বইপত্র

কাঁটাতারের কান্না

ভারত: গেদে এলাকায় আত্মীয় বাড়িতে বেড়ানোর পর বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছে একটি পরিবার
ভারত: গেদে এলাকায় আত্মীয় বাড়িতে বেড়ানোর পর বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছে একটি পরিবার
বাংলাদেশ: এক নারী বস্তাভর্তি ভারতীয় চোরাই মালপত্র নিজের মাথায় করে ছেলের হাতে দিচ্ছেন

১৯৪৭ সালে একটা রক্তারক্তির মধ্য দিয়ে দেশভাগ হয়েছিল। মানুষের হাতেই অগুনতি মানুষ মারা গিয়েছিল। তখন অবশ্য মানুষ আর মানুষ ছিল না। ওরা ছিল ‘হিন্দু’ আর ‘মুসলমান’। হিন্দুরা মুসলমান মেরেছে, মুসলমানেরা হিন্দুদের। তারপর সীমান্ত পিলার বসিয়ে বলেছে, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। একাত্তরে রক্ত ঝরল আবারও।

তখন মনে হয়েছিল ছবিটা পাল্টাবে। সীমান্তের রক্তাক্ত জমিনে কাশফুল ফুটবে, পায়রা উড়বে, মানুষে মানুষে হানাহানি বন্ধ হবে, জীবনের প্রয়োজনে হবে লেনদেন। কিন্তু তা হয়নি। সীমান্তের অনেক পিলার উধাও। এখন সেখানে কংক্রিটের প্রাচীর কিংবা কাঁটাতারের বেড়া। গত সাত দশকে মানুষের মধ্যে যে অলঙ্ঘনীয় দেয়াল তৈরি হয়েছে, কাঁটাতার তারই প্রতীক। এই দেয়াল মহাপরাক্রমশালী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জানান দেয়। কিন্তু দুপাশের মানুষকে শান্তি ও স্বস্তি দেয় না; বরং দেয় একরাশ অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক।
৩ হাজার ২০০ কিলোমিটারজুড়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত আজ এক আতঙ্কের দেয়াল। এই দেয়ালের প্রতিটি ইটে মিশে আছে লাখ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। রাষ্ট্রের কাছে এই আকুতির আরেক নাম ‘চোরাচালান’। সেখানে সস্তা সেন্টিমেন্টের দাম নেই।

>
আতঙ্কের দেয়াল
আতঙ্কের দেয়াল
গেইল তুরিন
অনুবাদ: অসিত রায় 
প্রচ্ছদ: মাহবুবুর রহমান 
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা 
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০১৬  ৮০ পৃষ্ঠা
 দাম: ৩০০ টাকা।

সীমান্তের দুপাশে ওত পেতে থাকা প্রহরীর নজর এড়িয়ে নিছক বেঁচে থাকার তাগিদে প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন নানা বয়সের নারী-পুরুষ এই দেয়াল টপকায়। তারপর কেউ ঘরে ফেরে, কেউ ফেরে না। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে প্রতি চার দিনে নিহত হয় একজন মানুষ। এ হিসাব ২০১০ সালে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের। রক্ষীর ছোড়া তপ্ত সিসা কত মানুষের কলজে ছিঁড়ে দিয়েছে, তার হিসাব নেই। এসব মানুষের জীবন ও জীবিকার কাব্য লিখেছেন বেলজিয়ামের ফটোসাংবাদিক গেইল তুরিন। কলম দিয়ে নয়, ক্যামেরায়।
গেইল তুরিনের ক্যামেরায় তোলা ৬২টি দৃশ্যকাব্য সম্প্রতি দুই মলাটে বন্দী করেছে প্রথমা প্রকাশন। সাদা-কালো ‘ভয়ংকর সুন্দর’ ছবিগুলোতে নানা বয়সের নারী-পুরুষের বেঁচে থাকার লড়াই ফ্রেমবন্দী করেছেন ক্যামেরার এই কবি। প্রতিটি ছবির সঙ্গে আছে ক্যাপশন—যাপিত জীবনের টুকরো টুকরো গল্প।
একটা গল্প এ রকম—বিছানায় ফ্রেমে বাঁধাই ৩০ বছরের বাবুলের প্রতিকৃতি। ২০১২ সালে বিএসএফের হাতে তিনি মারা যান। বাবাকে তিনি গরু পাচারে সাহায্য করতেন। ওই কালরাতে গরুসহ পাচারকারীরা যখন ব্রিজের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, বিএসএফের সদস্যরা বাবুলের দিকে বিশাল একটা পাথর ছুড়ে মারেন। বাবুলের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। লাশ ছুড়ে ফেলা হয় তাঁর গ্রামের কাছের নদীতে।

ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম

আরেকটা গল্প—ফজিলাতুন্নেসার ছেলে আজহারুল বিএসএফের হাতে মারা গেছে। একটা গুলি লেগেছিল হাতে, আরেকটা বুকে। ফজিলাতুন্নেসা মনে করেন, প্রথম গুলিটা খেয়ে সে আহত হয়ে পড়ে যায়। পরে আরেকটা গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। তার লাশ পড়েছিল কাঁটাতারের বেড়ার কাছে ধানখেতে।
কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীর লাশের ছবি দেখে সারা দেশে প্রতিবাদ আর নিন্দার ঝড় উঠেছিল। ফেলানীর বাবাকে নিয়ে আছে একটা হৃদয়ছোঁয়া গল্প। ফেলানী তাঁর সঙ্গেই ছিল। ফেলানী যখন গুলি খায়, তখন সে বেড়া টপকাচ্ছিল। তার জামা কাঁটাতারে আটকে যায়। প্রহরীরা তার বাবাকে ধরে রেখেছিল, যাতে তিনি মেয়েটাকে বাঁচাতে এগিয়ে যেতে না পারেন। ১৪ বছর বয়সী ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। পায়ে আলতা দেওয়া হয়নি। সীমান্ত-প্রহরীর গুলিতে তার পুরো শরীরটাই লাল হয়ে গিয়েছিল।
অর্থনীতির সঙ্গে চোরাচালানের বিরোধ নেই। তবে রাষ্ট্র এ ধরনের ক্রস-বর্ডার ট্রেড অনুমোদন করে না। কেননা বাণিজ্যের জন্য চাই রাষ্ট্রের প্রত্যয়নপত্র, পারমিট। প্রান্তজনের এসবের বালাই নেই। বড় চোরাচালানিরা থাকে বড় শহরে। বাবুল-ফেলানীরা হলো ফুট সোলজার। এরাই ধরা পড়ে, গুলি খায়, জেল খাটে, মারা যায়। একটা মৃত্যু একটা ভরা সংসারে নিয়ে আসে চিরদিনের অনটন আর অনাহার। সামান্য কিছু মসলাপাতি, প্রসাধনসামগ্রী, ওষুধ-বিষুধ, গরু, ফেনসিডিল—এসব কাঁধে বয়ে বেড়ানোর জন্য চরম মূল্য দিতে হয় সীমান্তের গরিব বাসিন্দাদের। গেইল তুরিনের ছবিগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা কত অসার।
তুরিন ছবিগুলো তুলেছিলেন ২০১২-১৩ সালে। ছবিগুলোর জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন, আজস ফ্রাঁসেজ দ্য ডেভেলপমঁ থেকে সেরা ফটোসাংবাদিকের বিশেষ পুরস্কার পেয়েছেন ২০১৪ সালে। তাঁকে বাংলাদেশের পাঠকদের সামনে তুলে ধরে প্রথমা প্রকাশন প্রান্তজনের একটা জরুরি সমস্যার দিকে নজর দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিল।