বাবার সঙ্গে লেখক
বাবার সঙ্গে লেখক

গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কোনো পুরস্কার নয়; আমার বাবা

বাবা দিবসে লিখেছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ফারহান আলম

আমার গল্পের শুরু ক্লাস সেভেনে।

একদিন বাবা খুব স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমাদের স্কুলে কি বিতর্ক হয়? সুযোগ পেলে অবশ্যই বিতর্ক করবে। বিতর্ক মানুষকে কথা বলতে শেখায়, ভালো বক্তা হতে শেখায়, নিজের চিন্তা প্রকাশ করতে শেখায়।’ সেদিন হয়তো বুঝতেও পারেননি, তাঁর বলা সাধারণ একটি বাক্য আমার জীবনের গতিপথ বদলে দেবে।

বক্তা, লেখক ও উপস্থাপক হিসেবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বিতর্ক, পাবলিক স্পিকিং এবং বিজনেস কেস কম্পিটিশনের বিভিন্ন মঞ্চে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে ৩০টির বেশি পুরস্কার পেয়েছি। তবে আমার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কোনো পুরস্কার নয়; আমার বাবা।

বাবা একজন ব্যবসায়ী। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেখেছি সেমিনার, মিটিং ও বিভিন্ন উপস্থাপনায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে, নেতৃত্ব দিতে এবং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে। নেতৃত্ব কী, তখন বুঝতাম না; শুধু বুঝতাম, একদিন আমিও বাবার মতো হতে চাই।

কিন্তু বাবার গল্পটা শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীর নয়; সংগ্রামেরও। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা তাঁর বাবাকে হারান। অল্প বয়সেই গ্রামের পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে চলে আসতে হয় ঢাকায়। সামনে ছিল অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও কঠিন বাস্তবতা। নবম শ্রেণি থেকেই তিনি ছোট ছোট ব্যবসা শুরু করেন নিজের পড়া চালিয়ে নেওয়া ও পরিবারকে সহায়তা করার জন্য। বহুবার ব্যর্থ হয়েছেন, বহুবার হোঁচট খেয়েছেন, কিন্তু কখনো হাল ছাড়েননি। আজ মানুষ তাঁকে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে দেখে, আর আমি দেখি সেই কিশোরটিকে, যে শোককে শক্তিতে, অভাবকে প্রেরণায় আর ব্যর্থতাকে শিক্ষায় পরিণত করেছিল।

সেই মানুষটিকেই ছোটবেলা থেকে অনুসরণ করেছি। তাঁর অনুপ্রেরণা থেকেই শুরু হয় আমার বিতর্কের যাত্রা। স্কুলজীবনে জাতীয় পর্যায়ের বিতার্কিক হিসেবে পথচলা শুরু করি। জিতেছি, হেরেছিও। জাতীয় পর্যায় ও টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নিয়েছি, বহু মঞ্চে কথা বলেছি। প্রতিটি পরাজয় আমাকে আরও প্রস্তুত করেছে, আর প্রতিটি সাফল্য আরও দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছে।

আজ মনে হয়, যদি সেদিন বাবা আমাকে সেই কথাটা না বলতেন, তাহলে হয়তো আমি কখনো বিতর্কের জগতে পা রাখতাম না, আর আজকের আমি হয়ে ওঠাও সম্ভব হতো না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ব্যবসার জগৎকে জানার সিদ্ধান্ত নিই। বিবিএ পড়ার পেছনেও ছিল বাবার প্রভাব। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখে শিখেছি যে ব্যবসা শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়; এটি ধৈর্য, সততা ও দায়িত্বেরও শিক্ষা। সেই শিক্ষা থেকেই বিজনেস কেস কম্পিটিশনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। গত দুই বছরে জাতীয় পর্যায়ে ১৪টির বেশি বিজনেস কেস কম্পিটিশনে পুরস্কার পেয়েছি সেই সুবাদেই।

তবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনো ট্রফি নয়। সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো প্রতিটি অর্জনের পর বাবার চোখে দেখা গর্ব। যখন কোনো নতুন সাফল্যের খবর তাঁকে দিই, তাঁর হাসিতে আমি তৃপ্তি, আশীর্বাদ আর নিঃশব্দ ভালোবাসা খুঁজে পাই। সেই ভালোবাসাই নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।

আজ বাবা দিবসে আমার সব অর্জন, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা সেই মানুষটির জন্য, যিনি আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম নেতা এবং প্রথম নায়ক।

আমার বাবা।