাই গাড়িতে উঠল। তারপর এই তুমুল বৃষ্টিতে রওনা দিলাম আমরা। গাড়ি এগোচ্ছে আর দেখতে পাচ্ছি পেছনে ফেলে আসা রাস্তা ক্রমেই ডুবে যাচ্ছে পানিতে। দুই ধার উপচে গলগল করে পানি উঠে আসছে দুদিক থেকে। এ যেন হলিউডের মুভি।
কিন্তু তার চেয়ে অবাক করা চিত্র হলো চারদিক ধোঁয়াটে করে আসা হাওরাঞ্চলের বিখ্যাত বাদর। এ এক অপার্থিব দৃশ্য! জীবনে কখনো ভুলব না এই বৃষ্টির দৃশ্যের কথা। এই কূল ভাসানো বর্ষার কথা। ভুলব না সেই অদ্ভুত বুড়া লোকটির কথাও।
বাংলার বর্ষার এই অপরূপ রূপে মজেছেন বিদ্যাপতি থেকে রবীন্দ্রনাথ। অদ্বৈত মল্লবর্মণ থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। মৈমনসিংহ–গীতিকায় ‘দেওয়ানা মদিনা’র পালায় আসে বর্ষা, ‘আইল আষাঢ় মাস লইয়া মেঘের রাণী।/ নদীনালা বাইয়া আইসে আষাঢ়িয়া পানি,/ শকুনা নদীতে ঢেউয়ে তালেপার করে।/ বাণিজ্য করিতে সাধু যত যাহে দেশান্তরে।’
রাধাকৃষ্ণের কাহিনিতেও ঘুরেফিরে সেই বর্ষা, ‘আষাঢ়–শ্রাবণ মাসে মেঘ/বরিষে যেহ্ন/ঝর এ নয়নের পানী।/ আলবড়ায়ি।’
এই বাংলার কবি, ঔপন্যাসিক, গীতিকবি, পালাকাররা বর্ষা ছাড়া কিছু যেন লিখতেই পারেন না।
সে জন্যই কি আমরাও বৃষ্টির দিনে এমন উতলা হয়ে পড়ি? মন ছুটে যায় হাওর ও নদী–নালার বুকে, ধু ধু নীল জলরাশি আমাদের এমন উন্মনা করে তোলে?
ঝুম বৃষ্টিতে এক কাপ চা, আর হাতে একখানা প্রিয় বই, কিংবা পাতে গরম খিচুড়ি আর কড়া করে এক পিস ইলিশভাজা, বর্ষা দিনের গান কি মেঘমল্লারের সুর—বাঙালির জীবনে এর চেয়ে প্রিয় অবকাশ কাটানো আর কি কোথাও আছে?