শাহ আবদুল করিমের ঘরানা বাহিরানা ও বাউলিয়ানা

এক ‘বসন্ত বাতাসে’ ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মেছিলেন শিল্পী শাহ আবদুল করিম। এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষ

শাহ আবদুল করিম (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬-১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯), ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম
শাহ আবদুল করিম (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬-১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯), ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম

শাহ আবদুল করিম জন্মানোর মাত্র পাঁচ বছর আগে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গের তরফে আন্দোলন এবং কলকাতা-নিবাসী বাংলার সাংস্কৃতিক আইকনদের প্রতিরোধের মুখে। অখণ্ড বঙ্গের সিগনিফায়ার হিসেবে তাঁরা যেসব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যুক্তির অবতারণা করেছিলেন, বাংলার বাউল ছিল তার একটি। বলাবাহুল্য, বাংলাকে প্রতিনিধিত্ব করার কোনো এজেন্ডা বাউলসাধক লালনের ছিল না। তিনি জাতীয়তাবাদী ছিলেন, এমন সাক্ষ্য তাঁর রচনায় পাওয়া যায় না। বরং একটি গোষ্ঠীবদ্ধতার মধ্যে দর্শনচর্চা করেছেন, ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্ন তুলেছেন। সংগীত ছিল তাঁর ভাবনা প্রকাশের হাতিয়ার। কালক্রমে সেই বাউলসংগীতই হয়ে উঠল ঠাকুরবাড়ির জাতীয়তাবাদী মেনিফেস্টো রচনার উপকরণ। বঙ্গভঙ্গের সাম্প্রদায়িক থিসিসের সাংস্কৃতিক অ্যান্টিথিসিস। কিন্তু এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নিম্নবর্গের সমর্থন ছিল। সেটা ছিল হিন্দু জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের কৃষকচৈতন্যের স্ফূরণ, অংশত হলেও। সেই দাবি অগ্রাহ্য করার উদ্দেশ্যেই প্রথমবারের মতো শিক্ষিত হিন্দু-ব্রাহ্ম সমভিব্যাহারে বাউল পরিবেশিত হলো সুধীসমাজে। একটি প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর দাবি অগ্রাহ্য করার জন্য ব্যবহৃত হলো অন্য এক প্রান্তীয় জনগোষ্ঠীর দর্শন ও জীবনচর্চা।
ইতিহাসের এই এক পরিহাস। ঠাকুরবাড়ির এই দুতিয়ালিটুকু বাদ দিলে বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণের রাজনৈতিক লড়াইয়ে লালন যে খুব শামিল ছিলেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। আবার সাংগীতিক তৎপরতার বাইরে বাউল যে একটা জীবনাচরণ, সে বিষয়টি বাউলের পরিবেশক রবীন্দ্রনাথ খুব ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি। ফলে বাউলের সঙ্গে বাঙালিয়ানার এই যোগাযোগ ছিল খণ্ডিত এবং অনেকখানি রাজনৈতিক। পরবর্তী সময়ে, বাঙালিয়ানা ও বাউলিয়ানার মধ্যে এহেন স্বতঃস্ফূর্ত যোগাযোগটুকু তৈরি হলো যাঁদের মাধ্যমে, শাহ আবদুল করিম তাঁদের পুরোভাগে।
ফলে শাহ আবদুল করিম বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আইকন। তিনি বাউলশিল্পী। অবশ্যই তাঁর বাউলিয়ানা ছেঁউড়িয়ার অর্থোডক্স বাউলিয়ানা থেকে ভিন্ন ধাঁচের। অর্থোডক্স বাউল যেখানে তাঁর ধর্মচর্চার অংশ হিসেবে সংগীতচর্চা করেন, শাহ আবদুল করিম সেখানে গানের দুতিয়ালিতে বাউলধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। ফলে স্বভাবতই তাঁর বাউলিয়ানা খানিকটা ঢিলেঢালা, সংগীতশাসিত। কিন্তু এটি শুধু তাঁর একার ক্ষেত্রেই ঘটেছে এমন নয়। হাছন রাজা, উকিল মুন্সী, রাধারমণসহ আরও বহু সংগীতকার এ ধরনের বাউলিয়ানার চর্চা করেছেন। তাঁদের সবারই গানের জমিন ছিল বিস্তীর্ণ, লোকগানের নানা রীতি, যেখানে তাঁদের বাউলগানের চর্চার ভেতর মিশে গেছে। শাহ আবদুল করিমের ক্ষেত্রে সেটি আরও বিস্তৃত। তিনি গানের জগতে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন লোকগান ও বাউলগানের ঠিক মাঝখানে। দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মবাদ তাঁর গানের প্রিয় প্রসঙ্গ, কিন্তু সেখান থেকে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেছেন সমাজমনস্কতা ও শ্রেণি রাজনীতির মধ্যে। ফলে তাঁর গানের ভুবন তৈরি হয়েছে লোকগান, বাউলগান ও গণসংগীতের সমবায়ে। রবীন্দ্রনাথ যখন বাউলকে অখণ্ড বঙ্গের সিগনিফায়ার হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন, তখন তিনি সম্ভবত এমনই একটি জাতীয়তাবাদী চেহারা কল্পনা করেছিলেন বাউলিয়ানার। শাহ আবদুল করিমে সেই বাঙালিয়ানার দেখা পাওয়া গেল, বাউলিয়ানা যার স্বতঃস্ফূর্ত অংশ।
বলা হয়, শাহ আবদুল করিম বাউল ঘরানার শিল্পী। কিন্তু করিমের যে বাউলিয়ানা, তাকে ‘ঘরানা’র ঘেরাটোপে আটকানো কঠিন। লোকগানের ঐতিহ্যে ঘরানা মানানসই কোনো প্রস্তাব নয়। বরং শাস্ত্রীয় সংগীত ঘরানা-নির্ভর। তার সেই ঘরানা তৈরি হয় ওই বিশেষ সংগীতের কথা, সুর কিংবা গায়কী—এমনকি শিল্পীদের বেড়ে ওঠা, জীবনাচরণ এবং শ্রোতৃমণ্ডলীর বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিবেচনায়। শাস্ত্রীয় সংগীতের যেহেতু শুদ্ধতার অভিমান আছে, সেহেতু সাংগীতিক পরিসরে তার মেলামেশা খুবই দাপ্তরিক। লোকসংগীতের এহেন শুদ্ধতার অভিমান নেই। বিভিন্ন লোকগানের ফর্ম, কথা সুর গায়কীর আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে বটে, কিন্তু নিজেদের মধ্যে মেলামেশা প্রায় সব ধরনের ট্যাবুরহিত। এই জিনিসটা খেয়াল করেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছিলেন, লোকসংগীতের কোনো ঘরানা নেই, আছে ‘বাহিরানা’। ভেতরে সাজায় না সে, বরং বাইরে ছড়ায়। নানা ধারায়, নানা চর্চায় নিজেকে ছড়িয়ে রাখে। ফলে লোকগানের এই বিস্তৃত চর্চায় আপনি বাউলের মধ্যে ভাটিয়ালি পাবেন, ভাটিয়ালির মধ্যে দেহতত্ত্ব পাবেন, দেহতত্ত্বের মধ্যে ভাওয়াইয়া পাবেন, ভাওয়াইয়ার মধ্যে বিচ্ছেদ পাবেন, বিচ্ছেদ গানে মালজোড়া পাবেন, মালজোড়ার মধ্যে কবিগান পাবেন, কবিগানের মধ্যে বাউল পাবেন। এখন কথা হলো, এমন বিস্তীর্ণ মেলামেশার মধ্যে আপনি জাঁর শনাক্ত করবেন কীভাবে? হেমাঙ্গ বলছেন, আপনি জাঁেরর বিকাশ খুঁজবেন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরে। অর্থাৎ মেলামেশা যতই হোক, লোকগান মূলত অঞ্চলভিত্তিক। ভৌগোলিক চারিত্র মেনে চলে। এটাই বাহিরানা, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ভাষায়। হোমি ভাবা হলে বলতেন হাইব্রিডিটি। সমাজের বা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বদলগুলো প্রান্তিক পরিসরেই ঘটে।
কিন্তু বাউলদর্শন চর্চার অংশ হিসেবে বাউলসংগীতের যে চর্চা আমরা লালনে দেখি, বাউলের গোষ্ঠীবদ্ধতার কারণে একে ‘ঘরানা’ ভাবায় দোষ দেখি না। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে ইত্যাকার লোকগানের চর্চার মধ্য দিয়ে বাউলের ভাবধারা যেভাবে বয়ে গেছে, তাতে বাউলকে আর গানের একক কোনো ‘ঘরানা’রূপে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। বাউলগান পরিণত হয়েছে বাহিরানায়। এটাকেই আমরা ‘বাউলিয়ানা’ বলতে পারি। শাহ আবদুল করিমের সাংগীতিক ভ্রমণ এই মেলামেশারই মেনিফেস্টো। এহেন হাইব্রিড চর্চাকে ‘বাউলা গান’ বলার যে রেওয়াজ গড়ে উঠেছিল, তার প্রণোদনা থেকেই শিল্পীদের ‘বাউল’ বলা হয়, এমন অনুমান কারও কারও লেখায় দেখি। তার ঐতিহাসিক তথ্য নির্ভরতা না থাকলেও এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে বাউলের যে অর্থ ছেঁউড়িয়ায় তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে গানের আসরে, আলাপে, পার্বণে তা অনেক দূর পাল্টে গেছে। এভাবেই সেই ‘বাউলা গান’ হয়ে উঠেছে বাংলা গানের মেল্টিং পট, যার মধ্যে মিশেছে সব ধরনের লোকগান, মারেফতি, বাউলগান ইত্যাদি। শাহ আবদুল করিমের যাঁরা অনুসারী, তাঁদের গানের চর্চা খেয়াল করলে দেখবেন, ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে এই মেল্টিং পটের আয়তন। এখন তা এমনকি জায়গা দিচ্ছে পপুলার গানের ধরনগুলোকে, এমনকি হিন্দি উদুর্গানও এই মনোযোগের বাইরে নয়। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটা বিপুল অংশ এই বাউলগানের শ্রোতা এবং সংগীত বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো এই ধারার গানের দখলে। ফলে বাউলগান বলতে যদি আপনি এখনো ছেঁউড়িয়ায় বা অর্থোডক্স বাউল আখড়ায় গাওয়া গান বুঝতে চান, তবে আপনি আসলে জলের ওপরে হিমশৈলের চূড়াটুকু কেবল দেখতে পাচ্ছেন।
শাহ আবদুল করিম এই বদলে যাওয়া বাউলা গানের প্রবর্তকদের একজন। তাঁকে যে ‘বাউল সম্রাট’ ডাকা হয়, এটাও অনেকের আপত্তির কারণ। বৈধ কারণ নিঃসন্দেহে। কিন্তু নিহিতার্থটুকু তো বুঝতে হবে। অবশ্যই বাউলধর্ম কোনো সাম্রাজ্যবাদী ধর্ম নয় যে তার সম্রাট থাকবে। বাউলধর্ম মূলগতভাবেই শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার পরিপন্থী, ধর্ম-বর্ণবিভাজনের বিপক্ষে। সেখানে করিম সম্রাট হতে গেলেন কেন? যাঁরা এটা বলেন, তাঁরা মনে হয় ভুলে যান যে এই অভিধা করিম নিজেকে নিজে দেননি। ফলে এর দায়দায়িত্ব তাঁরা করিমের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোশেশ করেন। তাঁরা হয়তো এটাও ভুলে যান যে রাঢ় বাংলায় জন্ম নেওয়া বাউলগান তথা বাউলধর্ম বাংলার নদনদী বেয়ে যখন ভাটিতে এসে পৌঁছাবে, তখন তার চেহারা আগের চেহারা থাকবে না। সম্রাট আদরের ডাক। সম্রাট তো বহু মানুষের নামও আছে, তাতে তারা অন্যান্য সম্রাটকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন না নিশ্চয়ই!
শাহ আবদুল করিমকে যদি অথেনটিক বাউল মানতে আপত্তি থাকে, সে আপনার বিবেচনা। কি জীবনে, কি গানের চর্চায়, তিনি বাউল ঘরানার লোক হয়ে থাকেননি। বরং তাঁর পূর্বসূরিদের মতো হয়ে গিয়েছেন বাউল-বাহিরানার মানুষ। ভাটি বাংলার ভাটিয়ালি তাঁর বাউল মেজাজ গড়ে দিয়েছিল, আর মানুষের দারিদ্র্য আর অসহায়ত্ব তাঁকে বেদনাদীর্ণ করে ভাবিয়েছিল। গানে তিনি কেবলই দর্শনচর্চা করেননি, গানকে সমাজবদলের হাতিয়াররূপেও ব্যবহার করার কোশেশ করেছেন। ফলে তিনি যখন তাঁর গানকে ‘বাউলা গান’ বলেন, তখন আমি এই বাড়তি আ-কার জুড়ে দেওয়ার প্রতীকী তাৎপর্য খুঁজে পাই। এই আ-কারটুকু দিয়েই তিনি যেন ছেঁউড়িয়া থেকে বেরিয়ে পড়েন। বাউলকে সঙ্গে নিয়েই। আর ভাটি বাংলার নদনদী ও মানুষের গান গাইতে গাইতে বাংলাদেশের হয়ে ওঠেন।