
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ম্যাগসম্যান’ নামে পরিচিত হোসাইন শরিফ। বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতে বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে ভিডিও তৈরি করেন। এই ‘নোম্যাড ট্রাভেলার’ বা ‘যাযাবর পর্যটক’ এশিয়ার শতাধিক শহরে কীভাবে কম খরচে ঘুরছেন, সেই গল্প শোনালেন সজীব মিয়াকে
দেশে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। ছুটিছাটা নিয়ে আগে ঘুরতে যেতাম। কিন্তু এতে ভ্রমণের তৃষ্ণা মেটেনি। তাই এ দফায় চাকরি ছেড়ে গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ ছেড়েছি। শুরু করেছিলাম থাইল্যান্ড ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। মাঝে এপ্রিলে ভিসা সংক্রান্ত কাজে বাংলাদেশে যেতে হয়েছিল। বর্তমানে মাসখানেক ফিলিপাইনে আছি। ঘুরতে ঘুরতে ভিডিও করছি।
ফেসবুকে আমার ভিডিও ও ছবির কমেন্টে যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি পাই, সেটা হচ্ছে-আপনি এত ঘোরেন কীভাবে? আরও সহজ করে বলতে গেলে, ঘোরাঘুরি করার মতো টাকা আমি কোথা থেকে পাই, এটা অনেকেই জানতে চান। সত্যি বলতে, ঘোরাঘুরির জন্য খুব বেশি টাকা খরচ করি না। তাহলে কীভাবে ঘুরি? জানাচ্ছি সেই গল্পই।
আমি ব্যাকপ্যাকার ট্রাভেলার। ব্যাকপ্যাকিং মানে হচ্ছে আমার একটা মাঝারি আকারের ব্যাগ থাকে। এই ব্যাগের মধ্যে থাকে আমার প্রয়োজনীয় জামাকাপড়, জুতা, ক্যামেরা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, টাকাপয়সা আর পাসপোর্ট।
এই ব্যাগ নিয়ে বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াই। এটায় অনেক স্বাধীনতা, আর খরচও কম হয়। যেকোনো জায়গায় থাকতে পারি, সহজে স্থান পরিবর্তন করতে পারি এবং স্থানীয়দের মতো জীবন যাপন করা যায়। এতে খরচ কমে, টাকা সাশ্রয় হয়।
আমি সব সময় হোস্টেলে থাকি। এটা অনেক সস্তা। সাধারণত একটি হোস্টেলে ৫ থেকে ৭ ডলারের মধ্যে এক রাত থাকা যায়। কোনো কোনো জায়গায় ৩ থেকে ৪ ডলারের হোস্টেলও পাওয়া যায়। একটি হোটেলে যেখানে ২০-২৫ ডলার খরচ হয়।
হোস্টেলে থাকলে অনেক ট্রাভেলারের সঙ্গে দেখা করতে পারি, যাঁরা আমার মতোই ব্যাকপ্যাকার এবং নানা দেশ থেকে আসেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলি, গল্প করি, অভিজ্ঞতা শেয়ার করি এবং তাঁদের কাছ থেকে শিখি। এভাবে নতুন নতুন জায়গা সম্পর্কে ধারণা পাই এবং পরবর্তী ভ্রমণের পরিকল্পনাও সহজ হয়।
বিদেশে এসে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি কিছু কাজ করা যায়; এতে আয় না হলেও থাকা-খাওয়া ফ্রি পাওয়া যায়। এটাকেই বলা হয় ভলান্টিয়ারিং।
আমি থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় হোস্টেলে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছি। কাজগুলো সাধারণত রিসেপশনে সাহায্য করা, গেস্ট চেক-ইন, তাঁদের সহায়তা করা, বিকেলে বা সন্ধ্যায় ঘুরিয়ে দেখানো, কিংবা গার্ডেনিংয়ে সাহায্য করা—এ ধরনের কাজ।
এতে থাকা-খাওয়ার খরচ বাঁচে, স্থানীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়।
আমি হিচহাইকিং করি। এর মানে হলো, এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার সময় রাস্তা থেকে কোনো গাড়ি থামিয়ে লিফট নেওয়া।
চালককে অনুরোধ করি, এই জায়গায় যাচ্ছি, আমাকে কি সেখানে নামিয়ে দিতে পারবেন? আমি কোনো টাকা দিতে পারব না। অনেক সময় তাঁরা রাজি হন।
এটি বিশ্বের অনেক দেশে জনপ্রিয় ভ্রমণপদ্ধতি। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকাসহ অনেক জায়গায় এটি প্রচলিত। এশিয়াতেও এটি করা যায়।
আমার নিজেরও হিচহাইকিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে। অনেক সময় এতে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, পরবর্তী সময়ে তাঁদের শহরে গিয়ে থেকেছি, এমনকি তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও সময় কাটিয়েছি।
আমি খুব ধীরে ভ্রমণ করি। সাধারণত পাঁচ দিনে পাঁচটা শহর না ঘুরে, এক শহরে এক থেকে দুই সপ্তাহ থাকি।
এতে শহরটি ভালোভাবে বোঝা যায়, স্থানীয়দের সঙ্গে মিশতে পারি, ভিডিও বানানোর সময় পাই এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। তখন হাঁটা বা লোকাল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে সহজেই ঘোরা যায়। ফলে খরচও কমে যায় এবং অভিজ্ঞতাও ভালো হয়।
ভ্রমণে গিয়ে অনেকে কেনাকাটা করেন, কিন্তু আমি সেটা এড়িয়ে চলি। কিছু কেনার আগে ভাবি—এটা কি সত্যিই দরকার? ব্যাগে জায়গা আছে কি?
দামি রেস্তোরাঁ, কফি শপ বা বার এড়িয়ে চলি। সাধারণত রাস্তার খাবার খাই বা হোস্টেলের কিচেনে রান্না করি এবং অন্যদের সঙ্গে খাবার শেয়ার করি।
আমি বেশি ফল, জুস আর সবজি খাই। এতে খরচ কমে এবং স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।
ভ্রমণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় টাকা নয়, মানুষ। আপনি যত মানুষের সঙ্গে মিশবেন, তত বেশি সাহায্য পাবেন। স্থানীয়রা আপনাকে পথ দেখাবে, তথ্য দেবে, সমস্যা হলে সাহায্য করবে। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে ভ্রমণ সহজ হয়। তাদের সংস্কৃতি, নিয়ম-কানুন সম্মান করলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও ভালো হয়।
অনেকে মনে করেন, ভ্রমণের জন্য অনেক টাকা লাগে। আমি বলব, টাকার প্রয়োজন আছে, কিন্তু খুব বেশি নয়। সবচেয়ে দরকার সাহস, পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা। অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান করতে পারলে এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে ভ্রমণ শুধু সহজই নয়, অনেক বেশি আনন্দদায়কও হয়।