‘পাহাড়ে ও সমতলে’ বইয়ের পাঠোন্মোচন উপলক্ষে আলোচনা ও আড্ডার আয়োজনে কথা বলছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
‘পাহাড়ে ও সমতলে’ বইয়ের পাঠোন্মোচন উপলক্ষে আলোচনা ও আড্ডার আয়োজনে কথা বলছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

‘এ বয়সে পাগল না হলে কেউ পর্বতারোহণে যায়?’

পর্বতারোহণের জন্য বয়স যে কোনো বাধা নয়, তা প্রমাণ করে চলেছেন ইফতেখারুল ইসলাম। তাঁর বয়স ৭০ ছুঁই ছুঁই, কিন্তু তিনি বারবার যাচ্ছেন হিমালয়ের দুর্গম পথে দুঃসাহসী অভিযাত্রায়। এ পর্যন্ত হিমালয়ের আটটি ট্রেক সম্পন্ন করেছেন, আফ্রিকার সর্বোচ্চ উচ্চতার কিলিমানজারোসহ তাঁর অভিযাত্রায় ট্রেকিংয়ের সংখ্যা ৯টি। ভ্রমণপিয়াসি মানুষটি সমতলেও প্রচুর ঘোরেন। এই দুই প্রকার ভূগোলে তাঁর অভিযাত্রা ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতার বিবরণ তিনি তুলে এনেছেন ‘পাহাড়ে ও সমতলে’ বইতে। এতে পাহাড়ের অভিযাত্রা ৪টি, আর সমতলের ভ্রমণ ১১টি—মোট ১৫টি ভ্রমণ সংকলিত হয়েছে। সংখ্যায় কম হলেও পাহাড়ের ৪টি অভিযানের বিবরণ পৃষ্ঠাসংখ্যায় সমতলের ১১টি ভ্রমণের সমান। আয়তনের হিসাবে এই বইকে পাহাড় ও সমতলের মধ্যে সমান দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘পাহাড়ে ও সমতলে’–এর পাঠোন্মোচন উপলক্ষে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ক্যাফেটেরিয়ায় আলোচনা ও আড্ডার আয়োজন করা হয়। সাতটা নাগাদ ক্যাফেটেরিয়াটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠলে সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ তাঁর স্বভাবসুলভ ঘরোয়া মেজাজ আর পরিহাসপ্রবণতা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, আড্ডা চলছিল সাড়ে ছয়টা থেকেই। তখনো অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বলি আর আড্ডার প্রধান আকর্ষণ বলি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ রাজধানীর প্রচলিত ট্রাফিক জ্যাম উজিয়ে সভাস্থলে এসে পৌঁছাতে পারেননি।

বারবার পাহাড় অভিযানে গিয়ে ইফতেখারুল ইসলাম সতীর্থ–বন্ধুদের কাছে ‘পাহাড়ি ভাই’ উপাধি পেয়েছেন। সূচনা বক্তব্যে এ প্রসঙ্গে বলেন, এতে তিনি সম্মানিত বোধ করেন, যদিও নিজেকে তাঁর ‘পর্বতারোহী’ বলে মনে হয় না, মনে হয় ‘সৌখিন পর্বতপ্রেমী’। তাঁর পাহাড় অভিযাত্রার প্রধান অনুপ্রেরণাদাতা হলেন পাখিবিশেষজ্ঞ, অভিযাত্রী, সংগঠকসহ বহু পরিচয়ে বিখ্যাত ইনাম আল হক।

লেখকের একজন শৈশবের সহপাঠী বন্ধু খালিদ হাসান বলেন, ইফতেখারুল ইসলামের পবর্তারোহণ তিনিসহ বাকি সহপাঠীদের বিপদে ফেলেছেন। কারণ, ইফতেখারুল হিমালয়ে চড়ছেন আর বাকিদের দোতলায় উঠতেও কষ্ট হচ্ছে!

বদিউদ্দিন নাজির বলেন, ‘আগে ইফতেখারুল ইসলামের লেখা খটোমটো লাগত, কিন্তু এখন সাবলীল লাগে।’

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, ইফতেখারুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ৬৩ বছর বয়সে। তাঁদের একত্র করেছেন ইনাম আল হক আর হিমালয়। পরে একসঙ্গে গিয়েছিলেন এভারেস্টের বেজক্যাম্পেও। তিনি সেই পথযাত্রা ও অভিযানের বিবরণ দিলেন।

কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক ইফতেখারুল ইসলামকে কয়েকটি বিশেষণে―‘ভালো মানুষ’, সুন্দর মানুষ’, স্নিগ্ধ মানুষ’―বলে অভিষিক্ত করলেন। স্নেহ থেকেই স্নিগ্ধতা। ততক্ষণে হলঘরে এসে পৌঁছেছেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি শুধালেন, ‘স্নেহ বাদ দিলে কী হয়?’ আনিসুল হক বলেন, ‘আমিও ভ্রমণ করি, কিন্তু কী এমন দুঃখ যে হিমালয়ের বরফের ভেতরে গিয়ে বসে থাকতে হবে?’

ইফতেখারুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর অনেকগুলো মিল আছে, যার একটি হলো জাদুঘর পরিদর্শন।

লেখক ও গবেষক চৌধুরী মুফাদ আহমেদ বলেন, এ যুগে ভ্রমণকাহিনি লেখা খুব চ্যালেঞ্জিং, কেননা আগে বেশির ভাগ পাঠকের সাধ্য ছিল না দূর দেশে যান এবং স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন। আজকের যুগে এত বেশি ছবি আর ডকুমেন্ট পাঠকের নাগালে যে ঘরে বসেই দেখে নিতে পারেন। তাই প্রয়োজন ভ্রমণলেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ, চাই দেখার তীক্ষ্ণ ও মৌলিক চোখ।

‘পাহাড়ে ও সমতলে’ বই নিয়ে কথা বলছেন কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক

সবাই উন্মুখ হয়ে ছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথা শোনার জন্য। তিনি বলেন, নিজেকে দেখার জন্য যেমন আয়না লাগে, তেমনি লেখকের আয়না হলো পাঠক। প্রিয় ছাত্র ইফতেখারুল ইসলামের পর্বতারোহণের ঝোঁককে পরিহাস করে বললেন, ‘এ বয়সে পাগল না হলে কেউ পবর্তারোহণে যায়?’ তিনি ইফতেখারুল ইসলামের বই পড়ার অভ্যাসের প্রশংসা করতে গিয়ে কাজী আবদুল ওয়াদুদের বই পড়ার স্মৃতি উল্লেখ করলেন।

‘পাহাড়ে ও সমতলে’ বইটির ভাষার প্রশংসা করে তিনি বলেন, এর ভাষা সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত। ইফতেখারুল ইসলামের ভাষায় একটা লাবণ্য আছে, রযেছে লালিত্য, যা ছবিটি সমুখে এনে দাঁড় করায়। আলাদা ভাষা রপ্ত করতে হলে আলাদা মানুষ হতে হয়। লেখার স্টাইল হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না।

রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণকাহিনির উদাহরণ টেনে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ইফতেখারুল ইসলামকে পরামর্শ দিলেন তাঁর লেখায় যে দেশে ভ্রমণে গেছেন, সেই দেশটিকে আরও প্রাধান্য দিতে। তাঁর লেখায় অভিযাত্রীদের যত দেখা যায়, দেশটিকে তত দেখা য়ায় না। রবীন্দ্রনাথ ‘রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থে রাশিয়ার শিক্ষা ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রসার নিয়ে লিখেছেন। ‘জাপান যাত্রী’-তে রয়েছে জাপানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব বর্ণনা। ভ্রমণকাহিনি সফল হতে হলে বাড়তি কিছু একটা থাকতেই হবে। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ বইটিতে যদি আবদুর রহমানের গল্পটি না থাকত, তাহলে বিপুল সুখ্যাতি ছড়াত না। প্রবোধকুমার সান্যালের ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ এত বিখ্যাত হতো না যদি শেষের প্রেমকাহিনিটি তাতে না থাকত।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ইফতেখারুল ইসলামের লেখায় একটি ক্রমোত্তরণ দেখে আশান্বিত। গুরু যেভাবে আশীর্বাদ দেন, সেভাবে বললেন, ‘তুমি লেখক হচ্ছ।’ স্বভাবসিদ্ধ কৌতুক করে বললেন, ‘তুমি এখনো (পর্বত থেকে) নামোনি।’