মেধাবী কিশোর তানভীর মোহাম্মদ ত্বকিকে হত্যার প্রতিবাদে আজ শনিবার নারায়ণগঞ্জ পরিণত হয় ক্ষোভের শহরে। হরতালে বন্ধ ছিল স্কুল-কলেজ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ শহরের সব দোকানপাট। এমনকি খাবারের দোকানও। শহরে ট্রেন, বাস এমনকি রিকশাও চলেনি। গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বড় ছেলে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকির হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ নারায়ণগঞ্জে হরতাল পালিত হয়। হরতাল শেষে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে আগামীকাল রোববার বিকেল চারটায় শহরের চাষাঢ়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, শহরের প্রধান সড়ক চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ১০/১২টি পয়েন্টে টায়ারে অগ্নিসংযোগ করা হয়। চাষাঢ়া এলাকায় সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লাইন অবরোধ করে রাখা হয়। এ কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। হরতালে সমর্থন জানিয়ে সিপিবি, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ, সাম্যবাদী দলসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে কর্মীরা রাজপথে অবস্থান নেন। ভোর থেকেই হরতালের সমর্থনে সাংস্কৃতিক জোটের কর্মীরা শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করেন। মিছিলের স্লোগান ছিল, ‘আমার ভাই মরল কেন? প্রশাসন জবাব চাই,’ ‘গডফাদারদের আস্তানা, জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’, ‘গডফাদারদের আস্তানা নারায়ণগঞ্জে রাখব না’। এদিকে ত্বকির লাশ উদ্ধারের পর গতকাল শুক্রবার ও আজ শনিবার নারায়ণগঞ্জে সাংস্কৃতিক জোটের সমাবেশ ও মিছিলে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে কোনো স্লোগান দেওয়া হয়নি। তবে বিকেলে চাষাঢ়ায় সেলিম ওসমানের সমাবেশে তাঁর অনুগত লোকজন ‘একটা দুইটা জামায়াত ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’, ‘জামায়াত-শিবিরের আস্তানা নারায়ণগঞ্জে রাখব না’ বলে স্লোগান দেন। সকাল পৌনে সাতটার দিকে ট্রেনলাইনের ওপর টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে রাখে হরতালের সমর্থনকারীরা। শহরের চাষাঢ়া গোলচত্বর, দুই নম্বর রেলগেইট এলাকা ও শহরের মণ্ডলপাড়া এলাকায় মাইক লাগিয়ে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের চাঁদমারী এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। নিহত ত্বকি ওই স্কুলের ছাত্র ছিল। শহরের রাজপথে নারী ও শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মিছিল করেছে। বিকেল চারটার দিকে খেলাঘর জেলার সভাপতি রথীন চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন সিপিবি জেলার সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, বাসদ নেতা মাহবুব ইসমাইল, ন্যাপের জেলার সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, জেলা উদীচীর সভাপতি জাহিদুল হক ভুঁইয়া, সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী শঙ্কর রায় প্রমুখ। হরতালে বিরক্ত নয় কেউসোনারগাঁও উপজেলার পানাম নগরের বাসিন্দা পুরোনো কাপড় ব্যবসায়ী সাবিনা আক্তার জানান, তিনি শহরের নয়ামাটি হোসিয়ারি বাজার থেকে পুরোনো কাপড় কিনে নিয়ে বিক্রি করেন। হরতালের কারণে তাঁকে কাপড়ের বোঝা মাথায় করে নিয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু তাতেও তাঁর কোনো দুঃখ নেই বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘শুনেছি, ত্বকির বাবা রফিউর রাব্বি বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ছেলেকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাই এই হরতাল ডাকা হয়েছে। এতে আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। এই হরতালের কারণে যাতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।’ শহরের উকিলপাড়া এলাকার স্ট্রবেরি ফল বিক্রেতা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি গত সাত বছর যাবত্ এখানে ফল বিক্রি করি। রাব্বিকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে তাকে চিনি। তাঁর ছেলেকে নৃশংসভাবে মাইর্যা ফালাইছে। যদিও হরতালের কারণে আমার বেচাকেনা হয়নি। কিন্তু তবুও আমি এই হরতালকে সমর্থন করি।’শহরের চাষাঢ়া এলাকার চা-দোকানি আবুল খায়ের জানান, ‘আজ দোকান খুলি নাই। ত্বকির খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে সারা দিন রাস্তায় থাকব। এমন সুন্দর তরতরা পোলাডা মাইরা হালাইছে, ওই পরিবারের জানি কী অবস্থা।’বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নারায়ণগঞ্জের সভাপতি হাফিজুল ইসলাম জানান, ত্বকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক জোটের ডাকা হরতালে সিপিবিসহ, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ, সাম্যবাদী দলসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে। জেলা পুলিশ সুপার নুরুল ইসলাম জানান, ত্বকিকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। খুনের ঘটনায় পৃথক দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। গতকাল শুক্রবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে শহরের চারারগোপ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর কাছ থেকে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে নারায়ণগঞ্জের গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বড় ছেলে। এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার রাতে রফিউর রাব্বি বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেন।