যোগেন চৌধুরীর ডহরপাড়া

গত মাসে যোগেন চৌধুরী গিয়েছিলেন তাঁর পৈতৃক ভিটা গোপালগঞ্জের ডহরপাড়ায়। সে সফরে সঙ্গে ছিলেন নাসির আলী মামুন। তাঁর বয়ানে উঠে এসেছে যোগেন চৌধুরীর অন্য এক অবয়ব

নিজের পৈত্রিক ভিটায় যোগেন চৌধুরী ষ ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম
নিজের পৈত্রিক ভিটায় যোগেন চৌধুরী ষ ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম

জীবিত বাঙালি শিল্পীদের মধ্যে যোগেন চৌধুরী শীর্ষে আরোহণ করেছেন ভেবে আনন্দিত হওয়ার বড় কারণ, তাঁর জন্ম বাংলাদেশের তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার কোটালীপাড়া থানার ডহরপাড়া গ্রামে। পশ্চিমের নিলামঘরগুলো যেমন রবীন্দ্রনাথের ছবির অবিশ্বাস্য দর হাঁকে, অনেক বছর ধরে যোগেনের শিল্পকর্মও তেমনই নিলামে উঠছে। এই খ্যাতিমান বাঙালির জন্য এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, আমাদের অহংকারের জায়গাটিও পোক্ত হয় তাঁর আন্তর্জাতিক সাফল্যের বাস্তবতাটি আমলে নিলে।
১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯-এ জন্ম নেওয়া এই শিল্পী জন্মভিটা ডহরপাড়া ছেড়ে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন সেই ১৯৪৭ সালে। তাঁর প্রথম পাঠশালা শৈশবের গ্রাম। এখনো শৈশবের ডহরপাড়ার স্মৃতি তাঁর চোখে অমলিন।
এ বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতার সিমা গ্যালারিতে হাজির হয়েছিলাম তাঁর ছবির প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। দু-দিন পর শান্তিনিকেতনে দেখা করতে গেলে পরিকল্পনা হলো, তিনি বাংলাদেশে আসবেন।
অতঃপর ২ মার্চ তিনি এলেন ঢাকায়। পরদিন ৩ মার্চ ভোরে কোটালীপাড়ার উদ্দেশে মাওয়া ফেরিঘাট হয়ে আমরা রওনা দিলাম যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে। আমাদের দলে আছেন কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত, ভারতের চিত্রসমালোচক অরুণ ঘোষ এবং যোগেনের ওপর বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া দিল্লির সুনীল যশমান।
আমাদের ফেরি পদ্মার ওপর দিয়ে চলতে শুরু করলে অন্য এক যোগেনকে দেখতে পেলাম। যা কিছু তাঁর হূদয় স্পর্শ করছে, ক্যামেরা হাতে ছবি তুলছেন সেসবের। তিনি যখন ক্যানন মার্ক টু ক্যামেরাটি গলায় ঝুলিয়ে পদ্মায় ফেরি থেকে ছবি তুলছিলেন, তখন কে বলবে, তিনি একজন চিত্রশিল্পী!
তাঁকে বললাম, এপ্রিলে কলকাতায় আপনার তোলা ফটোগ্রাফের একক প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে। সেখানে এই ভ্রমণের কিছু ছবি রাখলে প্রদর্শনীটি নতুন মাত্রা পাবে। কথাটি মানলেন। জানালেন, এ সফরের কিছু ছবি তিনি সেখানে রাখতে চান।
আমাদের যাত্রা চলছে। যোগেন চৌধুরী বললেন, ডহরপাড়ায় হয়তো তাঁর আর আসা হবে না। ২২ বছর আগে সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখেছেন কিংবা তারও বহু আগে শৈশবে যে স্মৃতিচিহ্ন ও স্থাপনাগুলো ছিল, সেগুলো না দেখতে পেলে স্মৃতিগুলো সুপারইম্পোজ্ড্ হয়ে ভারাক্রান্ত করে তোলে মন।

নাসির আলী মামুনের ছবিতে যোগেন চৌধুরী লিখেছেন তাঁর অভিব্যাক্তি

তাঁর মুখে এ কথা শোনার পর ভাবলাম এই যাত্রাটিকে আরও স্মৃতিময় করলে কেমন হয়! ব্যাগ থেকে বের করলাম অটোগ্রাফ খাতা। শিল্পীকে অনুরোধ করলাম পদ্মার ছবি আঁকতে। অমনি বড় খাতাটি কোলের ওপর তুলে নদীদৃশ্যের ছবি আঁকতে বসলেন তিনি। শেষে তাঁর সফরসঙ্গী আমাদের সবার নাম লিখলেন ছবির নিচে। এরপর কাঁধের ব্যাগ থেকে স্মার্টফোন বের করে ভিডিও করতে শুরু করলেন। ফেরিতে কাটল আড়াই ঘণ্টা। এই ভ্রমণকে আরও স্মৃতিময় করার জন্য আমি তখন দুরন্ত শিকারি। যোগেন চৌধুরীর প্রতিটি মুহূর্ত ডিজিটাল ক্যামেরার ইমেজ সেন্সরে রেকর্ড করে রাখছি।
অবশেষে আমরা পৌঁছালাম বহু প্রতীক্ষিত ডহরপাড়ায়। তারপর পড়ন্ত দুপুরে হেঁটে নিজের শৈশবের স্মৃতিচিহ্নগুলো খুঁজতে বের হলেন যোগেন চৌধুরী। এই যোগেনকে আমরা কখনো দেখিনি। আমাদের কাছে অনর্গল শৈশবের বর্ণনা করছেন যোগেন চৌধুরী। সে বর্ণনায় প্রায় সাত দশক আগের কোটালীপাড়ার ভূগোল আমাদের চোখের সামনে। ডহরপাড়ার কোথায় কার বাড়ি ছিল, বাড়ির পাশে পূজামণ্ডপ, পুকুর, বাগান, বাঁশঝাড়—সবই টাইম মেশিনে চড়ে যেন ফিরে আসতে লাগল। ছোটবেলাকার স্মৃতি বারবার টেনে আনছেন তিনি। কোনো ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে শুধরে দিচ্ছেন তাঁর জ্ঞাতিভাই গৌরাঙ্গলাল।
ফুরফুরে হাওয়া, বিকেল হতে যাচ্ছে। পাখি ডাকছে—ঘুঘু, শালিক আর কাক। আমি ছবি তুলছি আর দেখছি, জন্মভূমিতে এসে কেমন করে হারিয়ে যাচ্ছেন খ্যাতিমান এই চিত্রশিল্পী।
না, শৈশবের তেমন কোনো চিহ্ন বা স্থাপনা পাওয়া গেল না। কিন্তু তাতে কী? যোগেন বিস্মিত, আনন্দিত ও মোহিত। পুরোনো চিহ্ন বলতে তিনি কেবল খুঁজে পেলেন বড় দিঘি, বাড়ির আঙিনার ফুলপুকুর এবং তীব্র স্মৃতিবিজড়িত বাঁশবাগান। আমাদের জানালেন, ‘এই বাঁশঝাড়ের কঞ্চি কেটে মোটা তার দিয়ে বড়শি বানিয়ে পুকুরে মাছ ধরতাম।’
এ সময় আমার মনে হলো, এখন তিনি এমন আরেকটা ছবি আঁকুন, যেখানে স্বাক্ষরের পাশে লেখা থাকবে ডহরপাড়া। সম্মত হলেন শিল্পী। পুকুরপারের এক বাড়ি থেকে চেয়ার এনে বসতে দিয়ে তাঁর হাতে দিলাম মোটা একটা কালো কলম আর খাতা। তিনি আঁকলেন চোখের সামনে শিশুগাছের পাতায় পড়ন্ত রোদ। স্বাক্ষরের পর লিখলেন ‘ডহরপাড়া’। বন্দী হয়ে রইল আবেগমাখা একখণ্ড ইতিহাস।
ফেরার সময় পাশের গ্রাম উনাশিয়ায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈতৃক ভিটা, সিদ্ধান্তখোলা কালীবাড়ি ইত্যাদি পার হয়ে রওনা দিলাম রাজধানী ঢাকার দিকে। ডহরপাড়া পেছনে ফেলে যোগেন চৌধুরীর স্মৃতিময় স্থান ঘাগর নদের ওপর দিয়ে সেতু পার হওয়ার সময় গাড়ির গতি ধীর হয়ে এল। সূর্য তখন ডুবছে। যোগেন চৌধুরীর চোখের কোণে স্মৃতির তীর্থস্থান ফেলে আসার এক ফোঁটা বেদনা: ডহরপাড়া, আর কি দেখা হবে এ জীবনে?