পদবি বদলানোর ঝক্কি এড়াতে জাপানিদের বিয়ের অভিনব উদ্যোগ

জাপানের আইন অনুযায়ী, বিয়ের পর স্বামী ও স্ত্রীকে একই পারিবারিক নাম বা পদবি ব্যবহার করতে হয়
জাপান বিয়ে

জাপানের টোকিওর একটি রেস্তোরাঁয় নার্ভাস হয়ে বসে আছেন তিন পুরুষ ও তিন নারী। আপাতদৃষ্টিতে তাঁরা একে অপরের অচেনা। কিন্তু তাঁদের সবার মধ্যে অন্তত একটি বিষয়ে দারুণ মিল।

একটু পরই তাঁদের দুজন দুজন করে বুথে বসিয়ে দেওয়া হবে। একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য তাঁরা সময় পাবেন ১৫ মিনিট।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হাসিমুখে বললেন, ‘চলুন, সুন্দর একটা হাসি ও হ্যালো দিয়ে শুরু করা যাক।’

মজার ব্যাপার হলো, আলাপের সময় তাঁদের কারও বংশের নাম বা পদবি জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন নেই। কারণ, তাঁদের সবার পদবি একটাই। কিন্তু কেন এই অদ্ভুত আয়োজন?

এর পেছনে আছে জাপানের একটি বিতর্কিত আইন। দেশটির আইন অনুযায়ী, বিয়ের পর স্বামী ও স্ত্রীকে একই পারিবারিক নাম বা পদবি ব্যবহার করতে হয়। এই নিয়মের হাত থেকে বাঁচতেই একই পদবির মানুষদের এক করার এই অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীরা একটি অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করার পর শুরু হলো আড্ডা। প্রথম রাউন্ড শেষে পুরুষদের বলা হলো পরের টেবিলে যেতে। কোনো একটি টেবিল থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। নিশ্চয়ই ভালো কোনো লক্ষণ।

আরেক টেবিলে দেখা গেল, এক যুগল উঠে দাঁড়িয়ে স্পনসর কোম্পানির দেওয়া কেক ও বিস্কুট নিচ্ছেন। ওই স্পনসর কোম্পানিগুলোর নামের শেষেও যুক্ত আছে সেই একই পদবি—সুজুকি।

শুধু সুজুকি নয়; ইতো, তানাকা ও জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদবি সাতো। সব পদবির মানুষদের নিয়েও একই ধরনের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

৩৪ বছর বয়সী নার্স হানা সুজুকি বলেন, ‘বিয়ের পর নিজের আগের নাম ধরে রাখার বিষয়ে আমার খুব একটা জেদ নেই। কিন্তু আরেকজন সুজুকির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই ব্যাপার আমার কাছে খুব মজার মনে হয়েছে।’

নামে কী এমন আসে যায়

পরিসংখ্যান বলছে, জাপানে বিয়ের পর প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের নাম বদলাতে হয়

জাপানের দেওয়ানি আইন বলছে, বিয়ের পর স্বামী–স্ত্রীকে অবশ্যই একই পারিবারিক নাম বা পদবি ব্যবহার করতে হবে। বিয়ের পর তাঁরা কার পদবি বেছে নেবেন, সে স্বাধীনতা তাঁদের আছে।

কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের নাম বদলাতে হয়। সমালোচকদের মতে, এটি জাপানের পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই একটি প্রতিচ্ছবি।

বাস্তবে অনেক নারীই কর্মক্ষেত্রে তাঁদের জন্মের সময় পাওয়া নাম বা বাবার নাম ব্যবহার করেন। আর সরকারি নথিপত্রে ব্যবহার করেন বিয়ের পরের পদবি।

যদিও সরকার পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো কাগজপত্রে বিয়ের আগের ও পরের উভয় নামই ব্যবহারের অনুমতি দেয়, তবুও বিশ্বে জাপানই একমাত্র দেশ, যেখানে স্বামী–স্ত্রীকে আইনিভাবে একই পদবি ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়।

এমনকি জাতিসংঘের নারী বৈষম্য দূরীকরণ কমিটিও জাপান সরকারকে এই আইন সংশোধন করে স্বামী–স্ত্রীর আলাদা পদবি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এই পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে। তাদের মতে, কোনো নারী কর্মী যদি বিদেশে এমন কোনো আইডি কার্ড ব্যবহার করেন, যার সঙ্গে তাঁর আইনি নামের মিল নেই, তবে তা আন্তর্জাতিক ব্যবসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

জাপানের শক্তিশালী ব্যবসায়ী লবি ‘কেইদানরেন’ এমন অনেক নারীর বক্তব্য সংগ্রহ করেছে, যাঁদের ক্যারিয়ার এই নিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্বে জাপানই একমাত্র দেশ, যেখানে স্বামী–স্ত্রীকে আইনিভাবে একই পদবি ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়

যেমন অনেক শিক্ষাবিদ বিয়ের আগের নামে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নাম বদলানোর কারণে পরে তাঁরা সেই কাজের যথাযথ স্বীকৃতি পান না। আবার অনেক উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় আইনি নামের জটিলতায় পড়েন।

কেইদানরেনের এক অভ্যন্তরীণ জরিপে দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ নারী নির্বাহী বিয়ের পর স্বামী–স্ত্রীর আলাদা পদবি ব্যবহারের অধিকারকে সমর্থন করেন।

‘আসুনিওয়া’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়েটিভ প্ল্যানার ইউকা মারুয়ামা বলেন, ‘জাপানে একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যাকে তুলে ধরতেই আমরা এই প্রজেক্ট শুরু করেছি। পদবি বদলাতে হবে, শুধু এই ভয়েই অনেক মানুষ এখন বিয়ে করতে দ্বিধা করছেন।’

ইউকা মারুয়ামা আরও বলেন, ‘আমরা খুব সাধারণ ও কিছুটা মজার একটি ধারণা মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। যাঁরা আগে থেকেই একই পদবি ব্যবহার করছেন, তাঁদের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এর মাধ্যমে আমরা মূল সমস্যাটিকে মানুষের কাছে আরও দৃশ্যমান ও সহজবোধ্য করতে চেয়েছি।’

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইছি

কিন্তু জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক সরকার আইন পরিবর্তনের এই বিষয়টি বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। বিশেষ করে রক্ষণশীল নেতারা এর তীব্র বিরোধিতা করছেন।

তাঁদের যুক্তি হলো, আঠারো শতকের শেষের দিকে প্রণীত এই দেওয়ানি আইন সংশোধন করলে তা ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করবে এবং শিশুদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই আইন পরিবর্তনের বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। এর বদলে তিনি সরকারি কাগজপত্রে জন্মের সময়ের নামের আইনি স্বীকৃতি বাড়ানোর একটি বিল সমর্থন করছেন।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই আপস নারীদের সেই বিভ্রান্তি দূর করতে পারবে না। বেশির ভাগ নারীকেই পরিস্থিতি অনুযায়ী দুটি আলাদা নাম ব্যবহার করতে হয়।

মজার ব্যাপার হলো, তাকাইচি তাঁর প্রথম বিয়ের সময় স্বামী ইয়ামামোতোর পদবি গ্রহণ করেছিলেন। ২০১৭ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০২১ সালে তাঁরা যখন আবার বিয়ে করেন, তখন তাঁর স্বামী আনুষ্ঠানিকভাবে তাকাইচি পদবি গ্রহণ করেন।

এই রক্ষণশীল নেত্রী সম্প্রতি আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, তিনি স্বামী–স্ত্রীর আলাদা পদবি ব্যবহারের বিরোধী। এর চেয়ে তিনি নিজের মতো করে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে আগের নাম ব্যবহার করাকেই বেশি পছন্দ করেন। তাঁর মতে, ‘পারিবারিক নিবন্ধনে স্বামী–স্ত্রী ও তাঁদের সন্তানদের একই পদবি থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

একটি নিরাপদ বিকল্প

ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কারণে এই ম্যাচমেকিং বা ঘটকালির আয়োজকেরা অনুষ্ঠান শেষে যুগলদের আর খোঁজখবর নেন না। তবে সেদিনের অনুষ্ঠানে আসা অনেকেই বেশ খুশি ছিলেন।

৩৩ বছর বয়সী চাকরিজীবী তাইশো সুজুকি বলেন, ‘আমি এর আগেও ম্যাচমেকিং পার্টিতে গিয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, এই আয়োজন বেশ অন্য রকম হবে। আরেকজন সুজুকিকে বিয়ে করার বিষয়ে আগে কখনো ভাবিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, এটি সত্যিই একটি নিরাপদ বিকল্প। বিয়ের পর আমার নিজের পদবি ছাড়তে চাই না। জানি, অনেক নারীও তাঁদের নামের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই অনুভব করেন।’

একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে ২০ ও ৩০–এর কোঠায় থাকা আড়াই হাজার মানুষের ওপর সম্প্রতি একটি জরিপ চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী ও ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ নিজেদের পদবি পরিবর্তনের বিষয়ে অনাগ্রহী। আবার ৭ শতাংশের বেশি মানুষ বলেছেন, দুজনের কেউ যদি পদবি বদলাতে রাজি না হন, তবে তাঁরা সম্পর্কটাই ভেঙে দেবেন!

জাপানে এক জরিপে দেখা যায়, ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী ও ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ নিজেদের পদবি পরিবর্তনের বিষয়ে অনাগ্রহী

সেদিনের অনুষ্ঠানে তাইশো ও তাঁর নারী সঙ্গী নিজেদের এই সাধারণ পদবিটিকে আড্ডার শুরুর বিষয় হিসেবে দারুণভাবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা হাসতে হাসতে বলছিলেন, আগে যখন সরকারি অফিসে বা অপেক্ষমাণ কক্ষে সুজুকি বলে ডাকা হতো, তখন একসঙ্গে অনেক মানুষ সাড়া দিয়ে ফেলত! অবশ্য এখন টোকেন নম্বরের কারণে সেই সমস্যা আর নেই।

তাইশো বলেন, ‘এখন আমি ৩০–এর কোঠায়। আমার জীবনের অগ্রাধিকারগুলো বদলে গেছে। আমি এখন বিয়ে করে সন্তান নিতে চাই। যদি এমন কোনো নারীর দেখা পাই, যাঁর পদবিটা বেশ অদ্ভুত বা আনকমন, তবে বুঝব কেন তিনি তাঁর নামটা ধরে রাখতে চাইছেন। আমার মনে হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের দুজনকেই বসে কথা বলে কোনো একটা সমাধান বের করতে হবে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান