আইসল্যান্ডের বাড়িঘর
আইসল্যান্ডের বাড়িঘর

আইসল্যান্ড, পর্ব- ২

বিশ্বের প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক দেশে

বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গণতান্ত্রিক দেশ আইসল্যান্ড। সে কথায় পরে আসছি।
আইসল্যান্ডের ভূপ্রকৃতি একেবারে আলাদা, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন ভূপ্রাকৃতিক দৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। মসে আবৃত পাথুরে মাটি দ্বারা সৃষ্ট সমভূমি, এরপর বিভিন্ন ধরনের লেক, তারপর ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের পাহাড়, যেগুলো চক্রাকারে আবর্তিত হয়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে এরই মধ্যে খুঁজে পাবেন বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়গিরি কিংবা গ্যাসিয়ার। গ্যাসিয়ার হচ্ছে একধরনের বিশেষ প্রস্রবণ, যেখান থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর গরম পানি ও জলীয় বাষ্প নির্গত হয়। তবে কোনো ধরনের সুবিশাল বৃক্ষরাজির উপস্থিতি দেখা যায় না বললেই চলে। এককথায় বলতে গেলে, কোনো শিল্পী তাঁর নিপুণ হাতে আর রংতুলির আঁচড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অবয়বে দেশটিকে সাজিয়েছেন।

টারফ হাউজ নামে খ্যাত আইসল্যান্ডের ঘরবাড়ি সত্যি দৃষ্টিনন্দন

আইসল্যান্ড এ পৃথিবীতে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশগুলোর মধ্যে একটি। সবকিছুর দাম সেখানে আকাশছোঁয়া। সাধারণ কোনো রেস্টুরেন্টে এক বেলা নিতান্ত সাধারণ মানের খেলেও অনেক সময় ২০ ইউরো চলে যায়। যেহেতু আমি ছাত্র, তাই অপেক্ষাকৃত কম খরচে থাকার জন্য আগের থেকে বুকিং ডট কম ব্যবহার করে একটা হোস্টেল ভাড়া নিয়েছিলাম। থাকার জন্য প্রতি রাতে ভাড়া গুনতে হয়েছিল ২০ ইউরো।

রেইকইয়াভিকের সেন্টার থেকে এ হোস্টেলের দূরত্ব ছিল চার কিলোমিটারের মতো। হোস্টেলের ম্যানেজার ছিলেন একজন পাকিস্তানি, তাঁর নাম ছিল জাহিদ। তিনি স্টুডেন্ট ভিসায় পর্তুগালে এসেছিলেন। পর্তুগাল থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন, এরপর পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জাহিদ জানান, পর্তুগালে থাকার সময় তাঁর সঙ্গে আইসল্যান্ডের এক মেয়ের পরিচয় হয়, যিনি ট্যুরিস্ট হিসেবে পর্তুগালে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ভালো লাগা, এরপর একসময় ভালোবাসা এবং সবশেষে শুভ পরিণয়। পিএইচডি শেষ করার পর জাহিদ আইসল্যান্ডে চলে আসেন।

নীলাভ সবুজ আটলান্টিকের জলরাশির সঙ্গে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়, নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি এ ধরনের দৃশ্যের দেখা কেবল মিলবে আইসল্যান্ডে। রেইকইয়াভিক, আইসল্যান্ড

জাহিদ এখনো চান পাকিস্তানে ফিরে যেতে। তাঁর কথায়, তাঁর যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সেটা দিয়ে পাকিস্তানে অনায়াসে ভালো বেতনের কোনো চাকরিতে তিনি যোগ দিতে পারবেন এবং অত্যন্ত বিলাসী জীবন পার করতে পারবেন। কিন্তু পারিবারিক কারণে তিনি পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারছেন না; যদিও জাহিদ পর্তুগিজ পাসপোর্টধারী।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে জাহিদ আইসল্যান্ডের ভাষা শেখার কোর্স করছেন। তবে সুযোগ পেলে তিনি আইসল্যান্ড থেকে একটি পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করতে আগ্রহী। জাহিদকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আইসল্যান্ডে তাঁর পরিচিত কোনো বাংলাদেশি আছে কি না। জাহিদ আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, তাঁর সঙ্গে দুজন বাংলাদেশির পরিচয় হয়েছিল, যাঁরা আইসল্যান্ডে বসবাস করেন। তাঁদের কোনো তথ্য তিনি জানেন কি না জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, সচরাচর সেই দুজন বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা হয়, তেমনটি নয়। মাঝেমধ্যে জুমার নামাজ পড়তে গেলে মসজিদে তাঁদের সঙ্গে জাহিদের কথা হয়।

প্রায় চার হাজার বর্গমাইল আয়তনবিশিষ্ট আইসল্যান্ডে সাড়ে তিন লাখের কাছাকাছি মানুষের বসবাস, যাদের অর্ধেকের বাস আবার রাজধানী শহর রেইকইয়াভিকে। আইসল্যান্ডে এমন অনেক এলাকা রয়েছে, যেখানে মাইলের পর মাইল কোনো জনবসতি খুঁজে পাওয়া যাবে না। দেশটিতে এমনও অনেক এলাকা রয়েছে, যেখানে মানুষের পা পড়েনি কখনো। ইউরোপের অন্যান্য অনেক দেশে গণপরিবহন ব্যবহার করে প্রধান ট্যুরিস্ট স্পটগুলোয় যাতায়াত করা যায়। আইসল্যান্ডে সে সুবিধা সীমিত। এ ছাড়া রেইকইয়াভিক কিংবা সেলফসের মতো বড় শহরগুলোর বাইরে অন্য কোথাও কোনো কারণে পথ হারিয়ে ফেললে অনেক সময় বড় ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাই আইসল্যান্ড ঘুরতে হলে আপনাকে বিভিন্ন ট্যুর অপারেটিং কোম্পানির মুখাপেক্ষী হতে হবে। ইন্টারনেটের কল্যাণে ঘরে বসেই আপনি আইসল্যান্ডের বিভিন্ন ট্যুর অপারেটিং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ট্যুর বুক দিতে পারেন। আবার অনেক সময় আপনি আপনার হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ট্যুরের ব্যবস্থা করতে পারবেন। প্রথম দিন বিশ্রামের পর দ্বিতীয় দিন বেরিয়ে পড়ি পৃথিবীর উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এ দেশের স্বাদ উপভোগ করার জন্য।

আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকইয়াভিকের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থল পারলান হাউজের সামনে লেখক

আর্কটিক অ্যাডভেঞ্চার নামক একটি ট্যুর অপারেটিং কোম্পানি আছে, যাদের মাধ্যমে আমি প্রথম দিনের ট্যুর বুক করি। প্রথম দিনের এ ট্যুরে সব মিলিয়ে আমার ১৫০ ইউরোর মতো খরচ হয়েছে, ১৫০ ইউরোর এ ট্যুর প্যাকেজে আইসল্যান্ডের গোল্ডেন সার্কেলের চারটি স্পট ও নর্দার্ন লাইটস অন্তর্ভুক্ত ছিল। আইসল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত ট্যুরিস্ট স্পটগুলোকে সমন্বিতভাবে গোল্ডেন সার্কেল হিসেবে অভিহিত করা হয়।

আর্কটিক অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে আমাদের এ ট্যুরে প্রথম গন্তব্য ছিল থিংভ্যালির ন্যাশনাল পার্ক। আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকইয়াভিক থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এ পার্কের অবস্থান।

থিংভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের একাংশ

আইসল্যান্ডের মানুষের জীবনে এ থিংভ্যালির ন্যাশনাল পার্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। থিংভ্যালির ন্যাশনাল পার্ক দেশটির স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে পরিণত হয়। আইসল্যান্ডে প্রাচীনকাল থেকে মানবসভ্যতার অস্তিত্বের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। তার প্রমাণ থিংভ্যালির ন্যাশনাল পার্কে অবস্থিত দেশটির প্রাচীন পার্লামেন্ট ভবন। আইসল্যান্ডের স্থানীয় ভাষায় একে আলথিং নামে ডাকা হয়। আলথিং নির্মাণ করা হয়েছিল আনুমানিক ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এবং এখনো এ পার্লামেন্ট চালু রয়েছে। বছরের মাঝামাঝি একবার সেখানে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অনেকটা খোলা আকাশের নিচে এ পার্লামেন্ট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পার্লমেন্ট আলথিং

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যেও আইসল্যান্ডের নাম রয়েছে। ১৮১৪ সালে আইসল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে একটি উপনিবেশে পরিণত হলে এ পার্লামেন্টকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ১৯৪৪ সালে আইসল্যান্ড ডেনমার্কের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

নর্থ আমেরিকান এবং ইউরেশিয়ান প্লেট দুটি এ জায়গার মাঝ বরাবর প্রবাহিত হয়েছে। প্রতি বছর এরা পরস্পর থেকে ২.৬৭ সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে

আমরা ভূমিকম্প কিংবা সুনামির সময় যে ট্যাকটোনিক প্লেটের কথা শুনে থাকি, সে রকম ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে দৃশ্যমান ট্যাকটোনিক প্লেট এ থিংভ্যালির ন্যাশনাল পার্কে দেখতে পাওয়া যায়। এখানে এক মহাদেশীয় প্রবাহ নর্থ আমেরিকান এবং ইউরেশিয়ান নামক দুই প্লেটের মধ্যভাগ বরাবর প্রবাহিত হয়েছে। আর আগ্নেয়গিরিপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানে প্রচুর পর্যটকের সমাগম হয়। তত্ত্বীয়ভাবে তাই আইসল্যান্ড ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা এ দুটি মহাদেশের মধ্যে পড়েছে এবং প্রতিবছর এ ট্যাকটোনিক প্লেট দুটি পরস্পর থেকে ২ দশমিক ৬৭ সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে। ভৌগোলিকভাবে আইসল্যান্ডের গঠন এখনো চলমান এবং এ কারণে প্রায়ই দেশটিতে ভূমিকম্প দেখা দেয়। এ ছাড়াও এ স্থানে বেশ কিছু আগ্নেয়গিরির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু জলপ্রপাত।

আইসল্যান্ডের অন্যতম প্রসিদ্ধ লেক সিলফ্রার অবস্থানও এ ন্যাশনাল পার্কে। অনেকে এখানে স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য আসেন। এ ছাড়া নভেম্বর থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অনেকে থিংভ্যালিতে জড়ো হন আরোরা বা মেরুজ্যোতি দেখার জন্য।

ভোরের আলোয় আইসল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় হৃদ লেক সিলফ্রা

বলা বাহুল্য, থিংভ্যালির ন্যাশনাল পার্কটি এককথায় সমগ্র আইসল্যান্ডের সংক্ষিপ্ত ছবি। একদিকে এটি যেমন আইসল্যান্ডের প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক, অন্যদিকে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের কাছে এটি পরিপূর্ণভাবে আদর্শ একটি জায়গা। যে সময়ে আমি আইসল্যান্ডে বেড়াতে গিয়েছিলাম, সে সময় বলতে গেলে দিনের ২৪ ঘণ্টার প্রায় পুরোপুরি অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে, দুই কিংবা তিন ঘণ্টার জন্য সূর্যের আলো দেখা গেলেও তা তেমন একটা উজ্জ্বল ছিল না। পাশাপাশি আমি ছিলাম সলো ট্রাভেলার। এমন পরিস্থিতিতে ছবি তোলার বিষয়টি ছিল একটা বড় প্রতিবন্ধকতা। তারপরও আশপাশে যেসব পর্যটক পেয়েছি, তাঁদের অনুরোধ করতে হয়েছে একটা ছবি তোলার জন্য। এ রকম একটি পরিবেশে ছবি তুলতে পারার স্বাদ একেবারে আলাদা অনুভূতির সৃষ্টি করে।

আমাদের এ ট্যুরে যিনি গাইড হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁর নাম ছিল পিগি। অনেকের মতো আমারও আগ্রহ ছিল এ দেশটির নামকরণ নিয়ে। তাই তাঁকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলাম আইসল্যান্ড নামকরণটির পেছনের কারণ সম্পর্কে। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন যে আইসল্যান্ড দেশটির নামকরণের বিষয়ে কোনো সম্যক ধারণা লাভ করা যায় না। তবে একটা প্রচলিত কথা আছে, আনুমানিক নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে কোনো এক সময় নরওয়ের রাজা প্রথম হারল্যান্ডের দুঃশাসন থেকে বাঁচার জন্য একদল মানুষ আইসল্যান্ডে পাড়ি জমায়। তাদের মূলত এ ভূখণ্ডের প্রথম অধিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পিগি জানান, কৌশলগত কারণ হিসেবে তারা এ ভূখণ্ডের নাম রাখে আইসল্যান্ড, যাতে এ নামের কথা শুনলে তীব্র শীত আর তুষারপাতের ভয়ে কেউ এখানে কোনো ধরনের আগ্রাসনের চেষ্টা থেকে বিরত থাকে। যদিও পিগির মতে এ দাবির পেছনে পুরোপুরি সত্যতা নেই।

আইসল্যান্ডের ভাষা সম্পর্কে প্রচলিত মতবাদ হচ্ছে, আনুমানিক এক হাজার বছর আগে নরওয়ের ভাষা যেমন ছিল, আইসল্যান্ডের ভাষাও ঠিক তেমনই ছিল; যদিও বর্তমানে এ ভাষার দুটি উপভাষা সৃষ্টি হয়েছে। পিগি বলেন, আইসল্যান্ডের মাত্র ১১ শতাংশ ভূমি বরফে আবৃত।

থিংভ্যালিরের পর আমাদের গন্তব্য হলো গেইসির।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।