
দিনটা ছিল ২৪ জানুয়ারি। সকাল নয়টার কিছু আগে রাজধানীর জিয়া উদ্যান থেকে ফিরছিলাম। সামনে চওড়া রাস্তা পার হতে হবে। গাড়ির চাপ একটু কমার আশায় ফুটপাতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি।
হঠাৎ চোখে পড়ল, আমার ঠিক পাশ থেকেই বৃদ্ধ এক দম্পতি রাস্তায় নেমে পড়লেন। একবার ভাবলাম, তাঁদের সঙ্গে নেমে গেলে একসঙ্গেই রাস্তাটা পার হয়ে যাব। কিন্তু কী এক অজানা দ্বিধায় গেলাম না। ভাবলাম, একটু আস্তেধীরেই যাই।
আমার স্ত্রী রোজী প্রায়ই বলে, ‘হাসনাত, তোমার মধ্যে সব সময় অস্থিরতার ভাব।’
সেদিন তার সেই কথাটাও যেন অদৃশ্যভাবে আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল।
গাড়ির চাপ তখনো খুব একটা কমেনি। রাস্তার মাঝামাঝি গিয়ে আটকে গেলেন বৃদ্ধ দম্পতি। উল্টো দিক থেকে তখন গাড়ির গতি আরও বেড়ে গেছে। আমি ডান দিকে তাকিয়ে আছি কখন একটু ফাঁকা হবে।
ঠিক তখনই একটা বিকট শব্দ—ধম্ম…।
চোখ ফেরাতেই দেখি, আমার বাঁ পাশে একটু সামনে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন সেই দম্পতি। দৌড়ে গেলাম। হাত নেড়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু গাড়িগুলো না থেমে ছুটে চলেছে। কয়েকজন মোটরসাইকেলচালক থামলেন। ফুটপাত থেকেও আরও কয়েকজন এগিয়ে এলেন।
আমরা তিনজন মিলে বয়স্ক লোকটাকে কোলে তুলে ফুটপাতে বসালাম। তিনি কথা বলতে পারছিলেন। মনে হলো, আঘাতটা খুব মারাত্মক নয়। বারবার শুধু একটা কথাই বলছিলেন তিনি, ‘আমার স্ত্রীকে দেখুন… আমার স্ত্রীকে…’
আমি দৌড়ে গেলাম ভদ্রমহিলার দিকে। তার আগেই কয়েকজন মানুষ সেখানে পৌঁছে গেছেন। কোথা থেকে যেন একটি মেয়ে ছুটে এল। সে নিজের মাফলার খুলে ভদ্রমহিলার মাথায় বেঁধে দিচ্ছে।
রাস্তায় তাকিয়ে শিউরে উঠলাম। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। আর একটু দূরে একদলা মাংসপিণ্ড পড়ে আছে। দেখে গা-টা কেঁপে উঠল। দুর্ঘটনায় আহত দুজনকে হাসপাতালে পাঠানো হলো।
হঠাৎ করেই মনে হলো, এই মানুষটার জায়গায় আমিও থাকতে পারতাম।
স্ত্রীর কথাটা আবার মনে পড়ল, ‘তোমার মধ্যে সব সময় অস্থিরতার ভাব।’
এই সতর্কতাই সেদিন হয়তো আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ওই বৃদ্ধ দম্পতির জন্য মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। একটু আগে প্রতিদিন যাঁদের সঙ্গে দৌড়াই, তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলেছি। সেই ছবিটাই হতে পারত আমার জীবনের শেষ ছবি।
জিয়া উদ্যানের এই রাস্তাটা খুবই চওড়া। প্রতিদিন সকাল-বিকেল স্বাস্থ্যসচেতন শত শত, কখনো হাজারো মানুষ এই রাস্তা পার হয়ে উদ্যানে যান। তাঁদের মধ্যে অনেক বয়স্ক মানুষও আছেন। অথচ এই রাস্তায় নেই কোনো জেব্রা ক্রসিং, নেই কোনো স্পিড ব্রেকার।
প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই রাস্তা পার হই আমরা। সোজা ও চওড়া হওয়ায় গাড়িগুলো এখানে প্রচণ্ড গতিতে চলে। বেগম খালেদা জিয়াকে এখানে সমাধিস্থ করার পর এখন বিএনপিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের মানুষের আনাগোনাও বেড়েছে।
জিয়া উদ্যানে প্রবেশপথগুলোয় যদি কয়েকটি স্পিড ব্রেকার বসানো হয়, তাতে ক্ষতি কী?
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আপডেট: হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহত সেই ভদ্রমহিলা ২৬ জানুয়ারি রাতে মারা গেছেন।