শুরুতে লোকের মুখে মুখে নাম ছিল ব্যাগের মার্কেট বা লেদার মার্কেট, আর এখন সবাই বলে লাগেজ মার্কেট। বিদেশি লাগেজের পাশাপাশি এই মার্কেট দেশি ব্র্যান্ডের লাগেজও বিক্রি হয়।
‘শুরুতে লোকের মুখে মুখে নাম ছিল ব্যাগের মার্কেট বা লেদার মার্কেট, আর এখন সবাই বলে লাগেজ মার্কেট,’ বলছিলেন ডালাস লেদারের স্বত্বাধিকারী মিয়া ফয়সাল আহমেদ। সাশ্রয়ী দামে টেকসই ও নানা ডিজাইনের লাগেজ কিনতে বায়তুল মোকাররমের এই লাগেজ মার্কেট হতে পারে দারুণ একটি গন্তব্য। বর্তমানে এই মার্কেটে আছে ৫০টির মতো দোকান।
জানা যায়, ১৯৬৮ সালের দিকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটকে কেন্দ্র করে শুরু হয় লাগেজ বা ট্রাভেল ব্যাগের ব্যবসা। আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার একটা জোয়ার ওঠে, আর তখন থেকেই জমে ওঠে এই বাজার। সে সময় বিদেশগামী বা প্রবাসীদের প্রধান ভরসা ছিল ভারী লোহার ট্রাংক কিংবা ‘ভিআইপি’ ব্র্যান্ডের শক্ত প্লাস্টিকের স্যুটকেস।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি হাতল দেওয়া ভারী স্যুটকেসের জায়গা নেয় চাকাওয়ালা হালকা গড়নের আধুনিক ট্রলি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমদানি করা বিদেশি লাগেজের পাশাপাশি এই বাজারে দেশি ব্র্যান্ডের লাগেজও বিক্রি হতে শুরু করে।
বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটের উত্তর বা দক্ষিণ গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়বে চার চাকার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত রঙিন ট্রলি ব্যাগ। লাল, নীল, চকলেট কিংবা নিয়ন গ্রিন—হরেক রঙের লাগেজের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। বর্তমানে বাজারে মূলত দুই ধরনের উপকরণের লাগেজ বেশি চলছে বলে জানান তাঁরা।
পলি কার্বোনেটের তৈরি ওয়াটারপ্রুফ ফাইবার লাগেজের চাহিদাই এখন সবচেয়ে বেশি। এর ভেতরে জিনিসপত্র একদম সুরক্ষিত থাকে। অবশ্য ক্ল্যাসিক্যাল ফেব্রিক বা কাপড়ের ট্রলি ব্যাগের কদরও কমেনি। যাঁরা ব্যাগের ভেতরে একটু ‘এক্সট্রা স্পেস’ বা বাইরে বাড়তি পকেট পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে এটিই প্রথম পছন্দ।
ভ্রমণের দিনসংখ্যা, যাতায়াতের মাধ্যম এবং সঙ্গে নেওয়া আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের ওপর ভিত্তি করে লাগেজ কেনা ভালো বলে জানান বিক্রেতারা।
তিনটি স্ট্যান্ডার্ড সাইজের লাগেজ বা ট্রলি ব্যাগের উপস্থিতি চোখে পড়ল।
ছোট বা কেবিন সাইজ (২০ ইঞ্চি): ১ থেকে ৩ দিনের ছোটখাটো বিজনেস ট্যুর বা উইকেন্ড ট্রিপের জন্য এই আকারের লাগেজ আদর্শ। ধারণক্ষমতা সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ লিটার এবং এতে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ১০ কেজি ওজনের মালামাল নেওয়া যায়। এই লাগেজ ব্যাগগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা, বিমানে ভ্রমণ করলে নিজের সঙ্গে কেবিনে রেখেই যাতায়াত করা যায়।
মাঝারি সাইজ (২৪ ইঞ্চি): ৪ থেকে ৭ দিনের ট্যুর বা পারিবারিক ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় সাইজ। ধারণক্ষমতা প্রায় ৬০ থেকে ৭৫ লিটার এবং অনায়াসে ১৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত মালামাল প্যাক করা সম্ভব। বিমানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে এমন সাইজের লাগেজ সাধারণত বুকিং বা ‘চেক-ইন’ কাউন্টারে জমা দিতে হয়।
বড় সাইজ (২৮ থেকে ৩২ ইঞ্চি): ১ সপ্তাহের বেশি দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণ, হানিমুন, কিংবা পড়াশোনা ও চাকরির সুবাদে যাঁরা দীর্ঘদিনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, তাঁদের জন্য এমন সাইজের লাগেজ উত্তম। ধারণক্ষমতা ১০০ থেকে ১২০ লিটার বা তার বেশি। এয়ারলাইনসের নিয়ম অনুযায়ী, এই ব্যাগগুলোতে ২৩ থেকে ৩২ কেজি পর্যন্ত মালামাল নেওয়া সম্ভব।
এই মার্কেটে যেমন রয়েছে বিশ্বখ্যাত স্যামসোনাইট, আমেরিকান ট্যুরিস্টার, ডেলসি, কিংবা প্রেসিডেন্টের মতো প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের লাগেজ; তেমনি আছে এলিগ্যান্ট, অরনেট, ট্রাভেল কার, আরিয়ান, ডেলটা, ফরচুন, ম্যাক্স, উইনার, ট্রাভেলোসহ দেশি-বিদেশি অনেক ব্র্যান্ডের লাগেজ। বাজার ঘুরে ঘুরে দেখেশুনে ক্রেতারা বেছে নিতে পারেন তাঁদের পছন্দসই লাগেজটি।
কাপড়ের চেয়ে ফাইবারের লাগেজের দাম তুলনামূলক একটু বেশি। কাপড়ের তৈরি লাগেজ পাওয়া যাবে আড়াই হাজার থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে। আর ফাইবার লাগেজ পাবেন ৩ হাজার থেকে শুরু করে ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত।
ব্র্যান্ড ও মানভেদে দামের অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। প্রতিটি লাগেজেই থাকে কমপক্ষে দুই বছরের ওয়ারেন্টি। চাকা নষ্ট হওয়া, জিপার আটকে যাওয়া বা লকের পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া—যেকোনো সমস্যায় তাৎক্ষণিক সার্ভিসও মিলবে।
শুক্রবার এই মার্কেটের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন। অন্য দিনগুলোতে মার্কেট খোলা থাকে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বাস বা মেট্রোরেল যোগে খুব সহজেই আসতে পারবেন বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটে।
মেট্রোরেলে এলে ‘বাংলাদেশ সচিবালয়’ মেট্রো স্টেশনে নেমে পল্টন মোড় পার হয়ে সামান্য এগোলেই পেয়ে যাবেন কাঙ্ক্ষিত এই লাগেজ মার্কেটের দেখা।