বইপত্র

ঢাকার বুকে এক চিলতে সবুজ

ইতিহাস বলছে ১৬১০ সালে মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় রমনা পার্ক। এই সময়ের মধ্যে ঢাকা শহরের রূপান্তর ঘটেছে অনেক। বদলে গেছে তার রূপ। ক্ষয় হতে হতে ঢাকা শহর ক্রমশ নাই হয়ে যাচ্ছে। অনেক কিছুই নেই তার আগের জায়গায়। তবুও কাউকে না-কাউকে সাক্ষ্য দিতে হয়। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রমনা। অনেক উৎসব আর বিষণ্নতার চাদর গায়ে জড়িয়ে প্রতিবছর রমনার অশ্বত্থতলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে পয়লা বৈশাখ। কিন্তু আমরা কজনই বা জানি এই উদ্যানের বিচিত্র বৃক্ষরাজির কথা?

সৌরভ মাহমুদের শ্যামলী রমনা বইটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে এল এ কথাগুলো। বইটি রমনার অজস্র বৃক্ষরাজির এক মনোরম বর্ণনা। লেখক বইটিকে মূলত ভাগ করেছেন বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্রের আঙ্গিকে। অনেকটা কবিতার মতো করে তুলে ধরেছেন তার পরিচিতি। নাম দিয়েছেন ‘ঋতুরঙ্গ’। এসব বর্ণনার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন দারুণ কিছু ছবিও। এই দুইয়ের মেলবন্ধন অনেক বেশি হৃদয়গ্রাহী করেছে বইটিকে।

নাগলিঙ্গম—লেখক এই ফুলের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘অমসৃণ ও খসখসে দেহে ফুলের সজ্জা দেখে মনে হবে এক প্রাচীন ভাস্কর্য। গ্রীষ্মজুড়েই প্রস্ফুটনে ব্যস্ত থাকে নাগলিঙ্গম।’ এ ছাড়া কনকচূড়া, জারুল, কর্ডিয়া কিংবা সোনালু ফুল একই সময়ে বিস্তার করে তার প্রাণপ্রাচুর্য।

বৃক্ষ তার জীর্ণতা দূর করতে হয়তো বেছে নেয় বর্ষাকে। রমনাও তার ব্যতিক্রম হবে কেন? বর্ষায় পিরামিডাকার নাগেশ্বর তরু দেখলে আপনার মনে হবে বিশালাকার শরীর নিয়ে বৃষ্টির মাঝে চোখ মেলছে সবুজ প্রজাপতি।

 ‘শরৎ কাঁপে নীলের হরষে’ এমন শিরোনামে উঠে এসেছে শারদীয় নানা ফুলের কথন। নয়নতারা, সাদা শাপলা কিংবা শেফালি ফুলের যৌবন দেখতে দুর্গার মূর্তি দেখার পাশাপাশি আপনি একবার ঘুরে যেতে পারেন রমনার প্রান্তরও। শেফালি ফুল নিয়ে লিখতে গিয়ে লেখক সৌরভ মাহমুদ লিখেছেন, ‘শেফালি তার তীব্র সুবাস রাতের বাতাসে দূর অবধি নিয়ে যায়। এই নিশিপুষ্পের পাপড়িগুলো কিন্তু ঝরে পড়ে রাতের শেষে। খুব ভোরে যখন ঈশান কোণে ফুটে ওঠে সূর্য, তার আগেই পাপড়ি-ঝরে-পড়া শেফালির তলে ফুলকুড়ানি ও ফুলপূজারি আঁচলে করে কুড়িয়ে নেয়।’

রমনার হেমন্ত মানেই কেমন জানি মন খারাপ করা একটা আকাশ। অনেকটা সেই বুড়ো ছাতিমতলার মতো। এই মন খারাপ দূর করতে আপনার জন্য রমনাতেই আবার অপেক্ষা করে আছে রসুন লতা, দেবকাঞ্চন কিংবা ধাইরার মতো বাহারি রঙের ফুল।

>
শ্যামলী রমনা
শ্যামলী রমনা
সৌরভ মাহমুদ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ l
প্রকাশক: অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা l
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ l
২৪০ পৃষ্ঠা l
দাম: ৬০০ টাকা

রমনার এই বৃক্ষবয়ান লেখক টেনেছেন রাজঋতু বসন্ত অবধি। শিশির ঝরা শীতের হাহাকারেও সবুজকে বুকে ধরে রাখে রমনা। তেঁতুল-কাঠগোলাপ কিংবা শ্বেত শিমুলগাছ তারই স্মারক। আর বসন্ত মানেই তো নতুনের জয়গান। নতুন আকাঙ্ক্ষার পথচলা। রঙিন বসন্তের বর্ণনায় পাওয়া যাবে পলাশ, মাধবী, গ্লিরিসিডিয়া, জংলিবাদামসহ শত ফুলের বর্ণনা। অর্থাৎ কোনো ঋতু রমনাকে কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দেয় না।

রমনার এই ছয় ঋতুতে শত ফুলের বর্ণনা লেখক তুলে এনেছেন চমৎকার দক্ষতায়। শুধু এই-ই নয়, এই ঋতুকথনের পর তিনি আবার তুলে ধরেছেন রমনার বিবিধ তরুলতা—ব্রুনফেলসিয়া ও কেয়ার ঝোপ ইত্যাদি। তবে বৃক্ষ মানে কি শুধুই বৃক্ষ? বৃক্ষকে ঘিরে জীবন্ত হয় আরও অনেক প্রাণ। এই যেমন বিরল লটকনটিয়া এখনো দেখা যায় রমনায়। এ ছাড়া শতবৃক্ষের বুকে বাসা বেঁধে আছে আরও কত শত পাখি। রমনার সবচেয়ে প্রাচীন মহুয়া গাছের ফাঁকে আজও আছে খুঁড়ুলে প্যাঁচা। অন্যান্যের মধ্যে শঙ্খচিল, ফিঙে, হরিয়াল, সাপ, ব্যাঙসহ নানা পদের বন্যপ্রাণীর পরিচিতিও এসেছে বইটিতে।

একদম শেষে সৌরভ মাহমুদ তুলে ধরেছেন রবাট লুইস প্রাউডলকের পরিচিতি, যাঁর হাত ধরে গড়ে উঠেছে আধুনিক রমনার অবয়ব।

সবশেষে এই মায়াময় উদ্যানটির প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির জন্য লেখককে অবশ্যই সাধুবাদ দিতে হয়। বইটি পড়তে পড়তে আমাদের চিরচেনা রমনাকে জানা যায় নতুন করে।