বি. দ্র.: আমাদের এই গল্পটি নিরুকে নিয়ে। ১৯৮৫ সালে নিরুর বয়স ছিল ১৬। পারিবারিক আর্থিক অসংগতির কারণে তখন তাকে রোজ একটি করে পাত্র দেখানো হতো। পরিবার থেকে মনে করা হতো বিদেয় হলেই বাঁচি।আমরা তিন বোন। বোনদের ভেতর আমার অবস্থান তৃতীয়। আমার বড় বোনের নাম মনোয়ারা। আমরা ডাকি তাকে মুনি আপা বলে। আমার মেজ বোনের নাম, কোনো এক বিচিত্র কারণে, নিরুপমা। আমি তাকে ডাকি নিরু আপা বলে। নিরুপমা নামের এই বিচিত্র স্বভাবটির জন্য আমাদের প্রায় বিপদে পড়তে হয়। কেউ যখন তার ভালো নামটি জানতে চায়, তখন আমাদের মুখগুলো খানিকটা দিশেহারার মতো হয়ে যায়। কারণ আমাদের কাছে মনোয়ারার ছোট বোন আনোয়ারা না হয়ে নিরুপমা হওয়ার মতো কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর নেই।মুনি আপা, যাকে নিয়ে আমরা মনে মনে গর্ব বোধ করি, তখন সে মুখে হাসির প্রশস্তি ছড়িয়ে দুটো ঢোক গেলে। ঢোক গেলার কারণ মুখ থেকে দিশেহারা ভাবের প্রথম ধাক্কাটি সামলে নেওয়া। নিজেকে সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে মুনি আপা বলে, ও নিরুর কথা বলছেন?প্রশ্নকর্তা ভদ্রলোক হয়তো মাথা ঝাঁকালেন।হুম। নিরুর কথা বলছি।মুহূর্তে মুনি আপার চোখগুলো গল্পে গম্ভীর হয়ে ওঠে।আসলে আমার বাবা একজন বিচিত্র ধরনের মানুষ ছিলেন। তিনি কখন কাকে কী নাম দেবেন বোঝা মুশকিল। যেমন একদিন হঠাৎ করেই তিনি আমাদের নিঝুর নামটা বদলে ফেললেন। নিঝু কে বুঝতে পারছেন তো?না।আমাদের বিড়ালটা।ও।কথা নাই বার্তা নাই হঠাৎ একদিন বাবা তার নতুন একটা নাম দিয়ে দিলেন। নামটি কি শুনবেন?শুনি।জুতাখোর। হি হি। কারও নাম কি জুতাখোর হতে পারে? কিন্তু আমার বাবার কাছে জুতাখোর নামও সম্ভব। হি হি।যিনি প্রশ্ন করছেন তিনি পাত্রপক্ষের একজন খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। জুতাখোর জাতীয় নাম শোনার সাথে সাথে তার গলায় একটা কাশির মতো শব্দ তৈরি হয়ে গেল। তিনি খুক খুক করে কাশতে শুরু করলেন।আমাদের সংসারে শুধু আমার বাবাই একজন বিচিত্র ধরনের মানুষ নন, মা ছাড়া কম-বেশি আমরা সবাই বিচিত্র ধরনের মানুষ। মা-ই একমাত্র মানুষ যিনি পৃথিবীর সব কথায় গুরুগম্ভীর থাকতে পছন্দ করেন এবং পাত্রী দেখতে আসা সব পাত্রের ভেতর প্রতিভা খুঁজে পান। যা হোক জুতাখোরের কথা বলি।মা গল্পের এই পর্যায়ে ধমক দিয়ে উঠলেন, মিনু! এসব কী ধরনের কথা? জুতাখোর আবার কোন ধরনের শব্দ? কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তাও ভুলে গেছিস?কিন্তু এসব জায়গায় আমরা বোনেরা বড়ই ত্যাঁদড় (মায়ের ভাষায়), কাউকে একবিন্দু ছাড় দিতে প্রস্তুত নই। যিনি একটু কাশি তোলেন তাঁকে আরও কিছুটা কাশি তোলার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই তখন আমাদের একমাত্র কাজ।মায়ের কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মিনু আপা আমার মধ্যে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় হয়। এরমানে এটা অনুমতি চাওয়ার ইঙ্গিত।মিনু আপা তার ইঙ্গিতের হ্যাঁ-সূচক অনুমতিটি পেয়ে জুতাখোর শব্দটিকে ব্যাখ্যা করতে শুরু করল।হয়েছে কি, একদিন বাবা সবেমাত্র ঘরে ফিরেছেন। সাধারণত তিনি ঘরে ফিরলে বিছানায় গিয়ে কিছুক্ষণ আরাম বিশ্রাম করেন। আজও তিনি গেলেন বিছানায় আরাম বিশ্রাম করতে। কিন্তু বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে আগে একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটে গেল।বিশ্রী কাণ্ড?হুম। বিছানার কম্বল উঠিয়ে যেই না তিনি শুতে যাবেন, দেখলেন আমাদের নিঝুটা বিছানায় কিছু বিষ্ঠা মেখে রেখেছে। হি হি। তাও আবার ওই লাঠি বিষ্ঠা! লাঠি লজেন্সের নাম শুনেছেন না? কার কবিতায় যেন লাঠি লজেন্সের কথা আছে? লাঠি লজেন্সের মতো লাঠি বিষ্ঠা। হি হি।ভদ্রলোকের আবারও কাশি শুরু হয়ে গেল। খুক। খুক। আর সাথে সাথে আমাদের মায়ের মুখটি হয়ে গেল অধিকতর গম্ভীর।মা বললেন, আপনি কিছু মনে করবেন না ভাই। মেয়েগুলো হয়েছে ফাজিল। এই সবই বানানো গল্প। ওর বাবা নিতান্ত ভদ্র মানুষ। জীবনেও এই জাতীয় শব্দ তিনি মুখে আনতেন না। মুখে আনবেন কি, পথেঘাটে শুনলেও তিনি রাগ করতেন। তার ছিল রাগের স্বভাব।ভদ্রলোকের সাথে যিনি এসেছেন, মায়ের সেই প্রতিভাবান পাত্র, তার তখন উঠি উঠি অবস্থা। সত্য বলতে কি আপার লাঠি বিষ্ঠা জিনিসটা আমার নিজের কাছেও নতুন। এর আগে যতবার এসব ধরনের গল্প হয়েছে, কোনোটাতেই এই জাতীয় জিনিসটা ছিল না। সুতরাং ভদ্রলোক যাকে দেখতে এসেছেন, নিরু আপা, যাকে মা ভেতর ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কড়া কিছু নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, যেমন খবরদার মুখ খুলবি না, চুপচাপ বসে থাকবি। ঠিক আছে?নিরু আপা বলল, আচ্ছা। মা আবারও বললেন, বেশি কথায় উত্তর দিবি না। ঠিক আছে?নিরু আপা বলল, আচ্ছা।মা আরও কঠিন কণ্ঠে বললেন, শুধু শুধু দাঁত কেলিয়ে ওদের সামনে হাসবি না।নিরু আপা প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন, আচ্ছা। হাসব না।দেখলাম সেই নিরু আপাও খিকখিক করে মুনি আপার বিচিত্র এই উদ্ভাবনটির প্রতি হেসে ফেলল।মুনি আপার গল্প ক্রমশ প্রশস্ততর হচ্ছে।ওই লাঠি মার্কা জিনিসটা দেখে বাবার মেজাজ গেল চড়ে। তিনি এই ঘর সেই ঘর নিঝুকে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলেন।নিরু ছিল বসার ঘরে। বই পড়ছিল। সে বলল, বাবা তুমি কি কিছু খুঁজছ?রাগে তখন বাবার হাত কাঁপছে।জুতাখোরটাকে খুঁজছি। গেল কই জুতাখোরটা?জুতাখোর কে বাবা?জুতাখোর হচ্ছে জুতাখোর। ওর নাম আজ থেকে জুতাখোর! জুতাখোরের বাচ্চা জুতাখোর।বাবা দর দর ঘামতে থাকলেন। মুহূর্তের ভেতর বাসার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠল। কারণ বাবা আসলেই ভয়ংকর রাগী মানুষ ছিলেন।গল্পের এই পর্যায়ে মা আবারও ধমক দিলেন, থাম তো। এসব কী শুরু করছিস? মিনু আপা থামল না। যথারীতি সে তার গল্পের চাড় ফেলতে থাকল।এরপর বাবা জুতাখোরকে সোফার আড়াল থেকে টেনেহেঁচড়ে বের করলেন। তারপর ওকে বেদম প্রহার শুরু করলেন।প্রহার শুরু করলেন?জি। ভদ্রলোক বোধহয় কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। কিন্তু তারপর কী হয়েছে জানেন?কী?ও আমাদের বাসায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিল। বন্ধ মানে, বন্ধ। মানুষের মতো পশুপাখিদেরও রাগ-অভিমান আছে। বাবা দুধ দেয়, ও খায় না। মা মাছের মাথা দেয়, ও খায় না। নিরু কত মাথা চুলকিয়ে দেয়, তাও না। ক্ষিধে লাগলেই সে গুটি গুটি পায়ে চলে যায় রাস্তার ওই পাশের হায়াত হোটেলে।হোটেলে?ওখানকার উচ্ছিষ্টগুলো খেতে যায়। তারপর একদিন হঠাৎ একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেল।ভয়ংকর ঘটনা?ঘটনা শোনার জন্য ভদ্রলোকের চোখের দৃষ্টি এখন স্থির হয়ে আছে।নিঝু রাত একটার দিকে উচ্ছিষ্ট খেয়ে বাসায় ফিরছিল।তারপর?রাস্তা পার হতে গিয়ে দ্রুতগামী একটা ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে গেল!ভদ্রলোক আবারও কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। অজানা কোনো কারণে তিনি এখন মিনু আপার প্রতি মমতা অনুভব করছেন। মানুষ যখন মানুষের প্রতি মমতা অনুভব করে তখন তার চোখগুলো কোমল হয়ে যায়। ভদ্রলোকের চোখগুলোও কোমল হয়ে গেল। তিনি কোমল চোখ নিয়ে বললেন, তখন তোমাদের খুব মন খারাপ হয়েছিল, তাই না মা?হুম।নিঝুকে তোমরা খুব ভালোবাসতে, তাই না মা?হুম।আমি খেয়াল করলাম মায়ের ডান পাশ থেকে এবার নিরু আপাও মাথা নাড়ছে।হুম।আমি মুনি আপার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপা তুমি স্যারকে পুরো গল্পটা বলবে না?ভদ্রলোক বললেন, আমি তোমার বাবার বড় ভাইয়ের মতো। স্যার বলতে হবে না। বড় চাচাই ডাকবে।আপা বলল, বাসার সবারই মন খারাপ। সবচেয়ে বেশি মন খারাপ বাবার। বাবা এর কাছে যান ওর কাছে যান, একে ধরেন ওকে ধরেন, কিন্তু কোনো কাজ হয় না। তারপর একদিন বাবা একটা আজব পাগলামি করে বসলেন।পাগলামি?হুম। তিনি আমাদের বাসার সামনে একটা প্লেকার্ড হাতে অনশনে বসে পড়লেন। প্লেকার্ডে লেখা, স্টপ ডেঞ্জারাস ড্রাইভিং। স্টপ কিলিং।তারপর?বাবা সত্যি সত্যি দুটো দিন কিছু না খেয়েই ছিলেন। তার শরীর ভেঙে পড়ল। তৃতীয় দিন আমরা তিন বোনও বাবার সাথে অনশনে যোগ দিলাম। নিরু কখনো ক্ষুধা সইতে পারে না। সেও না খেয়ে থাকল। ভয়ংকর অনশন শুরু হয়ে গেল।তারপর?সেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি। আমরা চারজন বৃষ্টিতে বসে ক্ষুধায় ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছি। দেখলাম হঠাৎ গাড়ি থেকে একটা লোক নামলেন। যিনি নামলেন তাকে আমরা চিনি। তিনি আমাদের এলাকার মেম্বার সাহেব। মেম্বার সাহেবের নাম জয়নুল আবেদিন। আমরা তাকে জয়েন কাকা বলে ডাকি।জয়েন কাকা বাবাকে বললেন, তোমার ব্যথাটি আমি বুঝি। কিন্তু যেখানে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মানুষ মরলে কিছু হয় না, সেখানে বিড়াল মরলে একটা কিছু হয়ে যাবে, তা তো হওয়ার কথা নয়। নিরু ততক্ষণে ক্ষুধায় বাঁকা হয়ে গেছে। তার হাত-পা বিবর্ণ হয়ে আসছে।বাবা বললেন, জয়েন, তুমি কি এটা বলতেই এখানে এসেছ?জয়েন কাকা বললেন, চলো আমার সাথে। আমার মেয়েগুলোকে আর কষ্ট দিয়ো না। তোমাকে আমি কথা দিচ্ছি এখানে রাস্তায় আমি একটা স্পিড ব্রেকারের ব্যবস্থা করে দেব। ট্রাস্ট মি।জয়েন কাকার কথায় আমারা সবাই আবেগার্দ্র হয়ে গেলাম। আমাদের অনেক আনন্দ হলো। আমরা আমাদের ক্ষুধার্ত শরীর নিয়ে নিঝুম বৃষ্টিতে লাফালাফি শুরু করলাম। প্রতিটা দাবি আদায়ের একটা আনন্দ আছে। আমরা যেন সেই আনন্দে ভাসছি।গল্পের এই পর্যায়ে বোধ হয় নিরু আপা কাঁদছে। মা নিরু আপাকে জড়িয়ে ধরে আছেন। একটু পরপর তার নাক টানার শব্দ হচ্ছে। মা খুব আবেগঘন হয়ে নিরু আপার গালে চুমু খেতে খেতে বললেন, কাঁদছিস কেন মা? কাঁদছিস কেন? শুধু নিরু আপা না দেখলাম মিনু আপার চোখেও জল।ভদ্রলোক মিনু আপার দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বললেন, নিরুপমা কাঁদছে কেন?মিনু আপা চোখ মুছল।কারণ সেটাই ছিল বাবার সাথে আমাদের শেষ আনন্দ দিবস। সেদিন রাতে জাঁকিয়ে বাবার শরীরে জ্বর এল। তার শরীর থেকে সেই জ্বর আর নামল না। ওষুধ খেতে খেতে তার জিভ কাল হয়ে গিয়েছিল।তারপর?একদিন সন্ধ্যার অবিরাম বর্ষণের সময় আমাদের বাবা মারা গেলেন।আমি অবাক হয়ে আমার দুই বোনের দিকে তাকিয়ে আছি। তারা দুজনেই একটু পরপর হাতের বাহু দিয়ে চোখের পানি মুছছে। শুধু তারা নয়, আমার মাও বারবার চোখ জোড়াকে আড়াল করছেন। আমি বুঝতে পারলাম মিনু আপার মিথ্যা বানানো এই গল্পটা আমাদের সবাইকে এখন সুখ এনে দিচ্ছে। আমরা এখন অথৈ এক সুখসমুদ্রে ভাসছি। তাহলে সত্য গল্পটা কী দরকার মনে রাখার?আমি সত্য গল্পটা মন থেকে মুছে ফেলতে চাইলাম। মুছে ফেলার আগে গল্পটা তাহলে আবারও একটু বলি।ওটা যুদ্ধের কাল। একাত্তর। আমার বাবাকে ওরা মাথায় পরপর তিনটি গুলি করেছিল। আমরা তখন বাবার আদরের ফুটফুটে তিনটি কন্যা। আমাদের বয়স খুবই অল্প। এত অল্প স্মৃতি ধারণ করার মতো শক্তিও আমাদের হয়নি।বাবাকে নিয়ে আমাদের স্মরণে কোনো স্মৃতি নেই। কিন্তু স্মৃতি না থাকারও একটা সুবিধা আছে, আমরা যখন-তখন নিজেদের ইচ্ছেমতো বাবাকে ঘিরে স্মৃতি তৈরি করে ফেলতে পারি। এটাও কম কিছু নয়।পাত্রপক্ষের ভদ্রলোক মনে হয় কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন। কী করবেন বুঝতে পারছেন না।মা বললেন, ভাই সাহবে কিছু মনে করবেন না। আমার মেয়েগুলোর মাথায় একটু দোষ আছে। ওরা এখন হাসতে পারে এখন কাঁদতে পারে। আমি আছি ওদের নিয়ে মহা যন্ত্রণায়! ভদ্রলোকেরা চলে যাওয়ার পর আমার মা আমাদের তিন বোনকে বুকে গভীরভাবে আগলে ধরলেন। আমরা তিন বোন, আজ আমাদের হূদয়ে পদ্মমৃত্যুর কাল।