
একটু পরিকল্পনা করলে সিউল, বুসানসহ দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক দর্শনীয় স্থান তুলনামূলক বাজেটের মধ্যেই ঘুরে দেখা সম্ভব। খরচ বাঁচিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণের ১০টি কার্যকর টিপস দিয়েছেন সম্প্রতি ঘুরে আসা জুনায়েদ আজিম চৌধুরী
আপনি চাইলে নিজেই ৫ হাজার টাকার মধ্যে অফিশিয়াল ভিসা ফিসহ দক্ষিণ কোরিয়ার পুরো ভিসাপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন। এই কাজের জন্য ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বাড়তি সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ নিয়ে থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ভিসা পোর্টালে (www.visa.go.kr) ই-ফরম পূরণ করে সেটি প্রিন্ট করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ঢাকায় দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাসে জমা দিতে হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গত তিন বছরের ট্যাক্স রিটার্ন পেপার, যা কোরিয়ার ভিসার জন্য বাধ্যতামূলক।
বর্তমানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তাই পূরণ করা ফরম ও প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র গুছিয়ে যেকোনো কার্যদিবসে লাইনে দাঁড়িয়ে ভিসার আবেদন জমা দেওয়া যায়। একই দিনে ভিসা ফিও পরিশোধ করতে হয়। এরপর ভিসা প্রসেসিং শেষ হলে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত ৩ থেকে ১৫ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়া ভ্রমণের সবচেয়ে বড় খরচগুলোর একটি হলো উড়োজাহাজের ভাড়া। সাধারণত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ২ থেকে ৪ মাস আগে বুক করলে সবচেয়ে ভালো ভাড়া পাওয়া যায়। শেষ মুহূর্তে টিকিট কাটতে গেলে অনেক সময় বেশি দাম গুনতে হয়। ঢাকা থেকে সিউল রুটের ক্ষেত্রে মার্চ-এপ্রিলের চেরি ব্লসম মৌসুম কিংবা অক্টোবর-নভেম্বরের শরতের সময়ে টিকিটের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এই পিক সিজনে রিটার্ন টিকিটের দাম ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হয়ে যায়। অন্যদিকে অফ সিজনে এই টিকিট প্রায় ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস, চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনস বা এয়ার চায়নার মতো এয়ারলাইনসে।
তাই ভ্রমণের সময় একটু পরিকল্পনা করে বেছে নিলে এবং পিক সিজন এড়িয়ে চললে বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।
রাজধানী শহর সিউলে চিন্তামুক্ত ও কম খরচে ঘুরতে সবচেয়ে দরকারি সঙ্গী হতে পারে ‘ডিসকভার সিউল পাস’। এই কার্ডের মাধ্যমে ইনচন বিমানবন্দর থেকে সিউল শহরে আসার জন্য AREX ট্রেন বা K-Limousine বাসের ওয়ানওয়ে যাত্রা, সিউলের ৭০টিরও বেশি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে ফ্রি প্রবেশ, এমনকি পুরো সময়ের জন্য আনলিমিটেড হাইস্পিড ইন্টারনেট সুবিধাও পাওয়া যায়। অর্থাৎ সিউল শহর ঘোরার অল-ইন-ওয়ান ট্রাভেল সলিউশন। ভ্রমণে যাওয়ার আগে অনলাইনে www.discoverseoulpass.com বা www.klook.com থেকে ৩ থেকে ৫ দিনের প্যাকেজ কিনে নেওয়া যায়। সুবিধাভেদে খরচ পড়তে পারে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ১১ হাজার টাকার মধ্যে (এক টাকায় ১২.১২ কোরীয় ওন)।
এ ছাড়া এতে থাকে গণপরিবহনে যাতায়াতের ‘ক্লাইমেট কার্ড’ সুবিধা, যেখানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকার মতো রিচার্জ করলেই টানা ৫ দিন আনলিমিটেড সাবওয়ে ও সিটি বাস ব্যবহার করা যায়। একই কার্ডে সিউলের জনপ্রিয় পাবলিক বাইক সার্ভিসও ব্যবহার করা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এলাকা হলো মিয়ং-ডং। এখান থেকে বিমানবন্দরসহ বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থানে সহজে যোগাযোগ করা যায়। এই সুবিধার কারণে হোটেল ভাড়াও তুলনামূলক বেশি। বাজেট বাঁচাতে চাইলে হংডে এলাকা বেছে নিতে পারেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ট্রেন আছে, পাশাপাশি ক্যাফে, স্ট্রিট ফুড ও নাইটলাইফও দারুণ। আর ক্লাইমেট কার্ড নিলে মেট্রো ও সিটি বাস ব্যবহার করে সহজেই ঘুরে দেখতে পারবেন শহরের জনপ্রিয় স্পটগুলো। এ ছাড়া ডংডাইমুন এলাকাও কম খরচে থাকার জন্য ভালো অপশন। আর বুসানে বিচের কাছে থাকতে চাইলে হেউন্ডে বিচ ভালো অপশন। তবে আরও বাজেট-ফ্রেন্ডলি থাকার জন্য সোমইয়ন এলাকা বেশ সুবিধাজনক।
বিদেশভ্রমণে ছোট ছোট খরচই অনেক সময় বড় বাজেটে পরিণত হয়। আর এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ একটি খরচ হলো খাওয়ার পানি। দক্ষিণ কোরিয়ার বেশির ভাগ হোটেল, মেট্রোস্টেশন ও বিভিন্ন পাবলিক স্থানে ফ্রি ওয়াটার ডিসপেনসারের ব্যবস্থা থাকে। তাই সঙ্গে একটি রিইউজেবল পানির বোতল রাখলে সহজেই পানি রিফিল করে নেওয়া যায়।
এদিকে সাধারণ কোনো রেস্টুরেন্টে এক বেলা খাবার খেতে প্রায় ১৫ থেকে ৩০ হাজার কোরীয় ওন (প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা) পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে স্ট্রিট ফুড মার্কেটগুলোয় অনেক কম খরচে দারুণ সব কোরীয় খাবার পাওয়া যায়। সিউলের মিয়ংডং, হংডে কিংবা বুসানের বিভিন্ন স্ট্রিট মার্কেটে ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার ওনের মধ্যেই অনেক জনপ্রিয় খাবার পাওয়া যায়। পথের খাবারের দোকানগুলোয় রান্না থেকে পরিবেশন পর্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়।
এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দ্রুত মাধ্যম হলো কোরিয়া ট্রেন এক্সপ্রেস (কেটিএক্স) বুলেট ট্রেন। এটি খুবই দ্রুত ও আরামদায়ক হলেও ভাড়া তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে এক্সপ্রেস বাসে একই গন্তব্যে অনেক কম খরচে যাওয়া সম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সপ্রেস বাসগুলোও বেশ আরামদায়ক, পরিষ্কার এবং সময়নিষ্ঠ। তাই বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য এটি একটি দারুণ বিকল্প।
আবার দেশটিতে ট্যাক্সি তুলনামূলকভাবে বেশ ব্যয়বহুল, বিশেষ করে রাতে বা দূরের রুটে গেলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। তাই প্রতিদিন ট্যাক্সি ব্যবহার করলে ট্রিপের বাজেট দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সিউল ও বুসানের মেট্রো এবং সিটি বাস সিস্টেম খুবই আধুনিক, পরিচ্ছন্ন এবং সময়ানুবর্তী। প্রায় সব ট্যুরিস্ট স্পটেই সহজে মেট্রো বা বাসে যাওয়া যায়। স্টেশনগুলোয় ইংরেজি সাইন ও রুটম্যাপ থাকায় বিদেশি পর্যটকদের জন্য চলাচল অনেক সহজ।
রিটেইল চেইনশপ ডাইসো–তে খুব কম দামে প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়। বেশির ভাগ পণ্যের দাম সাধারণত ১ হাজার থেকে ৫ হাজার কোরীয় ওনের মধ্যেই থাকে, তাই অল্প বাজেটেও ট্রাভেল আইটেম, চার্জার অ্যাডাপ্টর, ছাতা, পানির বোতল, স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট, স্টেশনারি বা ছোটখাটো সুভেনিরসহ অনেক কিছু কেনা সম্ভব।
ঘোরাঘুরির সময় অনেকেই প্রতিদিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যান, এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। তাই কাছাকাছি জায়গাগুলো একদিনে একসঙ্গে ঘোরার চেষ্টা করুন। যেমন মিয়ংডং, নামসান ও ডোংডেমুন একই দিনে দেখা যায়, আবার হংডে ও ইটেওনও কাছাকাছি। এতে লম্বা দূরত্বের যাতায়াত কমে, খরচ বাঁচে এবং অল্প সময়ে বেশি জায়গা ঘোরা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় অনেক সুন্দর জায়গা একদম ফ্রিতেই ঘোরা যায়। সিউলের হ্যান রিভার পার্কে নদীর পাশের দারুণ ভিউ উপভোগ করা যায়, আর নামসান পার্ক এলাকার হাঁটার পথে শহরের সুন্দর স্কাইলাইন দেখা যায়। বুসানের গামচিওন কালচার ভিলেজের আশপাশের ভিউ পয়েন্ট এবং সমুদ্রপাড়ের অনেক ওয়াকওয়েও একদম ফ্রি ঘোরা যায়। এসব জায়গা ঘুরলে খরচ কমে, আবার স্থানীয় পরিবেশ ও কোরীয় শহুরে জীবন কাছ থেকে উপভোগ করা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘুরতে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোর একটি হলো সঠিক ম্যাপ ও ট্রান্সপোর্ট অ্যাপ ব্যবহার। গুগল ম্যাপস অনেক সময় পুরোপুরি নির্ভুল রুট দেখাতে পারে না। তাই স্থানীয় লোকজন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে Naver Map। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ম্যাপ অ্যাপগুলোর একটি। রিয়েল-টাইম বাস, মেট্রো, হাঁটার রুট ও ট্রাফিক আপডেট খুব ভালোভাবে দেখায়। এ ছাড়া KakaoMetro ব্যবহার করলে মেট্রো রুট, ট্রান্সফার স্টেশন ও ট্রেনের সময়সূচি সহজে বোঝা যায়। এই অ্যাপগুলো আগে থেকেই ফোনে ইনস্টল করে রাখলে সহজে সস্তা ও দ্রুত রুট খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে ভুল পথে ঘোরা, অপ্রয়োজনীয় ট্যাক্সি নেওয়া বা বাড়তি ট্রান্সপোর্ট খরচ অনেকটাই কমে যায়।