
রৌদ্রবন্ধু, ছোটকু আর বড়ো
সাজ্জাদ হুসাইন
—এই ছোটকু, ওঠ্ ওঠ্।
—কেন, কী হলো গো?
—দেখছিস না হাওয়া-দত্যিটার কাণ্ড?
—কী করেছে ওই দুষ্টুটা?
—চোখ মেলে দ্যাখ, কেমন রেগেমেগে ধেয়ে আসছে!
—হঠাৎ ও অমন রাগলো কেন গো?
—জানিস না বুঝি? বৈশাখ এসে গেছে যে!
—ও মা, তা-ই নাকি?
এই বলে ছোটকু বাবুইটা লাফিয়ে উঠলো। বিছানা-বালিশ ছেড়ে ছুটতে লাগলো ঘরময়। সে কী হট্টগোল। চেঁচামেচি। চেঁচাচ্ছে। আর বলেই চলেছে—
—এখন কী হবে গো বড়ো?
বড়ো তো নিশ্চুপ। কোনো রা নেই মুখে। এর মধ্যে আবার মা-বাবাটা বেড়াতে গেছে নানুবাড়ি। সেই বাড়িও কি ধারেকাছে? সুদূর নন্দীপুকুর। চেঁচিয়ে মরে গেলেও দেখার কেউ নেই।
এখন উপায়? বুঝতে পারছে না কিছুই।
তালপুকুরের ঠিক পাড় ঘেঁষেই একটা মস্ত তালগাছ। তার ঠিক চূড়াতেই ওদের কুঁড়েঘর। ঘরটা হাওয়া-দত্যির ধমকে হন্যে হয়ে দুলছে। হঠাৎ একটা টুকরো পলিথিন এসে ঢেকে দিলো ওদের ঘরের সদর দরোজাটা। নিমেষেই সারা ঘর অন্ধকার! অন্ধকার আকাশও। কালো কালো মেঘকণা তিরের মতো জল-দত্যিদের ছুড়ে ফেলছে।
—এবার বুঝি আর রক্ষে নেই গো। ঘরটা বুঝি ঠিক ঠিকই ভেঙে যাবে। বড়ো, কী হবে আমাদের!
ছোটকু বাবুইটা এই বলে কাঁদছে। বড়োরও বুক ধড়ফড় করছে।
এমন সময় একটা বজ্র-দত্যি ফেটে পড়লো। ছোটকু স্প্রিংয়ের মতো এক লহমায় গিয়ে পড়লো বড়োর বুকের ওপর। বড়ো ভেজা ডানা দুটো দিয়ে আগলে ধরলো ছোটকুকে। ছোটকু প্রাণভয়ে থরথর করে কাঁপছে। মুখ লুকিয়ে রেখেছে বড়োর বুকে। মাথা তুলছে না, আবার যদি বজ্রদত্যি হানা দ্যায়—এই ভেবে।
ছোটকু মাথা তুলতে যাবে, অমনি আরেক দঙ্গল হাওয়া-দত্যি এসে আছড়ে পড়লো বাড়ির বারান্দায়। এবার বাড়ির বসার সামনের ঘরটা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে! ছোটকু আর বড়ো মিলে প্রার্থনা করছে—
—আমাদেরকে ঘরছাড়া করো না। একবার মুখ তুলে চাও। রক্ষা করো প্রভু!
প্রভু সত্যি সত্যিই মুখ তুলে চাইলেন। আকাশ ফেটে যেন হেসে উঠলো রৌদ্রবন্ধু। রৌদ্রবন্ধু এসে হাওয়া-দত্যি, বজ্র-দত্যি, জল-দত্যি—সব্বাইকে সেকি তাড়া! তাড়া খেয়ে সবগুলো উঠে পড়ে দৌড়। আর যেতে যেতে বলতে লাগলো—আমরা ফের আসবো। বন্ধু বোশেখের আমন্ত্রণ পেলেই কাল হয়ে ছুটে আসবো।
ছোটকু আর বড়োর তাতে থোড়াই কেয়ার। দুজনে মিলে নাচতে নাচতে বেরিয়ে পড়ে ঘরের বাইরে। কাদাজলে ডিগবাজি খায়। রঙ ছোড়াছুড়ি করে। পুকুরে গিয়ে স্নান করে নেয় মহানন্দে। গাইতে শুরু করে হেলেদুলে—
‘বজ্র-হাওয়া-জলদত্যি—
দুষ্টু তোরা, তিন সত্যি।
বোশেখ হলে বন্ধু তোদের
রৌদ্রবন্ধু আছে মোদের।
রৌদ্রবন্ধু, ছোটকু, বড়ো—
এবার যখন হলাম জড়ো
আর আমাদের ভয়টা কিসে?
দূর হ তোরা এক নিমিষে!’