ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার গ্রিঞ্জবারোয় ক্যাম্প করেছে নরওয়ে দল। সঙ্গে এনেছে স্যামনসহ ৩০০ কেজি মাছ, ১০০ কেজির বেশি ঐতিহ্যবাহী বাদামের পনির ব্রুনোস্ট, ১১৬ কেজি নরওয়েজিয়ান চিজ আর ৬ হাজার কমলা।

আর্লিং হলান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডদের নিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরছে নরওয়ে। তাই বিশ্বকাপে কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না নরওয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের অচেনা খাবারের ওপর ভরসা না করে খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মাঠের সেরা পারফরম্যান্স ধরে রাখতে নরওয়ে দল সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে বিপুল পরিমাণ নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার।
সব মিলিয়ে এই খাবারের ওজন ১ টন বা ১ হাজার কেজির বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র গরমে ফুটবলারদের ক্লান্তি দূর করতে, শরীরে পুষ্টির জোগান ঠিক রাখতে এবং ঘরের খাবারের চেনা স্বাদ দিয়ে খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে চনমনে রাখতে নরওয়ে দল এই ব্যতিক্রমী প্রস্তুতি নিয়েছে।
দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে বড় কোনো টুর্নামেন্ট খেলার সময় খেলোয়াড়দের চেনা অভ্যাস বা রুটিন ঠিক রাখা সত্যিই কঠিন। নরওয়ে দলের এই পরিকল্পনা কেবল মুখের স্বাদ বা আরামের জন্য, এমনটা নয়। বরং তাদের চেনা রুটিন ধরে রাখার একটি বড় কৌশল।
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার পর থেকেই নরওয়ে তাদের মূল প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই খাবারদাবারের বিষয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
খেলোয়াড়দের খাবারের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আছে মাছ আর নরওয়েজিয়ান চিজ। খাবারদাবারের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে আছেন নরওয়ের নিজস্ব শেফরা, যাঁদের অন্যতম অ্যারন এসপেল্যান্ড।
অ্যারন এসপেল্যান্ড নরওয়ের একজন নামকরা ও পুরস্কারজয়ী শেফ। আর্লিং হলান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডদের মতো তারকা ফুটবলারদের পুষ্টি ও খাবারের দেখভালের জন্যই তিনি নরওয়ে জাতীয় দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
অ্যারন বলেছেন, ‘আমরা যা ভালো বলে মনে করি, ঠিক সেটাই চাই। আর নরওয়ের সেরা উপাদানগুলো নিয়ে কাজ করি। সেরা খাবারটা খেলোয়াড়দের পাতে দিতে পারাটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।’
আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলো এমনিতেই অনেক ঝামেলায় ভরা থাকে। অনবরত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ, তীব্র গরম, হোটেলের জীবন আর একদম নতুন পরিবেশ—সবই ফুটবলারদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক চাপে ফেলে দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের চেনা খাবার নিয়ে যাওয়াটা কোনো লোকদেখানো ব্যাপার নয়; বরং এটি নরওয়ে ফুটবল দলের কর্মকর্তাদের একটি দারুণ বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
তাঁরা মনে করেন, এই ছোটখাটো চেনা অভ্যাসগুলোই খেলোয়াড়দের নতুন পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে। আর এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়বে মাঠের পারফরম্যান্সে।
বড় কোনো টুর্নামেন্টে নিজেদের খেলোয়াড়দের খাবারের যত্ন নেওয়া নরওয়ের জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও ২০১৮ সালের অলিম্পিকে নরওয়ে দল খাবারের কারণে খবরে উঠে এসেছিল।
সেবার ভুল করে ১ হাজার ৫০০ ডিমের জায়গায় তারা ১৫ হাজার ডিমের অর্ডার দিয়ে ফেলেছিল। অলিম্পিকের সেই ঘটনা মজার হলেও এটি প্রমাণ করে অ্যাথলেটদের খাবার ও পুষ্টি নিয়ে নরওয়ে সব সময়ই অনেক সতর্ক।
তবে অলিম্পিকের সেই ভুলের চেয়ে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপের পরিকল্পনাটি বেশ গোছানো ও বাস্তবসম্মত। নরওয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যেন নরওয়ে দল যুক্তরাষ্ট্রে এসেও ঘরের মতো চেনা খাবার পায়। এতে তাদের চেনা রুটিন যেমন ঠিক থাকবে, তেমনি বাইরের কোনো ঝামেলার কারণে খেলায় মনোযোগও নষ্ট হবে না।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই প্রস্তুতি হয়তো সরাসরি কোনো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেবে না; তবে খেলা শুরুর আগে খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ ও দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে এটি দারুণ সাহায্য করবে। নরওয়ের জন্য আসল লক্ষ্য এটাই।
এর আগেও বিশ্বকাপে এমন ঘটনা দেখা গেছে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল দেশ থেকে প্রায় ৯০০ কেজি গরুর মাংস সঙ্গে নিয়ে এসে খবরের শিরোনাম হয়েছিল। যার ফল সবাই দেখেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বিষয়টিকে মার্কিন খাবারের প্রতি নরওয়ের অবিশ্বাস হিসেবে দেখছে। তবে দলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আসল কারণটি পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক ও পারফরম্যান্সের সঙ্গে যুক্ত।
বাড়ি থেকে দূরে কয়েক সপ্তাহ ধরে অপরিচিত পরিবেশে থাকার সময় সামান্য খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও খেলোয়াড়দের হজম, ঘুম, ক্লান্তি দূর করা বা ম্যাচের প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নরওয়ে দল মূলত এই ঝুঁকিটুকু এড়াতে চায়।
সূত্র: ইয়াহু স্পোর্টস ও ডায়ারিও এএস সকার