শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই, কর্মজীবনে অগ্রগতির পথও অস্পষ্ট। এ কারণে অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতায় আসতে দ্বিধা বোধ করেন।
শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই, কর্মজীবনে অগ্রগতির পথও অস্পষ্ট। এ কারণে অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতায় আসতে দ্বিধা বোধ করেন।

শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা দরকার

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবে তিনটি বিষয়—শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা ও পরিমার্জন এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন। এ ব্যাপারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী ভাবছেন? তাঁদের দৃষ্টিতে কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত?

স্কুলেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে ঝরে পড়ার হার কমবে

সায়মা হোসেন

সায়মা হোসেন, কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে কিছু মৌলিক বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আমার মতে, শিক্ষার প্রসার, পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন ও শিক্ষকদের মানোন্নয়ন—এই তিনটি বিষয় ভীষণ জরুরি।

১. সর্বোচ্চ শিক্ষার হার অর্জন: বাংলাদেশে শিক্ষার হার ধীরে ধীরে বাড়লেও গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো ঝরে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা অল্প বয়সে কাজের সন্ধানে নেমে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। স্কুলে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে এটা দূর করা সম্ভব। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন নিয়মও আছে—মেধাবী শিক্ষার্থীরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে স্কুল থেকে টাকা পায়। এর মাধ্যমে স্কুলে যাওয়া এবং ভালো ফলাফল করা—দুটোর প্রতিই আগ্রহ তৈরি হয়।

২. বৈশ্বিক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য: বাংলাদেশের পাঠ্যক্রম বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক আলাদা। ফলে এ দেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়। এ কারণেই বর্তমানে দেশে থেকেও বিদেশি কারিকুলামে পড়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। একইভাবে বিশ্ব পাঠ্যক্রম থেকে কেউ বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমে আসতে গেলে হিমশিম খাচ্ছে।

৩. শিক্ষকদের মানোন্নয়ন: দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষক ও আধুনিক শিক্ষাদান কৌশলের যথেষ্ট অভাব আছে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি আমরা আরও সতর্ক হই, শিক্ষকদের যদি নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই, কর্মজীবনে অগ্রগতির পথও অস্পষ্ট। এ কারণে অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতায় আসতে দ্বিধা বোধ করেন। তাই শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা দরকার।

শুধু ‘কী শিখছি’ নয়, ‘কেন শিখছি’ও জানা দরকার

নাঈম আহাম্মদ

নাঈম আহাম্মদ, শিক্ষার্থী, ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ

পৃথিবী বদলে যাচ্ছে দ্রুত। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও কর্মক্ষেত্রের ধরনে প্রতিদিনই পরিবর্তন আসছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; হতে হবে সৃজনশীল, দক্ষতাভিত্তিক ও মানবিক। আমি মনে করি, তিনটি বিষয়ে এখনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, বোঝাপড়াভিত্তিক ও প্রয়োগযোগ্য শিক্ষা নিশ্চিত করা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো মুখস্থনির্ভরতার প্রবণতা প্রবল। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেও বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে অনেক সময় অসহায় বোধ করে। এর প্রধান কারণ হলো শেখার প্রক্রিয়ায় ‘কী শিখছি’ প্রশ্নের উত্তর থাকলেও ‘কেন শিখছি’ এবং ‘কোথায় প্রয়োগ করব’—এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

শিক্ষা হতে হবে বিশ্লেষণধর্মী ও অনুসন্ধানমূলক। পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন শিক্ষার্থীরা যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখে, প্রশ্ন করতে পারে এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে। গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান কিংবা ভাষা—সব ক্ষেত্রেই উদাহরণভিত্তিক ও সমস্যা সমাধানমূলক শিক্ষা জরুরি। এতে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং তারা কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য শিখবে।

দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়। শিক্ষাকে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা খুব জরুরি। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে প্রযুক্তি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, অনলাইন নিরাপত্তা, প্রাথমিক আর্থিক জ্ঞান, উদ্যোক্তার মনোভাব এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ, বিজ্ঞান মেলা, গবেষণাভিত্তিক ছোট কাজ বা সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয়। এতে তারা দলগতভাবে কাজ করতে শেখে, নেতৃত্বগুণ তৈরি হয়। সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে এসব দক্ষতা অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল অর্থনৈতিক সাফল্য নয়; বরং একজন মানবিক, দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক তৈরি করা। সততা, সহমর্মিতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পরিবেশ সচেতনতা শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার জন্য নৈতিক শিক্ষা অপরিহার্য। এর পাশাপাশি সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন ভুলকে ভয় না পায়, বরং শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো হলে তাঁদের ভেতরের সম্ভাবনা বিকশিত হবে।