নজরুল-জীবন ও উপন্যাস লেখার অন্তরায়

নার্গিস
নার্গিস
নার্গিস—কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের একটি বিশেষ পর্বকে উপজীব্য করে লেখা বিশ্বজিৎ চৌধুরীর উপন্যাস। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এ উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে কোন ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন এর রচয়িতা, এ লেখায় ধরা আছে সেই বৃত্তান্ত

বাঙালির জীবন থেকে সশ্রদ্ধ-দূরত্বের নির্দিষ্ট ফ্রেমে বন্দী হয়ে থাকেননি কাজী নজরুল ইসলাম। আমাদের জাতীয় কবির শিরোপা তিনি পেয়েছেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিকেও ছাপিয়ে জেগে আছে তাঁর প্রতি পাঠকের ভালোবাসা, ভক্তের অকুণ্ঠ অনুরাগ। সৃজনমুখরতায় সমকালকে যেমন সচকিত করে রেখেছিলেন, একইভাবে জীবনের নির্বাক অধ্যায় এবং মৃত্যুর পর এতগুলো বছর পেরিয়ে এসেও নজরুল প্রাসঙ্গিক। তাঁকে জানার-বোঝার আগ্রহ, তাঁর বহুস্তরের জীবন নিয়ে কৌতূহলের অবসান হয়নি এখনো।

তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে মূল্যায়নধর্মী গ্রন্থ ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রচনার সংখ্যা নেহাত কম নয়, ঘনিষ্ঠজনদের সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণার সূত্রেও উঠে এসেছে অনেক কিছু। কিন্তু প্রচুর উপাদান থাকা সত্ত্বেও তাঁর জীবন নিয়ে ফিকশনধর্মী রচনা তেমন নেই। তার কারণ সম্ভবত তাঁর জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে লেখকদের মতভিন্নতা রয়েছে প্রচুর—একই ঘটনার একাধিক ভাষ্য পাওয়া যায়। এমনকি নিজেদের মতো প্রতিষ্ঠার জন্য এই লেখকের জীবনীকারেরা এমন সব তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছেন, যাতে পাঠকের বিভ্রান্ত হয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক নয়। তাই মনে হয়, একটি নির্মোহ নজরুল-জীবনী রচনার জন্য একজন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের (রবীন্দ্র-জীবনীকার) জন্য হয়তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুকাল।
নজরুলের জন্য ১৭ বছর অপেক্ষা করেছিলেন এক নারী। এই একটি তথ্যই কৌতূহলী করে তুলেছিল আমাকে। তাঁর প্রথম প্রেম নার্গিস। মিলনের পূর্ণতা পায়নি এই প্রেম। সেই হাহাকার উৎকীর্ণ হয়ে আছে তাঁর গানে-কবিতায়। নার্গিসকে নিয়ে একটি উপন্যাস লেখার জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বলা যায় রীতিমতো গোলকধাঁধার মধ্যে পড়তে হয়েছে আমাকে।

নজরুল ও নার্গিস। শিল্পী: শেখ আফজাল

১৯২১ সালের ৫ এপ্রিল আলী আকবর খানের সঙ্গে কলকাতা থেকে কুমিল্লার দৌলতপুরে তাঁর বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন নজরুল। দেশব্যাপী তখন যশ-খ্যাতি ছড়িয়ে না পড়লেও কবি হিসেবে মোটামুটি একটা পরিচিতি গড়ে উঠেছিল তাঁর। স্বভাবগুণে খান মঞ্জিলের সবার খুবই প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন এই তরুণ অতিথি। গানে-গল্পে মাতিয়ে তুলেছিলেন এমনকি পুরো দৌলতপুর গ্রাম। এখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় আলী আকবর খানের ভাগনি সৈয়দা আসার খানমের। সেই পরিচয় প্রেমে রূপান্তরিত হতে সময় লাগেনি। সৃজন-আনন্দে সর্বদা উচ্ছ্বসিত, প্রিয়দর্শন তরুণ নজরুলের সঙ্গে সুশ্রী শান্ত ও স্নিগ্ধ স্বভাবের সৈয়দার এই সম্পর্ক যেন ছিল অনিবার্য। নজরুলই ভালোবেসে সৈয়দার নতুন নাম দিয়েছিলেন নার্গিস। শেষ পর্যন্ত খান বাড়ির এই অতিথির সঙ্গে নার্গিসের বিয়ের দিন-তারিখ ধার্য হয়েছিল ১৯২১ সালের ১৭ জুন। বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রও বিলি করা হয়েছিল। এই পর্যন্ত তথ্যে নজরুলের জীবনীকার ও গবেষকদের কোনো মতদ্বৈধতা নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়েছিল কি না, এই নিয়েই বিভ্রান্তি। কেউ বলেন, আক্দ সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁরা এমনকি এ কথাও উল্লেখ করেন, আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদন করেন নার্গিসের বড় ভাই আবদুল জব্বার মুনশি। নার্গিসের পক্ষে উকিল ছিলেন তাঁর বড় মামা আলতাফ আলী খান। বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরা বলেন, বিয়ে আদৌ হয়নি। কাবিননামার অপমানকর শর্তাদি দেখে ক্ষুব্ধ নজরুল বিয়ের আসর ছেড়ে উঠে যান এবং সেই রাতেই খানমঞ্জিল ত্যাগ করে হেঁটে কুমিল্লা চলে যান।
নজরুল-নার্গিসের বিয়ে হয়নি, সে কারণে বিবাহ–বিচ্ছেদের প্রশ্নই ওঠে না—এই যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মুজফ্ফর আহ্মদ লিখেছেন, ‘মুসলিম বিয়ে যেহেতু চুক্তিসিদ্ধ বিবাহ সেহেতু নারী-পুরুষের সহবাসের অপেক্ষা রাখে। নজরুলের বিবাহে জবরদস্তি করা হয়েছিল সে জন্য মিলন বা সহবাস হয়নি তাই এ বিবাহ আইনত সিদ্ধ হয়নি বিবাহ-বিচ্ছেদের কোন প্রশ্নও ওঠে না।’
এ যুক্তি খণ্ডন করে মুজফ্ফর আহ্মদের জামাতা কবি-লেখক আবদুল কাদির বলেছেন, ‘আপনি লিখেছেন বিবাহের কন্ট্রাক্ট হওয়ার পরে নারী-পুরুষের সহবাসের ভিতর দিয়ে তার পরিপূর্ণতা (consummation) না হলে স্ত্রীর স্ত্রীধন বা ‘মোহর’ প্রাপ্য হয় না। আপনার ধারণা ঠিক নয়।’ স্যার দীনশাহ ফারদুনজি মোল্লা প্রণীত প্রিন্সিপালস অব মোহামেডান ল গ্রন্থের কিছু অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘বিধানগুলি পড়লে পরিষ্কার ধারণা হয় যে, নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের যে “আক্দ” হয়েছিল, তা মুসলিম আইন অনুসারে সুসিদ্ধ এবং যথারীতি “তালাক” ছাড়া সে বিবাহ বাতিল হতেই পারে না।’
নজরুলের জীবনীকারদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের মত ও বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিপক্ষ মতাবলম্বীদের তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেননি।
কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ ছিলেন নজরুলের সুহৃদ ও অভিভাবকতুল্য। দৌলতপুরে নজরুলের সঙ্গে নার্গিসের বিয়ে আদৌ হয়নি—এই মতের জোরালো প্রবক্তা তিনি। কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা গ্রন্থে ‘একটি করুণ অধ্যায়’ শিরোনামে এই বিষয়টির অবতারণা করেছেন মুজফ্ফর আহ্মদ। এখানে নিজের বক্তব্যের সমর্থনে নানা তথ্যপ্রমাণ উপস্থিত করেছেন তিনি। বলা চলে, পরবর্তীকালে এই মতকে সমর্থন করেই অগ্রসর হয়েছেন রফিকুল ইসলাম, জিয়াদ আলী, হায়াৎ মামুদ ও শান্তনু কায়সারদের মতো শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞ নজরুল গবেষকেরা। আর তাঁদের মতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্ধারিত দিনক্ষণে যে বিয়েটি সম্পন্ন হয়েছিল এবং নজরুল ওই রাতে দৌলতপুর অবস্থান করে বাসর শেষে পরদিন ভোরে দৌলতপুর ছেড়েছিলেন—এই মতের পক্ষে লেখনী ধরেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সুনীলগুপ্ত, আজহারউদ্দীন খান, আবদুল আজীজ আল-আমান, বাঁধন সেনগুপ্ত, সুফী জুলফিকার হায়দার ও বাংলাদেশের মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ, আবদুল কাদির, কাজী মোতাহের হোসেন প্রমুখ বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকেরা।
মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর লেখায় স্বীকার করেছেন আলী আকবর খানের সঙ্গে নজরুলের দৌলতপুর যাওয়া এবং তাঁর ভাগনি নার্গিসকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তে তাঁর সম্মতি ছিল না। আলী আকবর খানকে অপছন্দ করার ব্যাপারটি কোনো রাখঢাক না রেখেই লিখেছেন তিনি। ‘একটি করুণ অধ্যায়’ রচনার শুরুতেই তিনি বলেছেন, ‘এই অধ্যায়টি রচনার মূলে যিনি রয়েছেন (আশা করি তিনি এখনো বেঁচে আছেন) প্রথমে আমি সেই আলী আকবর খানের সম্বন্ধে কিছু বলব। তাঁকে না বুঝলে কবির জীবনের এই অধ্যায়টি কেউ বুঝতে পারবেন না।’
এই ভূমিকার পর মুজফ্ফর আহ্মদ আলী আকবর খানকে একজন চতুর, ধূর্ত মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই ব্যক্তির প্রতি কতটা বিরূপ ছিলেন তিনি, তা প্রকাশ পায় তাঁর সম্পর্কে প্রায় প্রতিটি মন্তব্যে, ‘আমরা দেখতাম যে সম্রাট বাবরের জীবন নিয়ে তিনি একখানা নাটক লিখছেন। অর্থাৎ তাঁর নিজের স্বভাবেই শুধু নাটকীয়তা ছিল না, তিনি একখানা নাটকও রচনা করেছেন।’
আলী আকবর খানের ওপর বিরূপ ছিলেন মুজফ্ফর, তাই তিনি নিজে যে মেয়েটিকে (নার্গিস) জীবনে দেখেননি, তার সম্পর্কেও নির্দয় মন্তব্য করতে দ্বিধা করেননি, ‘আসলে মামা ও ভাগিনেয়ী দুজন ছিলেন যথাক্রমে অভিনেতা ও অভিনেত্রী।’
মুজফ্ফর আহ্মদের মতকে পরবর্তীকালে যাঁরা সমর্থন করেছেন, তাঁরা নার্গিসের ব্যাপারে তেমন কটু মন্তব্য না করলেও আলী আকবর খানকে মোটামুটি ‘খলনায়ক’ হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। জিয়াদ আলীর লেখায় এমনকি মামা-ভাগনির অবৈধ সম্পর্কের অশ্লীল ইঙ্গিতও করা হয়েছে। রফিকুল ইসলাম তাঁর জীবন ও সৃজন গ্রন্থে নজরুলের বহুল আলোচিত একটি চিঠির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। নার্গিসকে লেখা নজরুলের সেই চিঠির একটি অংশে লেখা ছিল, ‘তোমাদের ঢাকার কুকুর একবার আমায় কামড়েছিল আমার অসাবধানতায়, কিন্তু শক্তি থাকলেও আমি তার প্রতিশোধ গ্রহণ করিনি, তাদের প্রতি-আঘাত করিনি...।’ চিঠির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, ‘উদ্ধৃত অংশের একটি বাক্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়, সে হলো “তোমাদেরই ঢাকার কুকুর একবার কামড়েছিল আমার অসাবধানতায়” নজরুল কার প্রতি এ ইঙ্গিত করেছেন, বুঝতে অসুবিধা হয় না। বস্তুত নার্গিসের প্রতি নজরুলের কোনো অভিযোগ না থাকলেও আলী আকবরের প্রতি তাঁর মনোভাব যে দৌলতপুর ঘটনার ১৫ বছর পরেও পরিবর্তিত হয়নি, তা বোঝা যায়।’
আশ্চর্য! ‘ঢাকার কুকুর’ বলতে নজরুল আলী আকবরকে বুঝিয়েছেন এমন একটি বিভ্রম রফিকুল ইসলামের মতো নিষ্ঠ গবেষকের মনে কী করে তৈরি হলো, বুঝতে পারি না। এই ঘটনার সঙ্গে আলী আকবরের সুদূর-সম্পর্কও নেই। ঢাকার বনগ্রামে রানু সোমের (পরে প্রতিভা বসু) বাড়ি থেকে ফেরার সময় পাড়ার কিছু যুবক দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন নজরুল। চিঠিতে ‘ঢাকার কুকুর’ কথাটি এসেছে সেই প্রসঙ্গসূত্রে। আসলে মুজফ্ফর আহ্মদ তাঁর লেখায় আলী আকবরের যে ভাবমূর্তিটি তৈরি করেছিলেন, ধারণা করি তা-ই প্রভাবিত করেছিল পরবর্তী অনেক লেখক-গবেষককে।
জিয়াদ আলী নজরুল: অজানা কথা গ্রন্থে আলী আকবর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘নজরুলের বেহিসেবি ভাবালুতাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন নিজের সংকীর্ণ স্বার্থে। মনে করেছিলেন তাঁর সুন্দরী ভাগনি নার্গিসের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে নজরুলকে ঘরজামাই করতে পারলে সেই রূপকথার হাঁসের সোনার ডিম পাড়ার মতো নজরুলও তারিয়ে তারিয়ে গল্প-গান-কবিতা লিখে যাবেন। আর সেসব ছাপার একচেটিয়া অধিকার পেয়ে যাবেন আলী আকবর। সেই অঙ্ক কষেই ভুজুং ভাজুং দিয়ে তিনি নজরুলকে কুমিল্লা নিয়ে গেলেন উনিশ শ একুশের এপ্রিলে।’ এ রকম বিরাট এক চক্রান্তের জাল বিস্তার এবং সেই জালে নজরুলকে বন্দী করার কৌশলে আলী আকবরের সাফল্য একটু কষ্টকল্পিত মনে হয় না?
এরপর জিয়াদ আলী লেখেন, ‘ভরযৌবনে এডলোসেন্স আবেগে আলী আকবরের অঙ্কমতো নজরুল মজেও ছিলেন নার্গিস নামের সুন্দরী কিশোরীর শরীরী বৃত্তের মোহে।’
‘শরীরী বৃত্তের মোহে’—এই শব্দগুচ্ছের দিকে আলাদা করে তাকালে নজরুল-নার্গিস সম্পর্কটির প্রতি লেখকের অশ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। আবার তিনিই যখন প্রমীলা কাজী সম্পর্কে লিখছেন, ‘যে সামন্ততান্ত্রিক ধারণায় নারীকে শরীরী যৌনতার যন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু মনে করা হয় না, নজরুল সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে নারীর স্বাতন্ত্র্য ও সমানাধিকার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন অনেকটাই প্রমীলা দেবীর প্রেরণায়।’
কারও জীবনী লেখার সময় জীবনীকারের ঔচিত্যের বোধ যদি তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে না, নজরুলের মতো বাঁধনহারার জীবনকে সেই নিয়মে বাঁধা যায় না, বাঁধতে গেলে বিপত্তি আরও বাড়ে। নার্গিসের প্রেম ‘শরীরী বৃত্ত’ আর প্রমীলার কাছেই নজরুল জানলেন ‘যৌনতার যন্ত্র ছাড়াও নারীর অন্য মর্যাদা আছে’—এ রকম সরলীকরণকে আর যা-ই হোক নির্মোহ মূল্যায়ন বলা যায় না।
কেননা, এ কথাও তো আমাদের জানতে হবে, ‘নজরুল প্রমীলার বিয়ে হয়েছিল ১৯২৪-এর ২৫ এপ্রিল, তাঁদের প্রথম ছেলের জন্ম ১৯২৪-এর ২৩ আগস্ট। ডাক্তারি মতে, ৪০ সপ্তাহের মধ্যে কমপক্ষে ৩২ সপ্তাহ গর্ভধারণ না হলে কোনো সন্তান সাধারণত বাঁচে না। নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সন্তান হওয়ার কথা—সন্তান জন্মাল বিয়ের পাঁচ মাসের মধ্যে।’ (আজহারউদ্দীন খান, বাংলা সাহিত্যে নজরুল)।
নজরুলের জীবনীকারেরা পরস্পরকে আক্রমণ করেছেন। এমনকি নার্গিসের স্বামী কবি আজিজুল হাকিমও রেহাই পাননি তীব্র সমালোচনা থেকে। তাঁর অপরাধ, তিনি নার্গিসের কাছে গচ্ছিত নজরুলের চিঠি জনসমক্ষে প্রকাশ করেছিলেন।
জিয়াদ আলীর মতো কয়েকজন যেমন তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন তাঁদের মতাবলম্বীদের, তেমনি বিরুদ্ধ মতাবলম্বীরাও আক্রমণ করতে ছাড়েননি। মুজফ্ফর আহ্মদ সম্পর্কে হাস্যকর একটা প্রশ্ন উত্থাপন করেন তিতাশ চৌধুরী, ‘একটি কথা ভেবে অবাক হই যে মুজফ্ফর আহ্মদ কেন নজরুল-নার্গিসের বিরুদ্ধে এতটা নাখোশ ছিলেন? তিনি কি নজরুলকে জামাতা বানাতে চেয়েছিলেন, না তাঁর অন্য কোনো স্বার্থ ছিল?’ (কুমিল্লায় নজরুল স্মৃতি, প্রেম ও পরিণয়)।
নজরুলের জীবনে নার্গিস যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, এ কথা অস্বীকার করেননি কোনো লেখক-জীবনীকার। গুরুত্ব না থাকলে এ বিষয়টি নিয়ে এত কালি খরচ করতেন না তাঁরা। নার্গিসকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে গিয়ে আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে জীবনীকারদের দ্বিধাবিভক্তি নিয়ে। উপন্যাসের পাঠকের সামনে দুই ধরনের মতামত তুলে ধরে নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী প্রকৃত সত্য বেছে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যায় না। তাতে কাহিনি গতিহীন হয়ে পড়ে, চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে না। সে ক্ষেত্রে লেখক হিসেবে নিজেকেই বেছে নিতে হয়েছে পথ। সত্যি কথা বলতে কি, জন্ম ও কর্মসূত্রে কুমিল্লার মুরাদনগর ও দৌলতপুরে অবস্থান করেছেন কিংবা নার্গিসের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন এমন কয়েকজন অখ্যাত বা অনতিখ্যাত লেখক-গবেষকের লেখা ও মতামতকে অধিক মূল্যবান মনে করেছি আমি। তাঁদের লেখার গুণমান নয়, বরং তাঁদের মাঠপর্যায়ের গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি। উপন্যাসটির ইতিমধ্যেই কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে আরও একবার নজরুল সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ ও কৌতূহলকে উপলব্ধি করতে পেরেছি।
আজহারউদ্দীন খান আট শতাধিক পৃষ্ঠার গ্রন্থ (বাংলা সাহিত্যে নজরুল) রচনা করেও বলেছেন, ‘কবির জীবন সম্পর্কে নানা রকম ভুয়া গুজব আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে। সেই গুজবকে বিশ্বাস করে আজও অনেক মহলে কবির বিরুদ্ধে বিকৃত প্রচার চলে। অনেকে আবার নিজ স্মৃতির মাধ্যমে কবিকে দেখতে চেষ্টা করেছেন সেগুলি আরও বিপজ্জনক, কেন না তাতে কবির চেয়ে লেখক নিজের মোড়লি করেছেন বেশি।...তাঁর সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা ঘটনা এমন জট পাকিয়ে রয়েছে সে সত্য-মিথ্যা বেছে একটা পাকা নির্ভরযোগ্য জীবনী লেখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।...তাই কবির সম্পূর্ণাঙ্গ জীবনী এখনও রচিত হবার অপেক্ষায়।’
আমরাও নজরুলের একটি নির্ভরযোগ্য জীবনী, একজন সৎ পরিশ্রমী গবেষক, নির্মোহ জীবনীকারের অপেক্ষায় আছি।