
বাসে বা ট্রেনে যাওয়ার সময় অনেক শিশুর মাথা কেমন করে, নিস্তেজ হয়ে পড়ে, পেটের মধ্যে কেমন যেন করতে থাকে, কেউ হয়তো বমিই করে দেয়। এ ধরনের সমস্যাকে বলে ‘মোশন সিকনেস’।
শুরু হয়ে যাচ্ছে ঈদের ছুটি। ছোটদের কাছে ঈদের আসল মজা হলো মা বা বাবার সঙ্গে দাদাবাড়ি-নানাবাড়ি যাওয়া। কিন্তু এই আনন্দযাত্রা কষ্টকর হয়ে ওঠে, যদি শিশুটি যাত্রাপথে অসুস্থ হয়ে যায়। অনেক সময় কিছু দূর যেতে না যেতেই শিশুর মাথা কেমন করে, নিস্তেজ হয়ে পড়ে, পেটের মধ্যে কেমন যেন করতে থাকে, কেউ হয়তো ওয়াক করে বমিই করে দিল। এ ধরনের সমস্যাকে বলে ‘মোশন সিকনেস’।
দুই বছরের নিচের শিশুদের এ সমস্যা তেমন দেখা দেয় না। সাধারণত ৩ থেকে ১২ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি এ সমস্যায় ভোগে। মেয়েশিশুদের এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। যেসব শিশুর মোশন সিকনেস আছে, তাদের বাস, গাড়ি, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ বা যেকোনো যানবাহন চলার কিছু সময়ের মধ্যেই মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, বমি হয়ে যায়। এমনকি দোলনায় কিছুক্ষণ ঝুললেও এই সিকনেস হতে পারে। বেশির ভাগ সময়েই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যাগুলো কমে যায়।
কিছু শিশুর মস্তিষ্ক অন্যদের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল থাকে বলে মোশন সিকনেসের ঘটনা তাদের বেলায় বেশি ঘটে। প্রকৃত এবং প্রত্যাশিত গতির মধ্যে পার্থক্যের কারণে এই অসুস্থতা দেখা দেয়। সাধারণত যানবাহন চলতে অথবা দোলনা দুলতে শুরু করলে গতির সঙ্গে সঙ্গে অন্তঃকর্ণের এন্ডোলিম্ফ নামের তরল পদার্থ নড়াচড়া শুরু করে।
সেখান থেকে চলনশীলতার সংকেত যায় মস্তিষ্কে। কিন্তু চলন্ত অবস্থায় শিশুর দৃষ্টি গাড়ির ভেতরেই স্থির থাকে, তখন চোখ সংকেত দেয় স্থির আছি। ফলে মস্তিষ্ক, চোখ আর অন্তঃকর্ণের সংকেতের মধ্যে বিভ্রান্তিকর অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, যে কারণে এমন সংকেত সৃষ্টি হয় যে শিশুর বমিভাব হয়। গাড়ির ভেতরে আবদ্ধ বা ভ্যাপসা ভাব থাকলে এ সমস্যা আরও বেড়ে যায়। বেশির ভাগ সময়েই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাগুলো কমে যায়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে প্রায় সারা জীবনই এ সমস্যা থেকে যায়।
পেট গুলানো ভাব দিয়ে শুরু হয় মোশন সিকনেস, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘাম দিয়ে দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে বমি করে দিতে পারে শিশু। কখনো কখনো ঠিক কেমন লাগছে, ঠিকমতো বলতেও পারে না শিশু। অস্থির হয়ে কান্নাকাটি করে। অনেক সময় অতিরিক্ত বমি হয়ে পানিশূন্যতা, লবণপানির তারতম্যও দেখা দিতে পারে।
সাধারণত গাড়ি চলা বন্ধ হলে বমিভাব আর থাকে না। যাত্রাপথ বেশি দীর্ঘ হলে রাস্তায় মাঝে মাঝে যাত্রাবিরতি দিতে হবে।
যাত্রার শুরুতে শিশুকে হালকা খাবার দেওয়া যেতে পারে। ভারী পেট অথবা ক্ষুধা পেট, দুটোই বমি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ভ্রমণের সময় এমনভাবে ঠিক করতে হবে, যেন শিশু ঘুমিয়ে থাকতে পারে। যতক্ষণ সে ঘুমিয়ে থাকবে, ততক্ষণ তার মোশন সিকনেস হবে না অথবা জেগে গেলেও তুলনামূলক কম ক্লান্তি লাগবে।
মোশন সিকনেসের অস্বস্তিকর অনুভূতি থেকে শিশুর মনোযোগ সরানোর জন্য তার সঙ্গে গল্প করা যেতে পারে, গান শোনানো যেতে পারে।
জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখানো যেতে পারে। এতে শিশু আনন্দিত হবে, মোশন সিকনেসও কিছুটা কমবে।
অনেকের ক্ষেত্রে বই, পত্রিকা ইত্যাদি পড়তে থাকলে বমি বমি ভাব বা বমি হওয়ার আশঙ্কা বেশি হয়, সে ক্ষেত্রে যাত্রাপথে এ অভ্যাস পরিহার করাই ভালো।
গাড়ির ভেতরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা মোশন সিকনেস কমাতে ভূমিকা রাখে। তাই বমিভাব লাগলে জানালাটা খুলে দিলেও ভালো লাগবে।
ধীরে ধীরে শিশুকে বারবার ভ্রমণ করিয়ে সহনশীলতা তৈরি করতে হবে।
এগুলোর কোনোটাই যদি কাজে না আসে তবে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কাঁধে হেলান দিয়ে বা কোলে মাথা রেখে শুইয়ে দেওয়া যেতে পারে। ঘুম ঘুম ভাব কিছুটা উপকারে আসতে পারে।
বেশ কিছু ওষুধ আছে, এ সমস্যায় বেশ কার্যকর। যদি আগে থেকেই জানা থাকে শিশুর মোশন সিকনেস আছে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যাত্রার সময় ওষুধ ব্যাগে রাখাই শ্রেয়। যদিও ওষুধগুলো ওভার দ্য কাউন্টার ড্রাগ হিসেবে সহজলভ্য, তবু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে দেওয়াই ভালো।