
ঈদে সবারই যে ‘স্বপ্ন বাড়ি ফেরে’, তা তো নয়। অনেকেই দেশ থেকে হাজারো মাইল দূরের কোনো ভিনদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদ উদ্যাপন করেন। বাড়ির জন্য মন কাঁদে ঠিক। তবে ভিন্ন পরিবেশে, নানা দেশের সহপাঠী–বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনেরও কিন্তু একটা আলাদা আনন্দ আছে। সে কথাই লিখে জানিয়েছেন সাদিয়া ইসলাম। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী।
রমজানজুড়েই দেশে যে ঈদের আমেজ থাকে—রাত জেগে কেনাকাটা, ইফতারের জমজমাট আয়োজন, সাহ্রি—প্রবাসে এই সবকিছুই অনুভব করতে পারিনি। ক্লাস আর ল্যাবের ব্যস্ততাতেই দিন কেটে গেছে।
কখনো কখনো রাত আটটা পর্যন্ত ক্লাস করে ঘরে ফিরে একা একা ইফতার করেছি। মায়ের হাতের ইফতারি, চেনা আজান…মিস করছিলাম খুব। এখানে আজানের শব্দ শোনা যায় না, সাহ্রির সময়ও মসজিদের কোনো ডাকাডাকি নেই। ঈদে মা-বাবার দেওয়া সালামি নিয়ে ভাই-বোনের সঙ্গে খুনসুটি করার কোনো সুযোগও ছিল না। আম্মুর হাতের সেমাই খাওয়া, আব্বুর ডাকে ঘুম ভাঙা, ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে। ভিডিও কলে কথা বলতে গিয়ে বাসার সবাই কাঁদছিল। আমিও নিজেকে আটকাতে পারিনি।
তবে নতুন কিছু অভিজ্ঞতাও হয়েছে। মসজিদে বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের সঙ্গে ইফতার ছিল খুব উপভোগ্য। নানা দেশের খাবার থাকত, সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করতাম। ঈদের দিন সকালে মসজিদে গিয়ে সবার সঙ্গে নামাজ পড়েছি। এসব আমাকে বৈশ্বিক মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার অনুভূতি দিয়েছে।
ঈদের আগের দিনও ল্যাবে কাজ করেছি। কাজ শেষে চাঁদরাতে মসজিদে মেহেদির আয়োজন ছিল, সেখানে গিয়েছিলাম। অনেক স্বেচ্ছাসেবক আমাদের হাতে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছিলেন। সেখানে অনেক বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হলো। মসজিদের পাশে ছোট্ট একটা ঈদমেলার আয়োজনও ছিল।
ঈদের দিন সকালে ক্যাম্পাসের সিনিয়র সাফিয়া আপুর বাসায় আর রাতে আমার ল্যাবমেট ফাহাদ ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত ছিল। সেখানে অনেক মজার মজার খাবার খেয়েছি, সময়টা ভালো কেটেছে। বিকেলে লিপি আপুর সঙ্গে কাছের একটা লেকে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সারা দিনই পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত ছিলাম। কিছুক্ষণ পরপর আম্মু, আব্বু ফোন করছিল, যেন আমি একা একা মন খারাপ না করি।
এই ঈদের সবচেয়ে আনন্দের দিক ছিল নিজের উপার্জনের টাকায় পরিবারের জন্য ঈদের শপিং করা, গ্রামের মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করতে পারা। উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেই এই প্রবাসজীবন বেছে নিয়েছি। কিন্তু এই পথচলায় জীবনের অনেক সুন্দর মুহূর্তকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে। তবু আশা রাখি, একদিন আবার পরিবারের সঙ্গে এক হয়ে ঈদ উদ্যাপন করতে পারব।
সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।