
প্রথমেই বলে রাখি, কারও প্রতি আঙুল তুলতে লিখতে বসিনি, বরং নিজেকে অপ্রতিমের বাবার জায়গায় দাঁড় করিয়ে যা অনুধাবন করলাম, তা-ই লিখছি।
আমার ছেলে কাজী পৃথিবী, ডাকনাম মেঘ। বয়স ১৯ বছর। ওর সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য মাত্র ২৬ বছর। কাজেই খুব সহজেই আমরা ভালো বন্ধু হতে পেরেছি। মেঘের শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য—সব বয়সেই আমি ওর ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’।
ওকে নিয়ে এককালে ফেসবুক ও ব্লগে বিস্তর লেখালেখি করতাম ‘মেঘনামচা’, ‘দুষ্টু মেঘের মিষ্টি গল্প’ ইত্যাদি শিরোনামে। সে সুবাদে অনেকেই আমার ‘প্যারেন্টিং’ সম্পর্কে জানেন আর তাঁদেরই কেউ কেউ আমাকে লিখতে বলছেন সম্প্রতি আলোচিত বিষয়টি নিয়ে।
আমাদের শৈশবে আমরা মা-বাবাকে যেমন ভয় পেতাম, এখনকার ছেলেমেয়েরা সেই চোখে মা-বাবাদের দেখতেই শেখেনি। আমেরিকাপ্রবাসী ভারতীয় স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান অমিত ট্যান্ডন তাঁর শোয়ে মজা করে বলেছিলেন, ‘ছেলেবেলায় আমরা মা-বাবার ভয়ে বাড়িতে তাড়াতাড়ি ঢুকতাম আর এখন ছেলেমেয়ের ভয়ে দেরি করে বাসায় ঢুকি।’
অমিত ট্যান্ডনের আরেকটি উক্তি, ‘ছেলে আমার সঙ্গে এমন স্বরে কথা বলে যেন ওর বাবা হয়ে একটা অপরাধ করে ফেলেছি এবং আজীবন তার শাস্তি পেতে হবে।’
অন্য এক জায়গায় অমিত ট্যান্ডন বলছিলেন, ‘আমাদের বেডরুমে ছেলে বা মেয়ে নক না করেই ঢুকে পড়ে, তাই ওরা বাসায় থাকলে আমরা স্বামী-স্ত্রী একটু সাবধানে থাকি। অথচ ওদের ঘরে আমাদের প্রবেশাধিকারই নেই...।’
এর ভেতরের গল্পটাই আসল কথা। আমরা আজকাল সন্তানের সঙ্গে এতটাই বন্ধুবৎসল যে তারা আমাদের মোটেও ভয় পায় না। বরং কারও কাছে বাবা মানে ‘টাকার খনি’, মা মানে ‘আলাদিনের চেরাগ’।
কিন্তু আমার তো মনে পড়ে, একটা খেলনা গাড়ির জন্য আমাকে এক বছর অপেক্ষা করতে হতো। প্রতিটি জন্মদিনে কিছু উপহার পেতাম, অন্য সময় মায়ের সঙ্গে নিউমার্কেটে কোনো কাজে গিয়ে কিছু আবদার করলে বলত, ‘জন্মদিনে কিনে দেব, অপেক্ষা কর।’
আর আমি ‘উইন্ডো শপিং’ করতে করতে সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখের জন্য উদ্গ্রীব থেকেছি...এখনো সে অভ্যাস যায়নি।
এই যে আমরা বিশেষ করে কর্মজীবী মা-বাবারা, সন্তানকে সময় দিতে না পারার অপরাধবোধ চাপা দিয়ে রাখি দামি উপহার দেওয়ার আত্মতুষ্টি দিয়ে। এ যেন বালুতে পানি ঢেলে ফসল ফলানোর চেষ্টা। বৃথা, এসব বৃথা; যদি সন্তান তার মনের কথা বলার জন্য মা-বাবার বদলে বাইরের কাউকে বেছে নেয়।
আমার মা-বাবা দুজনই কর্মজীবী ছিলেন। আমিও মনের কথা বলতে বেছে নিতাম ডায়েরি বা সিনিয়র কোনো বন্ধুকে। তার ফল ভালো হয়নি। সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। আমি তাঁদের মতো একই ভুল করছি না।
আমার মূল বক্তব্য হলো, সন্তানের বন্ধু হতে হবে, তবে সে যেন আমাকে ভয় পায়, শ্রদ্ধা করে। ভালোবাসা মানেই সব বিকিয়ে দেওয়া নয়। অন্যদিকে দেখি, ছেলের প্রতিটি জন্মদিনে আমরা অন্তত একজন ছুটি নিই। তার বড় কোনো পরীক্ষা থাকলেও আমরা অন্তত একজন ছুটি নিই। সে অসুস্থ থাকলেও তার পাশে অন্তত একজন থাকি। এই পাশে থাকার বিকল্প কোনো দামি উপহার, খাবার বা ভাড়া করা মানুষ হতে পারে না।
সন্তানের পাশে থাকার কারণে আমাদের চাকরির কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু সেই সব সময়ে ও যদি আমাদের কাউকে পাশে না পেত, সেই ক্ষতি হতো ওর মনোজগতে, যা অপূরণীয়।
অপ্রতিম বাংলাদেশের কুমিল্লার কোনো একটি শিশু নয়। জীবন দিয়ে সে এ দেশের সব শিশু-কিশোরের প্রতিনিধি হয়ে গেছে। অন্যদিকে সব কিশোরই তুহিনের মতো গ্যাং গড়ে না; তবে যারা গ্যাং গড়ে বা তার সদস্য হয়ে যায়, তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখলে জানা যাবে, তারাও অনেকটাই একা।
আমাদের কৈশোরে মুক্তবাজার অর্থনীতি আর আকাশ সংস্কৃতি নিয়ে অনেকেই পত্রিকায় সমালোচনা করতেন, আমরা সেসব পড়তাম, একটা দিকনির্দেশনা পেতাম। কিন্তু অবাধ ইন্টারনেট, অসীম চাহিদা আর পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে কজন লিখছেন? কয়টি কনটেন্ট ভাইরাল হচ্ছে? কোথা থেকে তৈরি হবে সামাজিক মূল্যবোধ?
অবক্ষয় রোধে এ দেশের অগ্রগামী সমাজ সংস্কারকেরা কী ভূমিকা রাখছেন? অপ্রতিমের মতো নিষ্পাপ শিশু-কিশোরেরা সমাজের কাছে কী প্রত্যাশা করে, তা নিয়ে ভাবছেন কতটা আর করছেন কতুটুকু?
এ প্রশ্ন শুধু আপনাকেই করছি না, নিজেকেও করছি, যাতে আমিও ভুল না করি।
কাজী মনজুর করিম মিতুল: প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক